ফারহাত মাইশা অর্পা
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৩ ১৩:১১ পিএম
আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৩ ১৯:৫৭ পিএম
বাংলাদেশ থেকে ৯ বাংলাদেশি তরুণ বিশেষ সম্মাননার জন্য মনোনীত হয়েছেন
সামাজিক কাজের সঙ্গে জড়িত বিশ্বব্যাপী ৯ থেকে ২৫ বছর বয়সি তরুণদের ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়ে থাকে। এ বছর বাংলাদেশ থেকে ৯ বাংলাদেশি তরুণ এই বিশেষ সম্মাননার জন্য মনোনীত হয়েছেন। তাদের গল্প জানাচ্ছেন ফারহাত মাইশা অর্পা
সমাজসেবী বিভিন্ন কাজ ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রিন্সেস ডায়ানা। সামাজিক যেকোনো কাজে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ রাজপরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়ে থাকে বিশেষ সম্মাননা। প্রিন্সেস ডায়ানার স্মরণে ১৯৯৯ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ৯ থেকে ২৫ বছর বয়সি সামাজিক কাজের সঙ্গে জড়িত তরুণদের এই অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়ে থাকে। এ বছর বাংলাদেশ থেকে ৯ বাংলাদেশি তরুণ এই বিশেষ সম্মাননার জন্য মনোনীত হয়েছেন। গত ৩০ জুন প্রকাশ করা হয়েছে মনোনয়নপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকা। তারা হলেন- আহনাফ আবরার হোসেন, আব্দুল্লাহ আল হাসান দিপ্ত, নিশাত সুলতানা চৌধুরী, জহির রায়হান, শেখ শোয়াইবুর রহমান, জ্যোতির্ময়ী দাশ নোভা, এসএম মবিন সিকদার, ঋতুরাজ ভৌমিক ও এমএম ফারহান ফাইয়াজ।

আহনাফের ‘ভরসাস্থল’
সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে ২০১৯ সালের দিকে আহনাফ ও তার বন্ধুরা মিলে প্রতিষ্ঠা করেন নন-প্রফিট অরগানাইজেশন ‘ভরসাস্থল’। বাংলাদেশের ১০টি জেলার প্রায় ৩০ হাজার সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে বিশুদ্ধ খাবার পানি, টিউবওয়েল, ভ্যান, সেলাই মেশিনসহ অন্যান্য অনুদান দিয়ে সাহায্য করেছে তারা। তারা প্রত্যেকেই ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। করোনাকালীন সময়ে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও শীতের সময়ে অসহায় মানুষকে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকেন তারা। আহনাফ আবরারের উদ্যোগে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ছাত্রদের এ ধরনের মানবসেবায় উৎসাহিত করতে শুরু করেছেন ‘DRMC সোশ্যাল ক্লাব’। বয়স কম হলেও ভরসাস্থল সংগঠনের সদস্যরা যেকোনো পরিস্থিতিতে অসহায় ও দুস্থ মানুষদের সাহায্য করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

হাসানের ‘পথচলা ফাউন্ডেশন’
আবদুল্লাহ আল হাসান গড়ে তুলেছেন নিজের সামাজিক সংগঠন ‘পথচলা ফাউন্ডেশন’। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন তিনি। বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন ও উন্নততর জীবনমান নিয়ে কাজ করছেন তিনি। ‘পথচলা ফাউন্ডেশন’ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নানা সামাজিক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে। তবে বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দেশের ১৬টি জেলায় বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণদের সাবলম্বী ও সচেতন করতে কাজ করছেন তিনি। ‘পথচলা ফাউন্ডেশন’ পেয়েছে বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড। এসবের মধ্যে অন্যতম শেখ হাসিনা ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড, জয় বাংলা ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ও জাতিসংঘ আইভিডি অ্যাওয়ার্ড।

জ্যোতির্ময়ীর সংগঠন ‘ওয়াইজ’
জ্যোতির্ময়ী দাশ প্রতিষ্ঠা করছেন সামাজিক সংগঠন WISE (We in science & Engineering)। ২০১৭ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে কাজ করছেন তিনি। মূলত তরুণদের তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞান দিয়ে সাহায্য করছেন তিনি। করোনাকালীন সময়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞান দিয়ে সমাজে ইতিবাচক ও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল তার এই প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়াও জ্যোতির্ময়ী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিনোদন ও অন্যান্য সৃজনশীলতামূলক কাজের প্রসারে কাজ করছেন।

রায়হানের ‘ইয়ুথ ফর চেঞ্জ’
‘ইয়ুথ ফর চেঞ্জ’ সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা জহির রায়হান কাজ করছেন লিঙ্গবৈষম্য নিরসন, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ নিয়ে। তার এ কাজের জন্য একাধিক পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি। যেমন- জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড, সার্টিফিকেশন ফর ডিস্টিংশন, শেখ হাসিনা ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ডসহ আরও অন্যান্য। এ বছর ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড ২০২৩-এর জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি।

কৃষি নিয়ে কাজ করেন শোয়াইবুর
AGSS সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা শেখ শোয়াইবুর রহমান কাজ করছেন কৃষিক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি, ডিজিটালাইজেশন, উদ্ভাবন ও কৃষিপ্রযুক্তির বিকাশ নিয়ে। শেখ শোয়াইবুরের এ উদ্যোগ বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে আসবে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তারা কাজ করছেন কৃষকদের উন্নত কৃষিপদ্ধতি ও কৃষিপ্রযুক্তি নিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে। এতে করে আমাদের দেশের কৃষকরা যেমন অধিক ফসল উৎপাদন করতে সক্ষম হবেন, অন্যদিকে দেশের মানুষও উপকৃত হবেন। এর বাইরে পরিবেশবিষয়ক নানা কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছেন তিনি।

চমক দেখিয়েছে সর্বকনিষ্ঠ ঋতুরাজ
এ বছর ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন পেয়েছে ১০ বছর বয়সি ঋতুরাজ ভৌমিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয় বাবা-ছেলের জুটি বাপকা-বেটা ব্যান্ড নিয়ে কাজ করছে সে। ইতোমধ্যে বিশ্বের কনিষ্ঠতম লেখক হিসেবে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে সে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আর্থিক তহবিলে অর্থ সংগ্রহ করে এসব শিশুর শিক্ষার কাজে ব্যবহার করছে সে। তার বই বিক্রির সম্পূর্ণ অর্থ এ তহবিলে দিয়ে অসহায় শিশুদের শিক্ষার প্রসারে কাজ করছে সে। ঋতুরাজ বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। বাংলাদেশ থেকে ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীতদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ঋতুরাজ।

অসহায় মানুষের পাশে ফাইয়াজ
ফারহান ফাইয়াজের উদ্যোগের নাম ‘পরিকল্পনা ফাউন্ডেশন’। তারা কাজ করছেন অসহায় মানুষদের খাদ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসা সুবিধা দিয়ে সহায়তা করতে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১৪ হাজার ইউএস ডলার সংগ্রহ করে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তারা। এ বছর ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড ২০২৩-এর জন্য বাংলাদেশ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন ফারহান ফাইয়াজ।

বিজ্ঞান চর্চার প্রসারে মবিন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ছাত্র এসএম মবিন সিকদার। তার উদ্যোগের নাম বিজ্ঞানবিষয়ক কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘সায়েন্স বী’। তরুণদের বিজ্ঞান চর্চায় আগ্রহী ও মনোযোগী করে তুলতে কাজ করছে তাদের এই সংগঠনটি। ২০১৮ সালে ‘অরবিটাল’ ম্যাগাজিন প্রকাশের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এ সংগঠনটি। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞানভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘অরবিটাল’ নির্মাণ করেছেন তিনি। এ ওয়েবসাইটের সঙ্গে যুক্ত আছেন প্রায় ২ লাখ শিক্ষার্থী এবং প্রতিদিন ৪০ হাজার শিক্ষার্থী তাদের এ ওয়েবসাইটে বিজ্ঞান চর্চার সুযোগ পাচ্ছেন। দেশের বাইরের শিক্ষার্থীদেরও বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার জন্য আগ্রহী করে তুলতে কাজ করছেন তারা। নানা সামাজিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার প্রসারে নিরলস পরিশ্রম করছেন মবিন সিকদার ও সহযাত্রীরা।

নিশাতের ‘এক টাকায় শিক্ষা’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিশাত সুলতানা চৌধুরী কাজ করছেন সুবিধাবঞ্চিত ও ছিন্নমূল শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে। সহপাঠী মো. রিজুয়ানকে নিয়ে ২০১৭ সালে শুরু করেছিলেন ‘এক টাকায় শিক্ষা’ সংগঠনটির যাত্রা। সেই থেকে এগিয়ে চলা। এখন পর্যন্ত প্রায় চার হাজারের অধিক সুবিধাবঞ্চিত শিশুর শিক্ষাসুযোগ নিশ্চিত করতে পেরেছে এ সংগঠনটি। পেয়েছেন জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড, এসডিজি জিনিয়াস চ্যাম্পিয়ন অ্যান্ড বেস্ট আইডিয়া অ্যাওয়ার্ডসহ একাধিক সম্মাননা। এ বছর বাংলাদেশ থেকে ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড ২০২৩-এর মনোনয়নপ্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন নিশাত সুলতানা চৌধুরী।