শিশির কুমার নাথ
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৩ ১২:১৩ পিএম
চারপাশে চা-বাগানের সবুজ গালিচা। এর মধ্যে পুঁথি পাঠের আসর জমিয়েছেন এক যুবক। ‘ভাইরে ভাই বলে যাই আজব এক ঘটনা/সাপ খেলে সাপুড়ের মেয়ে নামেতে জরিনা।’ কথা ও সুরে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পাঠকর্তাকে ঘিরে আছে শ্রোতা ও দর্শক। অল্প বয়সিদের চোখে-মুখে বিস্ময়। বড়রা বাহবা দিচ্ছেন, কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণে ব্যস্ত। সম্প্রতি এমন দৃশ্যের দেখা মিলল সিলেটে। উপলক্ষ পুঁথি পাঠক এথেন্স শাওন এসেছেন। সিলেটি পুঁথি, পই, পইদ্য, কিচ্ছাÑ এসবের রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। একসময় পুঁথি পাঠ জনপ্রিয় ছিল। খ্যাতিমান পাঠকও ছিলেন। বর্তমানে এ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পুঁথি পাঠকর্তা না থাকলেও শ্রোতা আছে ঠিকই। তাই এথেন্স শাওনকে প্রায়ই ডাকা হয় এ অঞ্চলে।
বর্তমানে পুঁথি সাহিত্যের জনপ্রিয় পাঠক এথেন্স শাওন। পুঁথি পাঠ করতে চষে বেড়াচ্ছেন পুরো দেশ। ২০ বছর ধরে পুঁথি পাঠ আয়ত্ত করলেও পেশাদার পাঠক হিসেবে শ্রোতাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছেন পাঁচ বছর হলো। নিজেও লিখেছেন পুঁথি। জঙ্গনামা, সয়ফুলমুলক
বদিউজ্জামাল, গাজীকালু, চম্পাবতীসহ অসংখ্য পুঁথি রয়েছে তার সংগ্রহে। কোথাও পুঁথির নতুন কোনো সুর খুঁজে পেলে তা সংগ্রহ করেন। পুঁথি পাঠের আগ্রহ ও অনুপ্রেরণা সম্পর্কে জানতে চাইলে এই পাঠক বলেন, ‘পুঁথির সুরে মায়ের ঘুম পাড়ানি গান কিংবা ছড়া আমার ভালো লাগত। একদিন লক্ষ করলাম বাড়ির পাশের হাটের বটতলায় বসে একজন সুরে সুরে পুঁথি পাঠ করছেন। বিষয়টি মনে ধরে গেল। ঠিক করলাম পুঁথি পাঠ শিখব। সেই থেকে শুরু। বন্ধুদের মধ্যে পুঁথি পাঠ করে শুনাতে লাগলাম। বন্ধুরাও বেশ মজা পেত। নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন বিদ্যালয়ের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে চারটি ইভেন্টে প্রথম হই। অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসকের সামনে একটি কবিতা পাঠ করি পুঁথির সুরে। পুরস্কার নিয়ে যখন বাড়ি ফিরছি, তখন মাইকে ঘোষণা করা হলো আমার জন্য নাকি আরও একটি বিশেষ পুরস্কার রয়েছে! পুঁথির সুরে কবিতা পাঠ শুনে প্রশাসন থেকে আমাকে একটি অভিধান পুরস্কার দিলেন। এ থেকে বেশ অনুপ্রাণিত হই আমি। একসময় ঢাকায় চলে যেতে হয়। সেখানে গিয়ে অংশ নিতাম বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উন্মুক্ত আবৃত্তি কর্মশালায়। বিভিন্ন পার্ক, উদ্যানে বসে পুঁথি পাঠ করতাম।
রিকশাচালকদের মাঝে গিয়ে, তাদের জড়ো করে ‘জরিনার পুঁথি’র কাহিনী শোনাতাম। তারা আনন্দের সঙ্গে আমাকে দুপুরে খাবার খাওয়াতেন।’ এমন সব নানান বিচিত্র অভিজ্ঞতা রয়েছে এথেন্স শাওনের জীবনে। রাজবাড়ী জেলার সদর উপজেলার চরশ্যামনগর গ্রামে বাড়ি এথেন্স শাওনের। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা জানতে চাইলে এড়িয়ে গেলেন। জানালেন, ‘প্রকৃতির চেয়ে বড় কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। আমি রোজ শিখি প্রকৃতির কাছ থেকে। নজরুল, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র পাঠ করে শিক্ষা নেই প্রতিনিয়ত। উনারাই আমার শিক্ষক।’ এথেন্স শাওনের স্ত্রী কলেজ শিক্ষিকা দিলরুবা ইয়াসমিন রুবী তাকে এই কাজে সহযোগিতা করেন। রাজবাড়ী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ফরিদপুর, নাটোর, কুমিল্লাসহ ৩৫টি জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে পুঁথি পাঠ করেছেন। পাশাপাশি ‘মানুষকে মানুষ বলুন’Ñ এই বার্তাটিও পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি সিলেটের ‘কাঁকন ফকির ফাউন্ডেশন’-এ কাজের জন্য তাকে সম্মাননা দিয়েছেন। তাকে অনেকেই পুঁথি পাঠের ফেরিওয়ালা হিসেবে ডাকেন। কেউ আমন্ত্রণ জানালেই পুঁথি নিয়ে হাজির হন শাওন। কোনো মতে রাত যাপনের ব্যবস্থা আর একটু খাবারের ব্যবস্থা হলেই হলো। দোভাষী পুঁথিগুলোতেও তার রয়েছে বিশেষ দখল। কথার মাঝে মাঝে এসব পুঁথির বাণী শুনাতে ভুল করেননি তাই। শাওন বলেন, ‘পুঁথির মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরার চেষ্টাও করি।’
সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে হারিকেনের টিমটিম আলোতে বসে ঢুলে ঢুলে কোনো এক বয়োবৃদ্ধ পুঁথি পাঠ করছেন। কখনও হাসি, কখনও কান্না। এমন দৃশ্য কবে হারিয়েছে গ্রাম-বাংলা থেকে! পুঁথি পাঠের সুরে একসময় সরস হয়ে উঠত গ্রামীণ জনপদ। অতীতের জনপ্রিয় এই
সাহিত্যধারার পুনর্জাগরণ ঘটবে বলে বিশ্বাস করেন শাওন।