দেবাশীষ দত্ত
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৩ ১২:৫৯ পিএম
‘আমি কোথায় পাব তারে/আমার মনের মানুষ যে রে…’ এ গানটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে গগন হরকরার নাম। শুধু তাই নয়, ওই গান থেকেই সুর নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটা গান লিখেছেন। সেই গানই এখন আমাদের জাতীয় সংগীত। অর্থাৎ জাতীয় সংগীতের সুরকারও তিনি। এই বাউল কবি ও গায়ক গগন হরকরা নামে পরিচিত হলেও তার পারিবারিক নাম গগনচন্দ্র দাস। শিলাইদহের পোস্ট-অফিসে ডাক-হরকরার কাজ করতেন। তাই এ পেশার সুবাদেই তিনি লোকের কাছে ‘গগন হরকরা’ নামে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। এই লোককবির মৃত্যুর শত বছরেরও বেশি সময় পরে এসে তার স্মৃতি রক্ষার্থে একটা ম্যুরাল স্থাপন করা হয়েছে। যেটির অবস্থান কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শিলাইদহের কুঠিবাড়িসংলগ্ন বেলগাছি মোড়ে। উদ্বোধন হয় এ মাসের ১১ তারিখে।
নীল আকাশের নিচে খোলা প্রান্তরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই ম্যুরালের গায়ে ‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’ গানটিও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এর নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকারী কুমারখালী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শিল্পী বিতান কুমার মণ্ডলের সঙ্গে কথা হয়। তার কাছে এ শিল্পকর্মের থিম সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। তিনি জানান, ম্যুরালের বুকের ওপর একতারাটি তার শিল্পীসত্তার পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে হাতে লণ্ঠন ও বল্লম এবং পিঠে চিঠি বহন করা ব্যাগ তার পেশাকে নির্দেশ করছে।’
বাউল শিল্পীর অবয়ব দিয়ে গড়া ম্যুরালের সামনে এক দর্শনার্থীর সঙ্গে দেখা হয়। নাটোর থেকে এসেছেন। শিলাইদহের কুঠিবাড়ি থেকে ফিরছেন। দাঁড়িয়ে দেখে নিচ্ছেন তিনি। অনুভূতি জানতে চাওয়া হলে এই দর্শনার্থী বলেন, ‘বইপুস্তকে গগন হরকরার নাম অনেকেই পড়েছেন। কিন্তু ম্যুরালটি এখানে স্থাপন করার মানুষ রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত কুঠিবাড়ি যেতে-আসতে গগন হরকরাকে জানতে পারবে।’
আনুমানিক ১৮৪৫ সালে তৎকালীন পাবনা জেলার গোবরাখালি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই বাউলশিল্পী। যদিও এ গ্রামটি এখন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহের আড়পাড়া গ্রাম নামে পরিচিত। প্রথমে তিনি কৃষিকাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি তৎকালীন শিলাইদহের ডাকঘরের ডাক হরকরার চাকরি করতেন।
ম্যুরাল চত্বর থেকে ঘুরে গগন হরকরার জন্মস্থান গোবরাখালি গ্রামে গিয়ে তার ভিটেমাটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে লোকমুখে জানা যায়, ‘দুই যুগ আগেও গগনের ভিটা ও ফলের বাগানের অস্তিত্ব ছিল। শিলাইদহে গগন হরকরার একটি বড় ফলের বাগান ছিল এবং গগনের বাস্তুভিটায় আসামদ্দি নামক একজন কৃষক বাড়ি করে থাকতেন। সেই বাড়িটি আজও ‘দাসের ভিটা’ নামে পরিচিত। তার পিতা-মাতা সম্বন্ধে তেমন কোনো তথ্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে তার একটি ছেলের নাম কিরণ চন্দ্র ছিল বলে জানা যায়।
শিলাইদহ থেকে কুষ্টিয়া শহরে ফেরার পথে নিশান মোড়ে এসে চোখে পড়বে পিতল দিয়ে গড়া এক ভাস্কর্য। বাম হাতে হারিকেন ও বল্লম। বল্লমের আগার নিচে একটি ছোট ঘুণ্টি। ডান হাতে লাঠির মাথায় কাঁধে রাখা চিঠির বস্তা। মাথায় পাগড়ি, পরনে ধুতি। রাতের আঁধার ভেদ করে ক্ষিপ্রগতিতে ছুটে চলেছেন সামনের দিকে। উদ্দেশ্য, সঠিক সময়ে বার্তা পৌঁছে দেওয়া। পেশা তার ডাক হরকরা। ভাস্কর্যে তুলে ধরা হয়েছে ডাক হরকরার জীবন। ইতিহাসে ঠাঁই নেওয়া ডাক হরকরা পেশা আর এই জেলারই কৃতী সন্তান গগন হরকরাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে ২০১৬ পৌর কর্তৃপক্ষ এটি নির্মাণ করেছে।
এ ভাস্কর্য ও ম্যুারাল একদিকে যেমন সৌন্দর্য বাড়িয়েছে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হয়েছে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেওয়া এ জেলার কৃতী সন্তান গগন হরকরাকে। আনুমানিক ১৯১০ সালে পরলোকগমন করেন এই গুণী বাউল কবি ও শিল্পী।