এম আর ইসলাম রতন
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৩ ১২:২৪ পিএম
আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৩ ১২:৪৯ পিএম
দুই বছর আগেও রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তায় রাস্তায় সবজি ফেরি করে সংসার চালাতেন নওগাঁ সদরের তরুণ সাগর আলী। এক দিন কোনো কারণে কাজে বের হতে না পারলে পরদিন কী হবে- এমন চিন্তা ছিল যে তরুণের, সেই মানুষটি এখন একজন সফল উদ্যোক্তা। তার সফলতার পেছনে রয়েছে মাশরুম। মাশরুম চাষের মাধ্যমেই পেয়েছেন সফলতার দেখা।
সদরের বেণী-ফতেপুর গ্রামে নিজের মাত্র দুই কাঠা জমিতে প্রাথমিকভাবে মাশরুম চাষ শুরু করেন সাগর আলী। অল্প একটু জায়গাজুড়ে তুলেছেন টিনের ঘর। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ঘরের মধ্যে টানিয়েছেন শক্ত কটের সুত দিয়ে বানানো শিকা। সেখানে স্তরে স্তরে ঝুলে আছে পলিথিন দিয়ে মোড়ানো মাশরুম বীজ প্যাকেট বা স্পন প্যাকেট। পলিথিনের গায়ে সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে সাদা আস্তরণে দেখা যাচ্ছে মাশরুম। সেখান থেকে কেটে বিক্রি করছেন বাজারে।
কীভাবে মাশরুম চাষে আগ্রহী হলেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে সাগর আলী বলেন, ‘আগে শহরে সবজি বিক্রি করতাম। এক দিন সবজি বিক্রির ফাঁকে ইউটিউবে মাশরুম চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার ভিডিও চোখে পড়ে। তখন মাথায় আসে, কীভাবে অবসর সময়ে মাশরুম চাষ করা যায়। এরপর মাগুরা ড্রিম মাশরুম সেন্টারে চার দিনের প্রশিক্ষণ নিই। সেখান থেকেই অল্প কিছু বীজও পেয়েছিলাম। সেই বীজ নিয়ে এসে ১৬০০ টাকা ব্যয়ে প্রথমে ৩০টি মাশরুম বীজ প্যাকেট (স্পন প্যাকেট) তৈরি করি। পরে সেখান থেকে ৭ হাজার টাকার মাশরুম বিক্রি করি। তারপর বদলগাছীর পাহাড়পুর বাজারে একটি ঘর তৈরি করে সেখানে ছয় মাস মাশরুম চাষ করে বেশ আয় হয়। পরে নিজের জায়গায় মাশরুম চাষ শুরু করি।’ সাগর আলীকে এখন আর সবজি বিক্রি করতে হয় না। মাশরুম চাষের আয় দিয়েই সংসার চলে যাচ্ছে।
এখন তার খামারে ৩০০টি অয়েস্টার জাতের মাশরুম স্পন প্যাকেট রয়েছে। এতে প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। স্পন প্যাকেট তৈরির ৩০ দিন পর মাশরুম আসা শুরু হয়। একটি স্পন প্যাকেট থেকে ২৪০ থেকে ৩০০ টাকার মাশরুম বিক্রি হয়। দুই মাসে একেকটি স্পন প্যাকেট থেকে চারবার মাশরুম পাওয়া যায়। প্রতি কেজি পাইকারি ২৫০ টাকা ও খুচরা ৩০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। সামনে আরও বড় পরিসরে চাষের পরিকল্পনার কথা জানান এই উদ্যোক্তা।
সাগর আলী আরও জানান, মাশরুম চাষের জন্য এক থেকে দেড় ইঞ্চি করে খড় কাটতে হবে। এরপর সিদ্ধ করে হাল্কাভাবে শুকাতে হয়। যাতে চাপ দিলে পানি না ঝরে। এরপর খড়গুলো পলিথিনের প্যাকেটে রেখে তাতে মাশরুমের বীজ দিতে হবে। প্যাকেটের মুখ বন্ধ করে কয়েকটা ছিদ্র করে দিতে হবে। দিনে তিন-চারবার পানি দিতে হয়। সাধারণত ২৫-৩০ দিনের মধ্যে পলিথিনের গায়ে সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে সাদা আস্তরণ দেখা যাবে, যাকে মাইসেলিয়াম বা মাশরুমের ছাতা বলে। এরপর এগুলো খাওয়ার উপযোগী হয়।
বর্তমানে সাগর আলী মাশরুম উৎপাদনের পাশাপাশি মাশরুম বীজ (স্পন) উৎপাদন তৈরি করছেন। প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেকেই তার মাশরুমের খামার দেখতে আসেন। জেনে নিচ্ছেন কীভাবে সহজ উপায়ে মাশরুম উৎপাদন করা যায়।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আবু হোসেন বলেন, মাশরুম একটি পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার। মাশরুম ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন রোগের জন্য অনেক উপকারী। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় এখন মাশরুম চাষ শুরু হয়েছে। চায়নিজ রেস্টুরেন্টসহ সাধারণ মানুষও ধীরে ধীরে এর ব্যবহারে অভ্যস্ত হচ্ছেন। অল্প জায়গায় ও স্বল্প পুঁজিতে মাশরুম চাষ করা যায় এবং এটি লাভজনক চাষ। সাগর আলীর সফলতায় জেলার অনেক তরুণ মাশরুম চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।