× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সুন্দরবনে বাঘের সঙ্গে দেখা

ইমদাদুল ইসলাম বিটু

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৩ ১২:৫৭ পিএম

অল্প বয়স্ক বাঘ তখনও আপন মনে লেজ নেড়ে যাচ্ছে, আমাদের নৌকা অনুসরণ করে একবার ডান দিকে, একবার বাম দিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখছে, সে এক অন্যরকম অনুভূতি।  ছবি: লেখক

অল্প বয়স্ক বাঘ তখনও আপন মনে লেজ নেড়ে যাচ্ছে, আমাদের নৌকা অনুসরণ করে একবার ডান দিকে, একবার বাম দিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখছে, সে এক অন্যরকম অনুভূতি। ছবি: লেখক

আমাদের সুন্দরবন বেঙ্গল টাইগারের অন্যতম আবাসস্থল। মানবসৃষ্ট কারণে রাজসিক এই প্রাণী আজ হুমকির মুখে। সুন্দরবনে বাঘের দেখা পাওয়া এক বিরল অভিজ্ঞতা। আজ ২৯ জুলাই, বিশ্ব বাঘ দিবস। দিনটি উপলক্ষে সুন্দরবনের রাজা বেঙ্গল টাইগারের মুখোমুখি হওয়ার গল্প নিয়ে আজকের যাদুকাটা প্রচ্ছদ আয়োজন...


সুন্দরবন, পৃথিবীর অন্যতম শ্বাসমূলীয় বন। স্থানীয়রা সুন্দরবনকে বাদাবন বলে সম্বোধন করে। এই বনের কথা মনে হলেই সবার আগে মনের মাঝে যেই শব্দটা চলে আসে তা হলো বেঙ্গল টাইগার। বাদাবন ঘিরে যাদের কর্মযজ্ঞ, বন বিভাগ, জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালি, পর্যটন সংশ্লিষ্ট মানুষ, পর্যটক সবারই আকাঙ্ক্ষা সুন্দরবনে প্রাকৃতিক পরিবেশে বাঘ দর্শন। আজ সেই বাঘ দেখার ঘটনাটিই বলব। 

আমরা যারা ছবি তুলি এবং নিয়মিত জীববৈচিত্র্যের সন্ধানে সুন্দরবনে যাই, গরমের সময়টা অর্থাৎ মার্চ, এপ্রিল, মে এই তিন মাসে যেতে চাই না। এ সময় মধু সংগ্রহ করা হয় বলে মৌয়ালিদের সঙ্গেই বনে যাওয়া হয় বেশি। গত বছরের রোজা শুরু হওয়ার সপ্তাহ খানেক আগে একরকম জোর করেই রওনা হলাম বাদাবনে। সাধারণত চার দিনের জন্য যাই, সেবারও তার ব্যতিক্রম ছিল না।

প্রথম দিন থেকেই শুশুক, নোনা পানির কুমির, ভুবন চিল, সিন্ধু ঈগল, মদন টাক, কিছু ছোট পাখি, হরিণ, শূকর, সাপের দেখা পেলেও বাঘের খোঁজে প্রতিবারের মতো সতর্ক দৃষ্টি দিয়ে খুঁজতে থাকলাম। তৃতীয় দিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত কটকা অভয়ারণ্যে দীর্ঘক্ষণ হেঁটে সবাই ক্লান্ত হয়ে বোটে ফিরে বিশ্রাম নিচ্ছিল, ঘণ্টা খানেক পরেই আবার বনে ফিরে যাবার কথা। হঠাৎ বাতাস শুরু হলো, ঢেউয়ের উচ্চতাও ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করল, অগত্যা বোট নিয়ে উত্তর দিকে বনের ভেতরে ছোট খালের উদ্দেশে নোঙর তোলা হলো। একই সময় জোয়ার এবং বাতাসের কারণে বোট নিয়ন্ত্রণে রাখাও মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল। ঘণ্টা খানেক চলার পর ছোট একটা খালের মুখে নোঙর করা হলো, টিমের অনেকেরই তখন মন খারাপ, ঘণ্টা খানেক পরেই তো কটকার অপর পাড়ে নামার কথা ছিল, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেটা তো আর সম্ভব না। বাদাবনের আবহাওয়া অবশ্য আগে থেকে অনুমান করা প্রায় অসম্ভব। মন খারাপের আরও একটা কারণ হলো সেদিন সন্ধ্যার পর পরই আমাদের মোংলার উদ্দেশে রওনা দিতে হবে, পরদিন সন্ধ্যা নাগাদ যাতে পৌঁছে যেতে পারি। অন্য কোনো উপায় না থাকাতে সিদ্ধান্ত হলো বোট যেখানে নোঙর করা হয়েছিল, আলো থাকতে থাকতে ছোট নৌকা নিয়ে আশপাশে খালগুলোতে বোট ট্রিপে যাব।

ক্যামেরার ভিউ ফাউন্ডারে ধরা পড়লো বাদাবনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগার অবাক হয়ে আমাদের দেখছে

টিমের নয়জনের মাঝে সাতজনই ঢিলেঢালাভাবে নৌকায় উঠল, কেউ কেউ একটা ক্যামেরা, একটা লেন্স নিয়ে স্যান্ডেল পরেই নামল। বিকাল চারটার দিকে শুরু হলো আমাদের শেষ বোট ট্রিপ। প্রথমে কাছেই একটা খালে ঢুকলাম, ভাটা প্রায় শেষের দিকে, খালের পানি নেমে যাচ্ছে, তবে একটা জায়গায় দেখতে পেলাম বাঘের খাল পারাপারের প্রমাণ। ডান দিক থেকে বাম দিকে গেছে, ভাটার শুরুতে। সবাই আরও সতর্ক হয়ে চারদিকে নজর দিলাম। ঘণ্টা খানেক চলার পর পানি স্বল্পতায় খাল থেকে বের হয়ে গেলাম, সামনে আরেকটা খালে ঢুকেও সুবিধা করা গেল না। সূর্যের আলো আর বড়জোর এক ঘণ্টা বা তার চেয়ে কিছু বেশি পাওয়া যাবে। তাই বড় খাল দিয়েই যেতে থাকলাম, বন্ধ খাল থেকে বের হওয়ার ১৫-২০ মিনিট পরে দীর্ঘদিনের ছবি তোলার সঙ্গী নোমান ভাইয়ের দিকে তাকাতেই দেখি চোখ বড় বড় করে উনি খালের পাড়ের দিকে কী যেন দেখছেন, একই সময় টিম মেম্বার একজনের গগনবিদারী চিৎকার বা আ আ ঘ। চিৎকার শুনেই তার উৎসের খোঁজে খালের পাড়ে তাকালাম, ততক্ষণে বোটচালক নৌকা ঘোরানো শুরু করে ফেলেছে, খালের পাড়ে কিছু না দেখতে পেয়ে ক্যামেরার ভিউ ফাউন্ডার দিয়ে খুঁজতে থাকলাম, হঠাৎ নৌকা ঘোরানোর ফলে ডানদিকে কাত হয়ে গেল, অপর পাশটা একটু উঁচু হতেই ক্যামেরার ভিউ ফাউন্ডারে ধরা পড়ল বাদাবনের রাজা বেঙ্গল টাইগার, অবাক হয়ে আমাদের দেখছে। প্রথম যখন দেখি তখন দূরত্ব ছিল সাত-আট ফুট, আমাদের নৌকা বাঘ যে ডালে শুয়ে ছিল তার নিচে। 

বাঘটি ভরা জোয়ারের সময় সরাসরি খাল পার হয়ে পানি থেকেই বাইন গাছের ডালে উঠে আরাম করছিল

নৌকা ওখান থেকে খালের মাঝ বরাবর সরিয়ে আনার পর সবাই আলোচনা করে দেখলাম, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে এবং বিরক্ত না করে আমাদের লেন্সের আওতা অনুযায়ী আলো থাকা পর্যন্ত ছবি তুলতে থাকব। সেই অনুযায়ী প্রায় এক ঘণ্টা আমরা বাঘটাকে বিরক্ত না করে নৌকা একবার ডানদিকে, আবার বামদিকে চালিয়ে ছবি তুলেছিলাম আর মন ভরে বাঘটাকে দেখছিলাম।

বন্য প্রাণী আলোকচিত্র সবারই স্বপ্ন প্রাকৃতিক পরিবেশে সুন্দরবনে বাঘের ছবি তোলা, সেই স্বপ্ন তখন বাস্তবে চোখের সামনে। তাই সময় নষ্ট না করে ক্যামেরার শাটারের সর্বোচ্চ ব্যবহার করলাম। যারা একটা ক্যামেরা, একটা লেন্স নিয়ে নেমেছিল, তারা আফসোস করতে থাকল। ভাটা শেষের দিকে, পানি কিছুক্ষণের মাঝেই স্থির হয়ে যাবে, আলো কমে গেছে, অল্প বয়স্ক বাঘ তখনও আপন মনে লেজ নেড়ে যাচ্ছে, আমাদের নৌকা অনুসরণ করে একবার ডানদিকে, একবার বামদিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখছে, সে এক অন্যরকম অনুভূতি। ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে যা বুঝলাম, বাঘটি ভরা জোয়ারের সময় সরাসরি খাল পার হয়ে পানি থেকেই বাইন গাছের ডালে উঠে আরাম করছিল, দেখে বোঝা যাচ্ছিল তার পেটটাও ভরা। আমরা যখন তাকে দেখি ততক্ষণে ভাটার টানে পানি নেমে গেছে প্রায় সাত-আট ফুট। তার অর্থ হলো বাঘটি প্রায় তিন ঘণ্টা সেখানে বসে আছে। খাল পাড়ি দিয়ে সরাসরি গাছে ওঠার কারণে শরীরের কোথাও, এমনকি পায়ের থাবাতেও কোনো কাদা নেই।

সুন্দরবনের প্রান্তরে ক্যামেরা হাতে লেখক

ছবি তুলতে তুলতে অনেকেরই ক্যামেরার মেমরি শেষ হয়ে গেল, আলো পড়ে গিয়ে অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে চারপাশ, তাই অল্প বয়স্ক বাদাবনের রাজপুত্রকে সেখানে রেখেই আমরা মূল বোটে ফিরে গেলাম।

বাঘের ছবি তোলার জন্য কতবার যে সুন্দরবনে গিয়েছি, এখন আর হিসাব রাখি না। কোনো কোনো বছর সাত-আটবারও গিয়েছি, এর আগে দুবার দেখেছি তবে তখন থেকেই মনে মনে আল্লাহর কাছে চাইতাম, সামনাসামনি যেন বাঘের সামনে না পড়ি। সে ইচ্ছে বেশ ভালোভাবেই পূরণ হলো, বাঘ খালের মুখে গাছের ডালে, আমি নৌকায়। এর চাইতে নিরাপদে বাঘের ছবি মনে হয় আর তোলা সম্ভব না। 

ভালো থাকুক সুন্দরবনের বাঘসহ পৃথিবীর সব বন্য প্রাণী।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা