মোল্লা রাছিক
প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৩ ১২:২২ পিএম
আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৩ ১২:২৫ পিএম
‘প্যাটোত এক গেলাস পানি আর একনা টোস্ট বিস্কোট পলি পড়ে গায়োত বল পাই। আরাম লাগে। গরমত জান কাহিল। হামরা গরিব মানুষ। রিকশা চালি খাই। রাস্তাত কোনো দোকানঘর নাই। যার থন হামরা যে দশটা টেকা খরচ করি একটা কিছু কিনি খাতি পারি না। রিকশা ডেরাইভারগো জন্যি এরা কতকখানি উপকার যে করিচ্চে। আল্লাহর দুনিয়াত অনেক বড় দোয়ার কাম এডি।’ পানি পান করার পর এ কথাগুলো বললেন রিকশাচালক আবদুস সাত্তার। ভাষা শুনে বুঝলাম উত্তরের কোনো এক জেলায় তার বাড়ি। কথা বলছিলেন রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সি ব্লকের ১৫ নম্বর সড়কের মাথার এক বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। বাসার সামনে বেলিফুল গাছটার নিচে রাখা পানির ফিল্টার। এটি যে পথিকদের ব্যবহারের জন্য তা-ও লেখা আছে পাত্রের গায়ে। পাশেই বিস্কুটভর্তি বয়াম। পথচারীদের জন্য এমন আয়োজন রেখেছেন বাসার মালিক। রিকশাচালকদের যখন পিপাসা পায়, তখন তারা এখানে এসে একটা বিস্কুট ও পানি পান করেন। এই সেবাগ্রহণকারী আবদুস সাত্তারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল আগে দুয়েকটা বাসার সামনে শুধু পানি রাখা থাকত। তিন বছর ধরে বিভিন্ন বাসাবাড়ির সামনে পানির সঙ্গে বিস্কুট ও রুটি রাখা হচ্ছে।
বাসার নাম ও হোল্ডিং নম্বর যেন প্রকাশ না করা হয় এই শর্তে কথা বলতে রাজি হলেন জুয়েল রানা। তিনি বাড়ির তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে আছেন দুই বছর হলো। তার কাছে এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। তিনি জানান, ‘বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নেই। গেট ছাড়া কোথাও তো দোকানপাট নেই। কারও পানির পিপাসা পেলে অনেক বিপদে পড়ে। বিশেষ করে রিকশাচালকরা। তারা তো রিকশা রেখে কোনো বাসাবাড়িতে পানির জন্য যেতে পারে না। তাই সব মানুষের যেন উপকার হয়। মানুষের কল্যাণের জন্য পানি ও বিস্কুট রাখা হয়।’ দিনে কতজনের জন্য বিস্কুট রাখ হয়? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘বিস্কুট রাখা হয় ১৫০টি। এর মধ্যেই হয়ে যায়। তবে পানি পান করে আরও বেশি। সবাই বিস্কুট নেয় না। অনেকেই শুধু পানি পান করে।’ আমাদের কথা শেষ না হতেই এক তরুণী গৃহপরিচারিকা শুধু পানি পান করে চলে গেল। যাওয়ার আগে আমাদের জানাল, এই ব্লকেরই ৬ নম্বর রাস্তায় এক বাসাতে রুটি দেওয়া হয়। তার কথা মতো সেখানে উপস্থিত হলাম। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় জামরুল গাছের পাতাগুলো ঝমমল করছে। এরই নিচে পানির সাদা ফিল্টারটি চোখে পড়ল। এ বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক লোকমানের সঙ্গে কথা হলো। তিনি জানালেন, ‘বিকাল ৪টায় রুটি দেওয়া শুরু হয়। দৈনিক ৫০টি রুটি রিকশাচালকদের জন্য রাখা হয়।’ তিনি জানান, ‘আজকের রুটি সব শেষ হয়ে গেছে। এ রুটিগুলো শুধু রিকশাচলকদের জন্য।’
ক্লান্ত পথিকের পানির তিয়াস মেটানোর জন্য এ আবাসিক এলাকার আরও অন্য ব্লক ও রাস্তায় রাখা হয়েছে পানি ও বিস্কুট। ডি ব্লক, আই ব্লক ও জি ব্লকের কোনো কোনো সড়কের বাসাবাড়ির সামনে বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার চোখে পড়ল। কোনো কোনো বাসায় শুধু পানির ফিল্টার রাখা। বাসার নিরাপত্তাকর্মীর কাছে রাখা আছে বিস্কুট অথবা রুটি।
মুগ্ধকর এবং মানবিক এ দৃশ্য দেখে ফেরার পথে কয়েকজন রিকশাচালকের সঙ্গেও কথা হলো। এ সেবা সম্পর্কে অনেকেই জানেন, আবার কেউ জানেন না। নেত্রকোণার বারহাট্টা থেকে ১৫ দিন হলো ঢাকায় রিকশা চালাতে এসেছেন হক মিয়া। তিনিও কখনো পানি ও বিস্কুট খাননি। বিস্কুট রাখা আছে এমন বাসা তার চোখে পড়েনি। এমনটাই জানালেন এই চালক।
জয় হোক মানবতার।