রফিকুল আলম
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৩ ১২:৩২ পিএম
এগারো শিব মন্দিরের কয়েকটি মন্দির
যশোরের অভয়নগর উপজেলার অভয়নগর গ্রামে ভৈরব নদের তীরে ২৭৩ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে স্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শন একাদশ শিবমন্দির আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পূর্ব-পশ্চিমে প্রত্যেক দিকে প্রতি সারিতে চারটি করে মোট আটটি এবং সদর তোরণের দুই পাশে দুটি- মোট ১১টি মন্দির। নাম একাদশ শিবমন্দির।
মন্দিরগুলো অনুপম কারুকার্যময়। নির্মাণশৈলী অপূর্ব। মন্দিরের গায়ে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১৭৪৫ থেকে ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত যশোরের চাঁচড়ার রাজা ছিলেন নীলকণ্ঠ রায়। তিনি ১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে দ্বাদশ শিবমন্দির নির্মাণ করেন। যশোর শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অভয়নগর উপজেলার রাজঘাট এলাকা। রাজঘাটের উত্তরপাশে পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে গেছে ভৈরব নদ। নদের উত্তরপাশে যশোরের অভয়নগর উপজেলার অভয়নগর গ্রাম। গ্রামের ভৈরব নদের তীরে গাছগাছালির মধ্যে এক আঙিনায় সারি সারি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ১১টি শিবমন্দির দূর থেকে নজরে পড়ে।
অভয়নগর গ্রামের মাধবচন্দ্র বর্মণ (৮৮) বলেন, ‘এক আঙিনায় ১১টি মন্দির খুব একটা দেখা যায় না। মন্দিরগুলো আমাদের ঐতিহ্য। এক সময় মন্দিরে নিত্য পূজা হতো। গ্রামের প্রাণকেন্দ্র ছিল মন্দির প্রাঙ্গণ। মাঝে মন্দিরগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। সংস্কার করায় বর্তমানে মন্দিরগুলো কিছুটা প্রাণ ফিরে পেয়েছে।’ প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্রের ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থের (১৯১৪ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত) দ্বিতীয় খণ্ডে ‘চাঁচড়া রাজবংশ’ অধ্যায়ে অভয়নগর একাদশ শিবমন্দিরের উল্লেখ আছে। ওই বর্ণনা অনুযায়ী, এই স্থানটি অভয়া নামের বিধবা রাজকন্যার সম্পত্তিভুক্ত করে দেওয়া হয় বলে এর নাম অভয়নগর।
ভাস্কর পণ্ডিত নামক দুর্দান্ত সেনানীর অধীন মারহাট্টা বাবর্গী সৈন্য বর্ধমান অঞ্চল আক্রমণ করে। একেই ‘বর্গীর হাঙ্গামা’ বলে। ১৭৪২ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত বাংলায় ১২ বারবর্গীর আক্রমণ হয়। বর্গীর উৎপাতে যখন বঙ্গভূমি উচ্ছন্নে যেতে বসেছিল, তখন পশ্চিমবঙ্গের রাজন্যবর্গ ভয়ে যে যেখানে পারছিলেন পালাচ্ছিলেন। অনেকে দেশ ছেড়ে পূর্বাঞ্চলে আশ্রয় নিলেন। এ সময় চাঁচড়ার রাজা ছিলেন নীলকণ্ঠ রায় (১৭৪৫-১৭৬৪)। রাজা তার দেওয়ান হরিরাম মিত্রকে ভৈরব নদের তীরে গড় বেষ্টিত রাজবাটি নির্মাণের আদেশ দিলেন। রাজার সে আদেশ মোতাবেক অভয়নগর উপজেলার অভয়নগর গ্রামে রাজবাটি ও শিবমন্দির গড়ে ওঠে। রাজবাটি ও একাদশ শিবমন্দির ছিল পরিখা বেষ্টিত।
একদিকে ভৈরব নদ এবং অন্য তিনদিকে গড়খাই। মন্দিরগুলো বেশ দৃঢ় এবং বড় মন্দিরটি দেখতে বেশ সুন্দর। এই মন্দিরের সামনে সাধারণ পদ্ধতিমতো তিনটি খিলানের পশ্চাতে বিস্তৃত খোলা বারান্দা এবং ভেতরে গর্ভমন্দির। দুইপাশে বিস্তৃত আবৃত বারান্দা আছে। মন্দিরগুলোর চারপাশ প্রাচীর বেষ্টিত। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, খুলনা সূত্র জানায়, খুলনা বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পুরাকীর্তি সংস্কার, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ২০১৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৮১ লাখ ৪৮ হাজার ৫৮৪ টাকা ব্যয়ে একাদশ শিবমন্দিরের সংস্কার, সংরক্ষণ ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়।
একাদশ শিবমন্দিরের সেবাইত খুকুরানী দে বলেন, ‘যশোরের চাঁচড়ার রাজা নীলকণ্ঠ রায় তার মেয়ে অভয়াকে এখানে মন্দির করে দিয়েছিলেন। আগে এখানে নীলের চাষ হতো। রাজা এসে নদী দেখে এখানে মন্দিরটি নির্মাণ করেন। ভৈরব নদের ঘাটে সবাই পূজা দিতে পারবে। তার নামেই এই গ্রামের নাম হয় অভয়নগর। সরকার থেকে মাঝে মাঝে এসে দেখে যায়, সংস্কার করে। আমার পরিবার থেকে ১৩০ বছর ধরে এই মন্দিরের সেবা করে আসছে।’
একাদশ শিবমন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি মিলন কুমার পাল বলেন, ‘নির্মাণের পর থেকে শিবমন্দিরটির সংস্কার হয়নি। এ জন্য শিবমন্দিরটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। পরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর শিবমন্দিরটি সংস্কার-সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। তবে শিবমন্দিরটি সংস্কার-সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর শিবমন্দির পরিচালনা কমিটির সঙ্গে কোনোরকম আলোচনা করেনি। তারা তাদের মতো করে কাজ করেছে। শিবমন্দিরের সংস্কার-সংরক্ষণ কাজ ঠিকমতো করা হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর শিবমন্দির প্রাঙ্গণে নামযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। চৈত্র মাসের শেষদিন মন্দির প্রাঙ্গণে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা হয়। এসব অনুষ্ঠানে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন এখানে আসেন। তা ছাড়া প্রতিদিন অনেক লোক শিবমন্দির দেখতে আসেন।’
যেভাবে যাবেন
ঢাকা হতে খুলনায় সরাসরি বাস ও ট্রেন সার্ভিস রয়েছে। অভয়নগর উপজেলা পরিষদ হতে নওয়াপাড়া ট্রেনস্টেশনের দূরত্ব ১ কি মি প্রায়। অভয়নগর শহর হতে ভৈরব নদ পার হয়ে মোটরসাইকেল বা ট্রেকারযোগে বাঘুটিয়া ইউনিয়নে গেলেই প্রাচীন ঐতিহ্য ১১ শিবমন্দির দেখতে পাওয়া যাবে।