চুইঝাল
আকেল হায়দার
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৩ ১১:২৮ এএম
চুইঝালের জন্য বিখ্যাত খুলনার কামরুল হোটেলের মালিক কামরুল ইসলাম সরদার
চুইঝাল সপুষ্পক প্রজাতির এক ধরনের লতা। চুইঝাল ও পান মূলত একই প্রজাতির। চুইঝাল গাছ দেখতেও অনেকটা পানগাছের মতো। এর কাণ্ড ও লতা কেটে মাছ ও মাংস রান্নায় মসলা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরে চুইঝাল পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও নড়াইলে মসলা হিসেবে চুইঝাল বেশ জনপ্রিয়। এর অনেক রকম রাসায়নিক উপাদান ও ঔষধি গুণ আছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ উপকারী।
দক্ষিণাঞ্চলে গরু বা খাসির মাংসে এর ব্যবহার ও রসনাবিলাস দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে। অনেক আগে থেকে চুইঝাল খাবারে ব্যবহার করা হলেও এটা কেবল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে কালের বিবর্তন ও সময় পরিক্রমায় চুইঝালে রান্না করা খাবার এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাদের ভিন্নতার কারণে ভোজনরসিকদের কাছেও বেড়েছে এর ব্যাপক চাহিদা।
দেশের অন্যান্য জেলা থেকে কেউ খুলনা এলে চুইঝালের খাবার খাবে না, এটা হতেই পারে না।

চুইঝালের প্রসঙ্গ এলে দুজন মানুষের নাম সবার কাছে ঘুরে-ফিরে আসে। যাদের হাত ধরে চুইঝালের রসনাবিলাস সবার কাছে পরিচিতি লাভ করেছে। এদের একজনের নাম আব্বাস আলী মোড়ল। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজারে অবস্থিত আব্বাস আলীর আব্বাস হোটেল সর্বপ্রথম তরকারিতে উপকরণ হিসেবে চুইঝালের ব্যবহার শুরু করে। জানা যায়, আজ থেকে ছয় যুগ আগে ভারতের মাদ্রাজ থেকে রান্না শিখে এসে আব্বাস আলী নিজের মতো করে মসলা দিয়ে নানানরকম খাবার তৈরি করতেন। দারুণ স্বাদ ও মুখরোচক হওয়ার কারণে অল্প দিনের মধ্যে তার খাবারের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে চুকনগরসহ খুলনা অঞ্চলের সবখানে। নিত্যনতুন রান্নার কৌশল চর্চা করতে গিয়ে একসময় তিনি প্রচলন করেন চুইঝাল দিয়ে খাসির মাংস রান্নার কৌশল। তার অন্যান্য খাবারের মতো এই খাবারও বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে স্থানীয় মানুষের কাছে। সেই থেকে চুইঝালের নাম চলে আসে জনপ্রিয় খাবারের তালিকায়।
আব্বাস আলীর মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৩০ বছর। মৃত্যুর আগে তিনি তার এই চুইঝাল রান্নার কৌশল ছেলেদের শিখিয়ে দিয়ে যান। এখন তার ছেলেরা ও ভাইয়ের সন্তানরা মিলে এই হোটেল ব্যবসা পরিচালনা করেন।
খুলনায় চুইঝাল দিয়ে খাসির মাংস রান্না করে আব্বাস আলী বিশেষ পরিচিতি পেয়েছিলেন। তবে গত কয়েক দশক ধরে আব্বাস আলীর নামের সঙ্গে আরেকটি নাম অনেকের কাছে বেশ পরিচিত। তিনি হলেন কামরুল ইসলাম সরদার। সাতক্ষীরা রোডের জিরো পয়েন্টে অবস্থিত এই কামরুল হোটেল। খুলনাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে আসেন কামরুল হোটেলের চুইঝাল খেতে। যখনই যাওয়া হোকনা কেন বসার জায়গা পেতে এখানে বেশ ঝক্কি পোহাতে হয়। অবশ্য খাবার মুখে দিলে সেই ঝক্কি-ঝামেলার কথা আর মনে থাকে না।

জীবনের প্রথম ভাগে ভ্যানগাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন কামরুল। অমানুষিক কষ্ট ও পরিশ্রম সহ্য করতে না পেরে একসময় সিদ্ধান্ত নেন খাবার হোটেল দেবেন। সেই থেকে শুরু। সঙ্গে সংযোজিত হয় চুইঝাল দিয়ে রান্না করা গরুর মাংস। কামরুল ইসলাম জানান প্রতিদিন এক থেকে দেড় মণ গরুর মাংস রান্না হয় তার হোটেলে, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। নিজ হাতে চুইঝাল মাংস রান্না করেন তিনি। উপকরণ, রান্না, পরিবেশন সবকিছু নিজেই তদারকি করেন। কামরুল হোটেলে যারা কাজ করেন তারা সবাই তার আত্মীয়-পরিজন ও পরিবারের সদস্য। নিজের দুই ছেলেকেও তিনি সম্পৃক্ত করেছেন তার হোটেল ব্যবসায়। চুইঝাল দিয়ে রান্না করা মাংস খুলনা অঞ্চলের খাবার হলেও বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও দেশের আরও বেশ কিছু জায়গায় এই খাবার দেখতে পাওয়া যায়।