রায়হান আবিদ
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৩ ১২:৪৪ পিএম
মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গভীরে হাম হাম জলপ্রপাতের অবস্থান। ২০১০ সালের শেষে পর্যটন গাইড শ্যামল দেববর্মাকে সঙ্গে নিয়ে একদল পর্যটক এই অনিন্দ্যসুন্দর জলপ্রপাতটি আবিষ্কার করেন। স্থানীয়দের কাছে এটি চিতা ঝরনা হিসেবে পরিচিত।
তাদের মতে, এই জঙ্গলে আগে চিতা বাঘ পাওয়া যেত। সেই হাম হাম জলপ্রপাত ভ্রমণে আমরা বাকৃবির একদল শিক্ষার্থী যাত্রা শুরু করি। বাজে রাত ১০টা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাম হামের উদ্দেশে রওনা দিই আরমান, বিপা, অবনী, প্রিতম, সাদিক, বাকিয়া, অমি, লিজা ও অর্পা। ঘুরতে যাওয়ার আনন্দে সবার চোখ থেকে ঘুম পালিয়ে গেল। ভোর ৪টা বাজে আমরা শ্রীমঙ্গল পৌঁছাই। চোখে তখন আধো আধো ঘুম। আগে থেকেই বুকিং দিয়ে রাখা চাঁদের গাড়ি নিয়ে রওনা হই হামহামের উদ্দেশে। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে মোটামুটি এক ঘণ্টার রাস্তা। প্রায় ১৪০ ফিট উঁচু এই ঝরনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্যে সমগ্র বাংলাদেশ থেকে মানুষ ছুটে আসে।
চাঁদের গাড়ি চলছে শ্রীমঙ্গল দিয়ে। চা-এর শহর শ্রীমঙ্গল। যতদূর পর্যন্ত দেখা যায় শুধু চা-বাগান আর চা-বাগান। এ যেন কোনো রূপকথার রাজ্য। সেই রাজ্যের মধ্য দিয়ে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে চাঁদের গাড়ি যাচ্ছে। চারপাশের এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চাঁদের গাড়ির মধ্যে বসে থেকে উপভোগ করা অসম্ভব। তাই সবাই উঠে গেলেন চাঁদের গাড়ির ছাদে। বাতাসের ঝটকা যেন উড়িয়ে নেওয়ার জোগাড়। আর পাহাড়ি একেকটি বাঁকে হৃৎপিণ্ড যেন হঠাৎ হঠাৎ থমকে যাচ্ছিল।
আগের দিন বৃষ্টি হওয়ায় যাওয়ার রাস্তা বেশ পিচ্ছিল ছিল। এবার চাঁদের গাড়ি থেকে নেমে হাম হাম জলপ্রপাতে পর্যন্ত পৌঁছাতে মোটামুটি চার কিলোমিটার পাহাড়ি পথ ট্র্যাকিং করতে হয়েছে। মাটিতে পা চেপে ধরে এগোতে হচ্ছিল। মনে সংশয় ছিল বৃষ্টি নামলেই এ রকম জায়গাগুলোতে পাহাড়ি ঢল নামে। চারদিকে পাহাড় আর পাহাড়। ঝপঝপ শব্দে ঝরনা দিয়ে সমান ধারায় পানি আছড়ে পড়ছে। সবাই সাপোর্ট হিসেবে একটি করে বাঁশ নিল এবং সবাই পায়ে এংলেট পড়ে পাহাড়ি পিচ্ছিল পথের দিকে চলতে থাকে।
হাম হামে ট্র্যাকিং করা খুব কঠিন। বারবার পাহাড়ে ওঠানামা, ছোট ছোট বাঁক, পাহাড়ি পথ পারি দিয়ে আবার কখনও পিচ্ছিল পাথর ডিঙিয়ে তারা পৌঁছায় সেই কাঙ্ক্ষিত জলপ্রপাতের কাছাকাছি। দূর থেকেই শোনা যায় পাথরে আছড়ে পড়া ঝরনার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। এর মধ্যে হঠাৎ এক অঘটন ঘটে। অবনীর পায়ে জোঁক কামড়ে ধরেছে। তাড়াতাড়ি করে আরমান হিরোর মতো দৌড়ে এসে একটানেই ছাড়িয়ে নিয়ে জোঁকটা ছুড়ে ফেলে দিল। অবশেষে আবারও হাঁটতে হাঁটতে তারা চলে আসেন ঝরনার একদম মুখোমুখি।
অর্পা বলেন, এই সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। হতবাক হয়ে কয়েক মিনিট আমরা তাকিয়ে ছিলাম ঝরনার অকৃত্রিম সৌন্দর্যের দিকে। প্রকৃতি আসলে কতটা ভয়ংকর সুন্দর হতে পারে তা এর কাছাকাছি গেলেই বোঝা যায়। প্রায় দেড় ঘণ্টার কষ্টকর ট্র্যাকিংয়ের ক্লান্তি এক নিমিষেই উধাও হয়ে গেল আমাদের। সবাই সেখানে ঝরনার পানিতে নামি। ফেরার পথে নামল বৃষ্টি। বৃষ্টিতে পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল হয়ে যায়। তবে বৃষ্টিতে ভেজা রূপকথার পাহাড়ি দৃশ্যগুলো উপভোগ করতে ভোলেনি কেউ।