আদিবাসী বুননশিল্প
মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৩ ১২:২৭ পিএম
বুননশিল্প আদিবাসী ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক ও বাহক ছবি: সাব্বির ফেরদৌস
রিনাই কাচাক কানতিয়ৈ/খাচুরঅ রদি খুম/ বেংকি কানৈ য়াথৈঅ/খুঞ্জুরঅ ওয়াখুম।
আদিবাসী নাচ-গান কিংবা কবিতায় নারীর পরিধেয় ও সাজসজ্জার বিবরণ থাকে হামেশা। ওপরে উদ্ধৃত শিল্পী ও গীতিকার-সুরকার জীবন রোয়াজার গানের কলিতে যেমন কোনো ত্রিপুরা প্রেমিক তার প্রেমিকার রূপের বিবরণ দিতে গিয়ে বলছে, রঙিন রিনাই (ত্রিপুরা নারীদের নিম্নাঙ্গে পরিধেয়) পরে খোঁপায় গুঁজে নিও ফুল, পায়ে বেংকি (ঘুঙুরের মতো গয়নাবিশেষ) পরে কানে গুঁজে নিও সুন্দর কানের দুল।
আদি স্বয়ংসম্পূর্ণ সমাজব্যবস্থায় আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের জীবন নির্বাহের জন্য বাইরের কোনো কিছুর ওপরই নির্ভর করত না। দৈনন্দিন খাদ্যসামগ্রী, তৈজসপত্র, ব্যবহার্য সবকিছুই তারা প্রস্তুত করত প্রাকৃতিক উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে। তাই লজ্জা নিবারণ ও সাজসজ্জায়ও তারা প্রাকৃতিক বিভিন্ন উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে প্রস্তুত করত সুতা, প্রাকৃতিক বাকল, লতাপাতার নির্যাস দিয়ে নানা রঙে রূপান্তর করত সুতাগুলোকে এবং তা দিয়ে বুনত প্রয়োজনীয় বস্ত্রসামগ্রী। আদিবাসীরা নারী-পুরুষ ও বয়স ভেদে নানা রঙ ও ডিজাইনের কাপড় ব্যবহার করে। এসব পোশাক বানানো হয় প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করা সুতা দিয়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে সহজলভ্য হতে শুরু করেছে কম দামের নানা রঙের সুতা। ফলে প্রাকৃতিকভাবে কাঁচামাল সংগ্রহ করে সুতাগুলো রঙ করে, সুতা থেকে কাপড় বুননের দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়া অধিকাংশ আদিবাসী নারীই এখন আর করেন না। অনেক ক্ষেত্রে মেশিনে বানানো অনেকটা একই ধরনের দেখতে কাপড়ও এখন পাওয়া যাচ্ছে বাজারে। তাই আদিবাসী নারীদের মধ্যে নিজেদের পোশাক বানানোর মজা আর আগের মতো নেই। তবে মিডিয়ার বদৌলতে আদিবাসীদের এ বুননশিল্পের চাহিদাও এখন অনেক বেড়েছে। তাই বাজারও কিছুটা প্রসারিত হয়েছে। এখনও অনেক সমঝদার মানুষ আদিবাসী নারীদের কোমরতাঁতে বোনা আসল কাপড় চড়া দামে কেনার জন্য অর্ডার করে থাকেন, এমনকি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেও। তাই আদিবাসী নারীদের অন্দরমহল থেকে তাদের বুননশিল্প আজ অনেক মানুষের অন্তরে ঠাঁই পেতে শুরু করেছে।
বুননশিল্প আদিবাসী ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক ও বাহক। জাতিসত্তার আত্মপরিচয় বিনির্মাণে তাদের পোশাক-আশাক বিশেষ ভূমিকা রাখে। সংসারের পাশাপাশি জুম চাষ, প্রকৃতি থেকে আহরিত ও নিজেদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বাজারে বিক্রি, জঙ্গল থেকে জ্বালানি কাঠ, পানি সংগ্রহ থেকে শুরু করে ছেলেমেয়ে ও পরিবারের বয়স্কদের দেখাশোনাসহ যাবতীয় কাজে আদিবাসী নারীদের সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। বুননশিল্প আদিবাসী নারীদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশের মতো। সাজসজ্জা, লজ্জা নিবারণ ও শীত নিবারণের নিমিত্ত ছাড়াও অবসরযাপন, আড্ডা ও চিত্তবিনোদনের জন্যও আদিবাসী নারীরা বুননশিল্পে নিজেকে সম্পৃক্ত করে থাকেন। পিনন, খাদি, গামছা, চাদর, কম্বল, শার্ট, মাথার পাগড়ি সবকিছুই বুনন করেন আদিবাসী নারীরা। জাতিভেদে আলাম, আতাং, রি-অচাই ইত্যাদি নামে পরিচিত একটি মূল নকশা অনুসরণ করে যাবতীয় কাপড় বোনা হয়। আদিবাসী জাতিগুলোর প্রত্যেকের রয়েছে স্বতন্ত্র নকশা ও প্যাটার্নের বুননশিল্প। পুরোনো দিনে জুমের তুলা সংগ্রহ করে ভালোমতো শুকিয়ে তা থেকে সুতা বের করা হতো এবং জঙ্গলের কলমা নামে বিশেষ গাছের পাতা ও বিভিন্ন গাছের বাকল থেকে নির্যাস সংগ্রহ করে সুতাগুলো নানা রঙে রাঙিয়ে শুকানো হতো। আদিবাসী নারীদের সেই পুরোনো নন্দনশিল্প একসময় পাহাড়ের সীমানা ছাড়িয়ে সমতলের ফ্যাশনসচেতন নারী-পুরুষের মনোযোগ কাড়ে। সমাদৃত হতে থাকে পিনন-খাদি-থামি এবং এসবের প্যাটার্ন দিয়ে বানানো শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি-পাজামা, পর্দার কাপড়, মেয়েদের ব্যাগ ও পার্টস, মাফলার বা উত্তরীয়, কুর্তি, ফতুয়া ইত্যাদি।

যুগের চাহিদা অনুসারে বর্তমানে বহু নারী উদ্যোক্তা সদলবলে কাজ করে যাচ্ছেন, কেউ বুননে কেউ বা বিপণনে। রোজগার করছেন এ খাত থেকে নিয়মিত। ঐতিহ্যকেন্দ্রিক এ বাণিজ্যব্যবস্থায় তারা ভালোভাবেই অভিযোজন করে নিয়েছেন নিজেদের। অনলাইন ও অফলাইন উভয় প্ল্যাটফর্মে এখন আদিবাসী নারীরা নিজেদের মধ্যে পণ্য কেনাবেচার পাশাপাশি বাইরের আগ্রহী ক্রেতাদের কাছেও বিক্রি করছেন। অনেকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও সীমিত আকারে পাঠাচ্ছেন পণ্যসামগ্রী।
আদিবাসী পণ্যসামগ্রীর চাহিদার ফলে দেশের সব পর্যটনকেন্দ্রিক শহরে এখন আদিবাসী বয়নশিল্পের বিপণিকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসও এখন আদিবাসী নকশার প্যাটার্ন দিয়ে পণ্যসামগ্রী উৎপাদন করছে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন অনুসারে তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন বয়নশিল্পে ৭ হাজারের বেশি মানুষ সম্পৃক্ত রয়েছে, যার ৯০ শতাংশই নারী।
বুননশিল্পটি বর্তমানে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি স্বচ্ছন্দ রোজগারের উপলক্ষ হিসেবেও বিবেচিত। আমাদের সময় পত্রিকার এক প্রতিবেদন অনুসারে, আদিবাসী বস্ত্র বিক্রি করে অনেকে মাসে ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করছে। এ পত্রিকা জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা আতিয়া ইসলামের বরাত দিয়ে জানায়, বান্দরবানে প্রায় ১০ হাজার পাহাড়ি নারী কোমরতাঁতের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। আদিবাসী বুননশিল্পের যেমন আধুনিকায়ন হয়েছে, তেমনি বেড়েছে তার জনপ্রিয়তা ও চাহিদা। অনেকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও নিত্যনতুন নকশা উদ্ভাবন করছেন আদিবাসী পোশাকের জন্য। এত চাহিদা ও জনপ্রিয়তা থাকার পরও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এ বুননশিল্পের উৎপাদনকারীরা উৎপাদন করতে পারছেন না চাহিদা অনুসারে পণ্য। আদিবাসী বুননশিল্পের পণ্য প্রসারে অন্যতম অন্তরায় হলো কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি। বুননশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশিরভাগ আদিবাসী নারীরই আয় অতি সীমিত। স্বল্প আয়ের এসব আদিবাসী নারীর পক্ষে চড়া দামের কাঁচামাল কিনে বুননশিল্পের কাজ চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। নতুন প্রজন্মকে এ পেশায় আকৃষ্ট এবং এ শিল্পের প্রসার ঘটানোর জন্য প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা। তবেই বৃদ্ধি পাবে এ বুননশিল্পের উৎপাদন। উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে ঘটবে এ শিল্পের অত্যধিক বিকাশ ও প্রসার।
লেখক : আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা জাতীয় পদক ২০২১ প্রাপ্ত লেখক ও গবেষক