নাকিব নিজাম
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৩ ১৪:৫৯ পিএম
সবুজ গাছগাছালি ভরা ভূমির বুক চিরে বয়ে গেছে ছবির মতো নদী। যে নদীর বুকে ভাসমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ফলের বাজার। নৌকায় করে শত শত মণ পেয়ারা আসে, আবার নৌকায় করেই কিনে নিয়ে যান অনেকে। জুলাই মাস থেকে পিরোজপুর, বরিশাল ও ঝালকাঠি জেলার পেয়ারা চাষিরা শত শত ছোট-বড় নৌকা নিয়ে হাজির হন এই ভাসমান বাজারে। লিখেছেন নাকিব নিজাম
এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম পেয়ারাবাজার গড়ে উঠেছে ঝালকাঠি, বরিশাল ও পিরোজপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায়। জেলাগুলোর ২৬টি গ্রামের প্রায় ৩১ হাজার একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে এই পেয়ারা বাগান। এসব জায়গার প্রায় ২০ হাজার পরিবার পেয়ারা চাষের সঙ্গে জড়িত। পানির ওপরেই গড়ে উঠেছে এই পেয়ারার বাজার, যেখানে প্রতিদিন পেয়ারার হাট বসে। নৌকায় করে শত শত মণ পেয়ারা আসে, আবার নৌকায় করেই কিনে নিয়ে যায় অনেকে।
জুলাই মাস থেকে পিরোজপুর, বরিশাল ও ঝালকাঠি জেলার পেয়ারা চাষিরা শত শত ছোট-বড় নৌকা নিয়ে হাজির হন ভাসমান বাজারে। বাগানের সেরা পেয়ারাগুলো দিয়ে ভর্তি থাকে প্রতিটি নৌকা।
পেয়ারাবাজার ভ্রমণের শুরুটা করা যেতে পারে সেখানকার পাশের বাগানগুলো থেকে, যেখানে পর্যটকদের জন্য রাখা হয়েছে আপ্যায়ন ব্যবস্থা। ভিমরুলিতে পৌঁছানোর পর ভাসমান বাজারের দৃশ্যটিই সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে। আঁকাবাঁকা নদী, পেয়ারাভর্তি নৌকা, খালের দুই ধারের সবুজাভ পরিবেশ সব কিছু একত্রে স্বর্গীয় অনুভূতি দেয়। বছরের আর্দ্র সময়টাতেও চিত্রটি ব্যতিক্রম নয়।

কীর্তিপাশা খাল দিয়ে ভাসমান বাজারে প্রবেশের পর খাল থেকে ভাসমান বাজারের সুন্দর দৃশ্য, দুই পাশের সারি সারি গাছ এত মনোমুগ্ধকর রাস্তা সৃষ্টি করেছে যে, মনে হয় আমাজন বনে আছি! এই দৃশ্য অবলোকন করতে হলে একটি ছোট নৌকায় যাওয়া যেতে পারে খালের ভেতরের দিকে। তাহলে ধীরপথে যেতে যেতে উপভোগ করা যাবে বাজারের ব্যস্তময় নির্মল পরিবেশ। দুপুরে খাওয়ার জন্য বাজারের পাশে আছে বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট। আর বাজারের কাছে বিশ্রামের জন্য পিরোজপুরে রয়েছে বোর্ডিং হাউস। তবে চাইলে বরিশালে হোটেলে থেকে পরে পিরোজপুরের উদ্দেশে যাত্রা করা যাবে।
গত কয়েক বছরে স্বরূপকাঠির ভিমরুলি গ্রামে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়েই চলেছে। যারা বাংলাদেশের আনাচকানাচে থাকা অসাধারণ স্থানগুলো ঘুরে দেখতে চায় তাদের জন্য এই ভাসমান বাজার একটি আদর্শ জায়গা। আপনিও যদি কোনো অনিন্দসুন্দর স্থানের দেখা পেতে চান তাহলে ঘুরে আসতে পারেন ভিমরুলি ভাসমান বাজার! সবুজ গাছের ছায়ায় শ্যামল পরিবেশ। আপনারা হয়তো ভেনিসের গল্প শুনেছেন। থাইল্যান্ডের ফ্লোটিং মার্কেটের ছবি দেখেছেন। আবার অনেকে কেরালার ছোট ছোট নৌকায় করে ভ্রমণ আর জীবনযাপনের গল্পও শুনেছেন। কিন্তু ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’ এই কবিতার মতো অবস্থা। নিজের দেশের ভাসমান বাজার হয়তো অনেকেরই ঘুরে দেখা হয়নি। আটঘর কুড়িয়ানা। নামটা শুনতে কেমন মনে হলেও জায়গাটা সত্যি অনেক মজার।

সবুজ গাছগাছালির পেট চিড়ে বয়ে গেছে ছবির মতো নদী। যে নদীর বুকে ভাসমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ফলের বাজার।বাংলাদেশের উৎপাদিত মোট পেয়ারার প্রায় ৮০ ভাগই উৎপাদিত হয় ঝালকাঠির বিভিন্ন গ্রামে। আটগর, কুড়িয়ানা, ডুমুরিয়া, বেতরা, ডালুহার, সদর ইত্যাদি এলাকার প্রায় ২৪ হাজার একর জমতে পেয়ারার চাষ হয়। প্রতি মৌসুমে এ বাজারে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার পেয়ারা বেচাকেনা হয়। এখন বর্ষাকাল। এখনই উপযুক্ত সময় এই ভাসমান বাজারে ভেসে ভেসে বেড়ানোর। এ সময় দেশের বৃহত্তর পেয়ারার বাজার বসে এই ভাসমান অঞ্চলে। ফলে বেড়ানোর পাশাপাশি রসনার তৃষ্ণাও মিটবে বেশ। গ্রামবাংলার সাধারণ এই গ্রামটি কীভাবে এত অপরূপ হয়ে যায় বর্ষায় তা ভাষায় প্রকাশ করা আসলেই সম্ভব নয়।
যাতায়াত
ঢাকা থেকে সড়ক ও নৌপথ দুই ভাবেই যাওয়া যায়। সড়কপথে ঢাকার গাবতলী থেকে বরিশালের বাস ছাড়ে ভাড়া ৪০০ টাকা। এ ছাড়া আপনি মাওয়া গিয়ে লঞ্চে বা স্পিড বোটে পদ্মা পাড়ি দিয়ে ওপাড়ে গিয়ে বিআরটিসি বাসে করে বরিশাল যেতে পারবেন। বরিশালের নতুল্লাবাদ থেকে বাসে অথবা সিএনজি গাড়িতে করে যেতে হবে বানারিপাড়া। সিএনজিতে ভাড়া নেবে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। তারপর সেখান থেকে নসিমনে ১৫ টাকা ভাড়া দিয়ে যাবেন কুড়িয়ানা। একটু হেঁটে একটা ব্রিজ পার হয়ে আবার ইজি বাইকে করে ৫ টাকা ভাড়ায় চলে যেতে পারবেন আটঘর ও কুড়িয়ানা বাজারে। আর ভিমরুলি যেতে চাইলে বানারিপাড়া থেকে নৌকা বা ট্রলারে যাওয়াই ভালো।
অথবা নৌপথে ঢাকার সদরঘাট ঠেকে প্রতিদিন পিরোজপুর-বরিশালের লঞ্চ ও স্টিমার ছাড়ে বিকেল ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত। ডেকের ভাড়া ২০০ থেকে ২৫০ টাকা আর কেবিন সিঙ্গেল ৭০০ থেকে এক হাজার ও ডাবল এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা। আপনি পিরোজপুরের হুলার হাট নেমে চলে যাবেন বানারিপাড়া। অথবা সরাসরি বানারিপাড়া ও নামতে পারেন লঞ্চে। বানারিপাড়া থেকে উল্লিখিত নিয়মে যেতে পারেন অথবা এখান থেকেই ট্রলার রিজার্ভ করে নিতে পারেন। ভিমরুলি, আটঘর, কুড়িয়ানাসহ আরও অনেক ছোট বাজার ও বাগান ঘুরিয়ে আনার জন্য ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা ভাড়া নেবে ছোট ট্রলারে আর বড় ট্রলার এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। অবশ্যই দামাদামি করে ভাড়া ঠিক করবেন।
কখন যাবেন
জুলাই থেকে আগস্ট মাসের প্রতিদিনই এই বাজার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত চলে।
কোথায় থাকবেন
আপনি দিনে গিয়ে দিনেও ফিরে আসতে পারেন। আর রাত যাপন করতে চাইলে বরিশাল নতুল্লাবাদ চলে আসতে পারেন। অথবা ঝালকাঠি শহরের দুয়েকটি হোটেল হলো কালিবাড়ী রোডে ধানসিঁড়ি রেস্ট হাউস, বাতাসাপট্টিতে আরাফাত বোর্ডিং, সদর রোডে হালিমা বোর্ডিং ইত্যাদি। ভাড়া ১০০ থেকে ২৫০ টাকা।
কোথায় খাবেন
ভিমরুল, আটঘর ও কুড়িয়ানা এসব বাজারের পাশেই খাবারের হোটেল আছে মোটামুটি মানের। অথবা জেলা সদরে ফিরে এসেও খাওয়াদাওয়া সেরে নিতে পারেন।

আশপাশের দর্শনীয় স্থান
ভাসমান পেয়ারা বাজার ভ্রমণের পাশাপাশি বরিশালের ঐতিহ্যবাহী গুঠিয়া মসজিদ ঘুরে আসতে পারেন ও সঙ্গে দুর্গা সাগর দিঘি। বানারিপাড়া থেকে বরিশাল আসার পথে সড়কের পাশেই অবস্থিত এই দুটি স্থান।
পরামর্শ