× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

যাদুকাটা প্রচ্ছদ

কলসি পুরাণ

ইমরান উজ-জামান

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৩ ১২:৫১ পিএম

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৩ ১৩:০০ পিএম

 তৃষ্ণায়-প্রেমে- অপ্রেমে- ঘুমে-জাগরণে একসময়ে প্রাকৃতিক মানুষের সম্বল ছিল কলসি

তৃষ্ণায়-প্রেমে- অপ্রেমে- ঘুমে-জাগরণে একসময়ে প্রাকৃতিক মানুষের সম্বল ছিল কলসি

কলস, কলসি,  গাগরা, গাগরী; কুম্ভ- নানা নামে নানা জনপদে ডাকা হলেও গোলাকৃতিই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। মানুষের মাথা গোল, জীবনচক্র গোল, পৃথিবী গোল, ভাবনা গোল। গোল মানে চক্রাকার। জগতের সৃষ্টি জলে, এই জলের গোলকীয় আধার কলসি। তৃষ্ণায়-প্রেমে- অপ্রেমে- ঘুমে-জাগরণে প্রাকৃতিক মানুষের সম্বল ছিল কলসি। আর এখন ভাবনায় কুম্ভকার কলসি। কলসির পুরাণ নিয়ে বিশেষ লেখা...


সরু গ্রীবা, গোলাকার মুখ, বাইরের দিকে প্রসারিত কান্দা- এই হলো কলসি বা কুম্ভ। মাটির তৈরি কলসি প্রাচীন, তবে প্রাচীনকালে তামা-কাঁসার কলসিও ছিল। এখন অ্যালুমিনিয়াম প্লাস্টিকের কলসিও পাওয়া যায়। ইতিহাসে স্বর্ণের কলসি ব্যবহারের কথাও জানা যায়। 

কলস বা কলসি শব্দের উদ্ভব কীভাবে হয়েছে তা অজানা হলেও বাংলা সাহিত্যের শব্দ হিসেবে কলস অনেক আগে থেকেই প্রচলন ছিল। চিরায়ত গ্রামবাংলার নারীদের হাত ধরেই উদ্ভব হয়েছে কলসি নামক আরেকটি শব্দের। তাই কলসিকে আমরা চলিত, কথ্য কিংবা আঞ্চলিক ভাষা বলতে পারি। 

কবি-সাহিত্যিকদের হাত ধরে পরবর্তী সময়ে কলসি শব্দটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। 

‘আমার কাংখের কলসি জলে গিয়েছে ভাসি,/ মাঝিরে তোর নৌকার ঢেউ লাগিয়ারে’ কিংবা ‘কলসি জনম গেল জল ভরতে ভরতে কলসি পারল না এক ফোঁটা জল খাওয়াইতে’।

গান ও কাহিনী চিত্রে কলসির ব্যবহার চিরদিনের। হিন্দু ১৮টি পুরাণের অন্যতম পদ্মপুরাণ। ধারণা করা হয় বরিশালের বিজয় গুপ্ত, ভারতবর্ষের কানাহরি দত্ত ছাড়াও অন্যরা পদ্মপূরাণ রচনা করেছেন। যার সময়কাল ৭৫০ হতে ১০০০ খ্রিস্টাব্দ। 


চাদ সওদাগরের ছেলে লখাই বান্ধবযোগে জলের ঘাটে মাছ মারতে গেছেন। সাধারণত অনিন্দ্যসুন্দরী বেহুলা কন্যাকে দেখে মনোল্লাসে ঘুরতে থাকা বড়শির ছিপের আঘাতে ভেঙে যায় বেহুলার কাঁকের কলসি। বেহুলা ভাঙা কলসি নিয়ে বাড়ি ফিরলে পথে লোকে মন্দ বলবে। তাই বেহুলা গায়- ‘কলসি গড়ায়া দেও ওরে নাগর,/ কলসি গড়ায়া দেও ওরে।/ কলসির ভেতরে লেইখ্খা গো দিও,/ বেইলা সখীর নাম ও রে।’

কলসি শুধু ভাঙার বদল নয়। এখানে নাম লিখে দেওয়া কলসি, স্মৃতির বস্তুও বটে। কলসি নিয়ে আরও বাক্য প্রচলিত। এর একটি ‘মারিলি কলসির কানা তাই বলে প্রেম দিব না।’ 

একদিন শ্রী চৈতন্য মহা প্রভু শ্রী নিত্যানন্দ প্রভু আর হরিদাস ঠাকুর নগর কীর্তনে বের হলেন। দুজনে উচ্চেঃস্বরে হরিনাম কীর্তন করতে করতে নবদ্বীপের পথে চলছিলেন। তাদের এই নাম কীর্তনে বাধ সাদল শাক্ত অনুসারী জগদানন্দ ও মাধবানন্দ ওরফে জগাই-মাধাই। নবদ্বীপের কিছু অংশের জমিদারি ছিল এদের। সর্বদা মদের কলসি ছিল এদের সঙ্গী। নিত্যানন্দ আর হরিদাসের হরিনাম জপ বন্ধ করতে মাধাই তার হাতে থাকা মদের কলসি ভেঙে তার কানা নিত্যানন্দ প্রভুর দিকে ছুড়ে মারল। সঙ্গে সঙ্গে প্রভুর কপাল কেটে রক্ত বেরোতে লাগল। নিতাই বিন্দুমাত্র সংকোচ না করে মাধাইকে আলিঙ্গন করে বললেন, কলসির কানা মেরেছিস আমায়, তাই বলে আমি তোকে প্রেমভক্তি দিব না।

এমন অনেক গানে-পৌরাণিক কাহিনীতে আমরা কলসির ব্যবহার পাই। পৃথিবীতে যত কলসি বা কুম্ভ পাত্রের ব্যবহার দেখি, এর বেশির ভাগই ধর্মীয়। গ্রিক সভ্যতায় বিধাতার প্রণতিতে কলসি ব্যবহারের প্রমাণ মেলে। ২০১১ সালে ইসরায়েলে ১৩০০ শতাব্দীর কলসের সন্ধান পাওয়া গেছে। 

মৌর্য থেকে গুপ্তযুগে কলসি ব্যবহারের কথা জানা যায়। আড়াই হাজার বছর আগেও কলসি ব্যবহারের প্রচলন ছিল। মহেঞ্জোদারোর মৃৎপাত্র ইতিহাসে প্রাচীনতম নিদর্শন। বৈদিক যুগে আর্যরা মৃন্ময় সামগ্রী স্থায়ীভাবে ব্যবহার করত। পরবর্তী সময়ে মৃৎপাত্র একবার ব্যবহার করার রীতি প্রচলিত হয়। চন্দ্রকেতুগড়ের লোকেরাও এ রীতি গ্রহণ করে। তাই এখানকার সর্বত্র অসংখ্য মৃৎপাত্রের টুকরা পাওয়া যায়। 

হরপ্পা সভ্যতার ব্রোঞ্জের হাঁড়ি

খ্রিস্টপূর্ব ৮০০০ থেকে ৪০০০ অব্দ নব্যপ্রস্তর যুগে চাকা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে মানুষ অনন্য এক শিল্পের যুগে প্রবেশ করে। এ সময় রোমান বা মিনোয়ান, মেসোপটেমিয়ান, সিন্ধুসভ্যতায়ও মাটির কুম্ভ পাত্র ব্যবহারের প্রমাণ মিলে। এ সময় বড় বড় সভ্যতায় ধনসম্পদ রাখার কাজে মাটির কলসি ব্যবহার করা হতো। ঐতিহাসিক প্রত্নস্থান খননে এর প্রমাণও মিলছে।

৫০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে ইরাকের প্রাচীন সভ্যতা মেসোপটেমিয়ায় চাকা আবিষ্কৃত হয়।  ধারণা করা হয়, শুরুতে কুমারদের কাজে মাটির ব্যবহার ছিল।চাকা আবিষ্কারের ফলে কুম্ভ শিল্পে যুগান্তকারী উন্নয়ন সাধিত হয়। ১৬০০ ও ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে গড়া তাপনিয়ন্ত্রক ঘর নির্মাণে কলসির ব্যবহার মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা প্রমাণ করে। কিছুকাল আগে বিক্রমপুরে ইদ্রাকপুর কেল্লা ও চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় হাজী শরীয়ত উল্লাহ সওদাগর নির্মিত বাড়ির মেঝের কথা উল্লেখ করা যায়। যা প্রত্ন খননের সময় পাওয়া গেছে। 

ইংরেজ শাসনামলে ঢাকার প্রথম সিভিল সার্জন ডা. জেমস ওয়াইজ তার লেখায় বলেছেন, ‘পূর্ববঙ্গে কুমারদের উৎপত্তি নিয়ে একটি কাহিনী প্রচলিত আছে। শিবের বিয়েতে একটি জলের পাত্র বা ঘটের প্রয়োজন হয়, কিন্তু কেউ সেটা দিতে পারেনি। শিব তখন তার গলার মালা থেকে একটি গুটি বের করে নেন এবং সেই গুটি থেকে একজন কুমার সৃষ্টি করেন। সেই কুমার মাটি ছেনে, শিবের বিয়ের ঘট তৈরি করে দেন। শিবের গলার গুটি থেকে জন্ম নেওয়ার কারণে কুমারদের আর এক নাম রুদ্র।’ 

কুম্ভ, মাটির কলসি, কুম্ভ নিয়ে গঙ্গা ও কুম্ভ সংস্কৃত শব্দ যার বাংলা মাটির কলসি। হিন্দু, জৈন ও বৌদ্ধ পুরাণ অনুযায়ী কুম্ভ হলো গর্ভের প্রতীক, যা প্রতিনিধিত্ব করে উর্বরতা, জীবন, মানবজাতির উৎপাদনশীল শক্তি ও ভরণ-পোষণ। কলসির ভিন্ন রূপ দেবী, গঙ্গা দেবীর সঙ্গে যুক্ত। 

হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী শিবের বিবাহ অনুষ্ঠানে প্রজাপতি প্রথম কুম্ভ সৃষ্টি করেছিলেন, সুতরাং তিনিই প্রথম কুম্ভরা, মৃৎশিল্পী বা মৃন্ময়শিল্পী। অন্য জনশ্রুতি বলে, প্রথম সমুদ্র মন্থন করে অমৃত সঞ্চার করার জন্যে সর্বপ্রথম মৃৎপাত্র বানিয়েছিলেন বিশ্বকর্মা নিজে।


হিন্দু পুরাণ ও ধর্মশাস্ত্রে পাওয়া যায়, কুম্ভ থেকেই মানবজাতির জন্ম হয়েছে। ঋষি অগস্ত্য কুম্ভের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বিভিন্ন ধর্মীয় রীতি ও আচার অনুষ্ঠানে কুম্ভ অথবা কলসি জল ও গাছের পাতা দিয়ে ভরে, জটিল মূলভাবের জিনিস কিংবা অনেক সময় গয়না দিয়ে সাজিয়ে জাঁকজমক করা হতো, যা ভারতবর্ষে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিধি ছিল। এসব আচার-অনুষ্ঠান এখনও ভারতে বিদ্যমান। 

কুম্ভকার শব্দের অর্থ কুম্ভ অর্থাৎ কলসি গড়ে যে শিল্পী। কুমারেরা মিলে যে পাড়ায় থাকেন তাকে বলে কুমারপাড়া বা কুমারটুলি। কুমাররা গোল আকৃতির জিনিস বানানোর জন্য একটি ঘুরন্ত চাকা ব্যবহার করেন, যাকে প্রচলিত ভাষায় ‘চাক’ বলে। চাক ঘুরিয়ে মাটির সব পণ্য তৈরি হলেও এখন বৈদ্যুতিক মোটর ঘুরিয়ে মাটির জিনিস তৈরি করা হয়। 

মূল মাটির অংশকে বলা হয় মৃন্ময়। মৃৎশিল্পের প্রধান উপাদান কাদামাটি। মৃৎশিল্প তৈরিতে আদর্শ মাটি শুধু কিছু ভৌগোলিক এলাকায় পাওয়া যায়; যা দিয়ে তৈরি পণ্য এক অনন্য স্থানীয় মৃৎশিল্প রূপে গণ্য হয়। যেমন মটকি তৈরির জন্য ফতেহপুর, খেলনার জন্য বিক্রমপুর, হাঁড়ি-কুড়ির জন্য বরিশাল ও নড়াইল।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা