সেলিম রানা
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৩ ১৪:৩৮ পিএম
সম্প্রতি রিকশা থেকে কালিয়াকৈর বাজারে নামছি। ভাড়া দেওয়ার সময় বিপত্তি বাধল। টাকার নোটটি রিকশাওয়ালা নেবেন না। ছেঁড়া টাকাটি পকেটের অবিশিষ্ট সম্বল। সাতপাঁচ ভাবছি। পরিচিত কাউকে পাওয়া যায় কি না। ইতিউতি করছি। হঠাৎ চোখ গেল মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ের ওপর। রাস্তার পাশে কাঁচাপাকা চুলের এক লোক ছোট্ট একটা টেবিল পেতে বসে আছেন। পুরোনো, কাটা, ছেঁড়া, কোঁচকানো, পোকামাকড়ে কাটা, আগুনে ঝলসে যাওয়া, পানিতে ভিজে নেতিয়ে যাওয়া এবং নষ্টপ্রায় টাকা সাজানো। রয়েছে নতুন টাকার বান্ডিলও। দূর থেকেই বুঝলাম টাকা বদলের দোকান। ঢাকায় এমন দোকান আছে জানি। গুলিস্তান স্টেডিয়াম এলাকাসহ অনেক জায়গায় আছে টাকা বিকিকিনির দোকান। রাজধানী থেকে দূরে এই দোকানটি দেখে মনে স্বস্তি এলো। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। আমার ১০০ টাকার ছেঁড়া নোটটি বদলে ৭০ টাকা পেলাম। এরপর রিকশাওয়ালাকে বিদায় করলাম।
বয়স্ক এই দোকানদারের এটা পেশা। ছেঁড়া টাকা বদল করে দেওয়ায় গ্রাহকের তো উপকার হচ্ছে। বিপদ থেকে উদ্ধার হওয়ায় এই
দোকানদারের ব্যবসা সম্পর্কে আরও কিছু জানার আগ্রহ হলো। নিজের পরিচয় দিতেই বললেন,
‘হ রে বাবা। আমিও পত্রিকা ছাপানোর কারখানায় এক যুগ চাকরি করেই কাটাইছি। অনেক কিছুই দেইখ্যাই আইছি। অহন না হয় রোদে পুড়তেছি। রাস্তাঘাটে টেহা বদলের ব্যবসা করে খাই।’ তার কথায় কিছুটা তাচ্ছিল্যের সুর। কোনো ব্যস্ততাও তার নেই। রোদের মধ্যে একখানি টেবিল পেতে বসে আছেন। দোকানের সামনে কোনো গ্রাহকও নেই। রাস্তার ধুলাবালিতে তার দেহখানি আরও বেশি মলিন হয়ে গেছে। সাবেক এই প্রেস কর্মীর আক্ষেপ অনেক। তার যুক্তি, খবরের কাগজে তো কত সমস্যার কথাই লেখা হয়। একটিরও সমাধান তিনি দেখেননি। তিনি আরও জানান, ‘নিত্তি জিনিসের দাম বাড়ে। এতে আমাগো চলা কষ্ট। আয় তো আগের ঠিই আছে।’
কিছু সময় কথা বলার পর তার নাম-ঠিকানা জানলাম। টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলায় বাড়ি। নাম তার আনিস মিয়া। টাঙ্গাইলের করটিয়া কাপড়ের হাট থেকে শুরু করে গাজীপুরের গ্রামগঞ্জের সাপ্তাহিক বড় বড় হাটে টাকা বিকিকিনির দোকান নিয়ে বসেন তিনি। প্রতিদিনই কোনো কোনো হাটে যান। ভ্রাম্যমাণ দোকানটি নিয়ে ছেঁড়াফাটা, পুরোনো টাকা বদল করে দিন কাটে তার। কিন্তু বদলাচ্ছে না সংসারের অবস্থা। টাকার দোকানে বসে মানুষের পকেটের দিকে তাকিয়ে দিন চলে যায় তার। কে কখন ছেঁড়া টাকা নিয়ে আসবে। তার দোকান দেখার পর অনেকেই আফসোস করে বলেন, বাড়ি থেকে ছেঁড়া টাকাটি যদি নিয়ে আসতাম, তাহলে বদলে নিতে পারতাম। পরে গ্রাহক কোনো না কোনো সময় ঠিকই তাদের ছেঁড়া টাকাটি বদল করে নতুন টাকা নিয়ে যায়। বিনিময়ে লাভের অংশ হিসেবে আনিস মিয়া পান শতকরা ৩০ টাকা। প্রতি হাটে ৬০ থেকে ৭০টি অচল নোট পরিবর্তন করেন।
ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে নতুন টাকার বেশ চাহিদা থাকে। সে সময় কিছুটা বেশি রোজগার হয় তার। এ ছাড়া নতুন নোট বাজারে এলে সেই নোটের অপেক্ষায় থাকে অনেকেই। হাটে ছেঁড়া, কাটা, ফাটা ঝলসানো টাকা সংগ্রহ করেন। সুযোগ-সময়মতো মাসে দু-তিন বার ঢাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে টাকা পরিবর্তন করে নিয়ে আসেন।
এ জীবনে কত গ্রাহকের টাকা তো বদলে দিয়েছেন তিনি। তার জীবনের কতটুকু বদল হলো? এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভালোমন্দ কিছু কইব না। এ বয়সে অন্য কোনো কাজে যাওয়ার উপায় নাই। অন্য কোনো ব্যবসায় যে পুঁজিপাট্টার দরকার তা তো নাই-ই। তাই এ কাজ ছাড়া অন্য কোনো গতি কই?’ তার কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা শেষ হবে। ভালো চাকরি পাবে। এতেই যদি বদল হয় তার ভাগ্যের চাকা। এ ছাড়া আর কোনো আশা নেই আনিস মিয়ার।