শওকত আলী রতন
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৩ ১৩:৫৩ পিএম
আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৩ ১৫:২৩ পিএম
মেঘলা আবহাওয়ার দিন। পেঁয়াজ-লঙ্কা কুচি কুচি করে কেটে মুড়ি দিয়ে মাখানো হলো। এর পর ভোজনরসিক বাঙালি খেতে বসে বলবে চানাচুর থাকলে স্বাদটা বেশি হতো। অর্থাৎ মুড়ির সঙ্গে চানাচুর চাই। এই মুখরোচক খাবারটি দেশের সর্বত্রই তৈরি হয়। তবে গুণে-মানে রয়েছে ভিন্নতা। তেমনি একজন উদ্যোক্তার হাত ধরে তৈরি হওয়া চানাচুরের কথা জানাব। যার চানাচুরের স্বাদ একবার গ্রহণ করলে বারবার এ চানাচুরের খোঁজ করতে হবে।
পদ্মা নদীবেষ্টিত ঢাকার দোহার উপজেলার লটাখোলা গ্রাম। ৭৫ বছর আগে এ গ্রামের রায় মোদকের ছেলে শ্রী যোগেশ মোদক নিজ উদ্যোগে যে চানাচুর তৈরি করেছিলেন, আজ তা যোগেশ কুড়ির চানাচুর নামে পরিচিত। যোগেশ কুড়ির দেখাদেখি লটাখোলা গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবাই জড়িত এ পেশার সঙ্গে। দোহারের বিখ্যাত যোগেশ কুড়ির ঝাল চানাচুরের সুনাম আছে এলাকাজুড়ে।
লটাখোলা গ্রামে একবার যাত্রাপালার আয়োজন করেন স্থানীয়রা। যোগেশ মোদক তখন বেকার যুবক। বেকারত্বের দুঃখ ঘোচাতে উদ্যোগ নিলেন চানাচুর বানানোর। বাড়িতেই ময়দা, তেল ও বিভিন্ন মসলার সাহায্যে চানাচুর তৈরি করে যাত্রাপালার অনুষ্ঠানে গেলেন। আগত দর্শনার্থীরা সেটা খেয়ে প্রশংসা করেন। এরপর যোগেশ মোদককে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই সময় থেকে আজও নিজ বাড়িতে উৎপাদিত চানাচুর শৌখিন মানুষের কাছে বিক্রি করে যাচ্ছেন। যোগেশ কুড়ির চানাচুরের কারণে গ্রামের খ্যাতি ছড়িয়েছে সারা দেশের মানুষের কাছে। আজ অতিথি আপ্যায়নে অথবা যেকোনো আচার-অনুষ্ঠানে যোগেশ কুড়ির চানাচুর শোভা পায়। বিশেষ করে শহর থেকে কেউ এখানে বেড়াতে এলে, এই চানাচুর সঙ্গে করে নিয়ে যেতে ভোলেন না। উপজেলার জয়পাড়া, মেঘুলা, কার্তিকপুর, কোমরগঞ্জ, নবাবগঞ্জসহ অন্যান্য হাটে বিক্রি হয় এই চানাচুর। এ ছাড়া বছরের বিভিন্ন সময়ে দোহার-নবাবগঞ্জে বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে যে মেলা বসে, সেখানে দেখা মেলে এই চানাচুরের। ভোজনরসিক মানুষ মেলা থেকে চানাচুর কিনতে ভুল করেন না।
যোগেশ মোদক পরলোকগমন করেছেন ১৫ বছর আগে। কিন্তু তার তৈরি চানাচুরের কদর কমেটি একটুও। ছানা ময়দা ভালো করে বেলে নিয়ে ছোট কুচি করে কেটে নিয়ে তেলে ভাজতে হয়। ভাজা কাতা বিভিন্ন ধরনের মসলা দিয়ে মাখিয়ে তৈরি করা হয় ঝাল চানাচুর। এ ব্যাপারে কথা হয় যোগেশ মোদকের ছেলে নিতাই মোদকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাবার মাধ্যমেই বিস্তার ঘটেছে এ পেশার। এতে আমাদের পরিবারে যেমন উন্নতি হয়েছে, তেমনি এলাকার মানুষেরও কর্মসংস্থান হয়েছে।
চানাচুর তৈরির কাজে পুরুষের পাশাপাশি মহিলারা সাহায্য-সহযোগিতা করেন। ময়দা ছানা ও বেলা পুরুষেরা করে থাকেন, আর ভাজার কাজটি মহিলারা করেন।
চানাচুর তৈরির জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেচাবিক্রি কমে যাচ্ছে। তার পরও এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন কুড়িবাড়ির লোকজন। বর্তমানে ১ কেজি চানাচুরের দাম ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। এক সময় চানাচুর বিক্রি করে খুব ভালো ছিলাম। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা বাড়িতে এসে চানাচুর নিয়ে যেত। এখন আর পাইকাররা সেভাবে আসে না। বাজারে বড় বড় কোম্পানির চানাচুরের কারণে আমাদের বানানো চানাচুরের চাহিদা কমে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, সরকার যদি এই ক্ষুদ্র শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য এ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। আমাদের তাগিদেই আমরা এ পেশাকে টিকিয়ে রেখেছি। পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যেতে বলে জানান এ শিল্পের কারিগররা।