× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ : সন্তানের বেড়ে ওঠা

আসমাউল হুসনা

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৩ ১১:৫৫ এএম

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৩ ১১:৫৭ এএম

বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ : সন্তানের বেড়ে ওঠা

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেখা যাচ্ছে দেশে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা। মন ও মতের অমিলে একই ছাদের নিচে যখন দুটি মানুষের বসবাস অসম্ভব হয়ে ওঠে, তখন কেউ একজন হাঁটেন বিচ্ছেদের পথে। বিচ্ছেদের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবারের সন্তানদের ওপর। তাদের বেড়ে ওঠার পথে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ যেন দুঃস্বপ্নের মতোই তাড়িয়ে বেড়ায় জীবনভর...


আমার বয়স তখন আট। হুট করেই আব্বু অন্য এক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। কিছুদিন যেতে না যেতেই তার মধ্যে অনেক পরিবর্তন দেখা দিল। আমরা তখন ছোট। এসব বোঝার মতো বয়সও হয়নি। আম্মু একদিন বুঝতে পারলেন আব্বু বিয়ে করেছে।

আমার আম্মুর বয়স তখন ২২। আমরা তিন ভাইবোন। আব্বু একদমই বাসায় আসা ছেড়ে দিলেন। শুরু হলো আমাদের অর্থনৈতিক দুরবস্থা। আমি তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি। মাঝে মাঝে আব্বু চার-পাঁচদিন পরপর এক-দুই ঘণ্টার জন্য আসতেন। বাসায় এলেও মারামারি-গালাগালি করতেন। কিছুদিন পর পাকাপাকিভাবে বিচ্ছেদ ঘটল আব্বু-আম্মুর। আব্বু চলে যাওয়ার পর আম্মু সেলাইয়ের কাজ করে সংসার চালাতেন। তাতে বাড়ি ভাড়া, আমাদের লেখাপড়ার খরচ, বাজার, কাপড়, ওষুধ সব হতো না। আমার বড় ভাই ক্লাস নাইনে পড়ত, আমি পড়তাম থ্রিতে। আর ছোট ভাইয়ের বয়স ছিল ৪ বছর। 

আম্মুর কাজের ব্যাগগুলো এতটাই ভারী হতো যে সেগুলো তার পক্ষে বহন করা সম্ভব হতো না। তিনি সেই ব্যাগগুলো নিয়ে মার্কেটে মার্কেটে ঘুরে বিক্রি করতেন। একবার স্কুলের বেতন দিতে না পারায় আমার ক্লাসটিচার আম্মুকে কটু কথা বলেন। সেসব শুনে আম্মু স্কুলের ওয়াশরুমের সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদেছিলেন। আমি মেয়ে দেখেই হয়তো পরিবারের সেই অসহায়ত্বের দিনগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমি প্রতি রাতেই দেখতাম, আম্মু না ঘুমিয়ে কাঁদছেন। কিছুদিন পর আম্মুর জীবনে সূচনা হলো নতুন অধ্যায়। আম্মু বিয়ে করলেন। লোকটা শিক্ষিত, সুন্দর, উচ্চবিত্ত পরিবারের এবং অবিবাহিত। ৩ সন্তানের মাকে বিয়ে করেছে- বিষয়টা তার পরিবার মেনে নিতে পারেনি। তার সাথে আম্মু সুখী হলেও, আমরা আর বাবার আদর-ভালোবাসা পাইনি। বর্তমানে আমি চাকরি করছি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। নিজের খরচগুলো নিজেই বহন করি এবং মাস শেষে আম্মুর জন্য টাকা পাঠাতে পারি। কারও ওপর আর বোঝা হয়ে বসে নেই। 


তবে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা এখনও কাঁটা হয়ে বুকে বিঁধে আছে। বাবা-মায়ের অশান্তি দেখে আমরা ভয়ে চুপ করে থাকতাম। অভাব-অনটনে জরাজীর্ণ ছিল আমাদের জীবন। এখনও ঘুম ভেঙে যায় সেসব আতঙ্কে। নিজের বিয়ের কথা ভাবলেও ভয় হয়। কথাগুলো রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার তামান্না অন্তীর। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদপরবর্তী তার জীবন ও মানসিক অবস্থা উঠে এসেছে এতে।

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাইফান। সাত বছর বয়সে তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর ফুপুর কাছে বড় হন। বাবা দেশের বাইরে থাকলেও তার খরচের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে টাকা পাঠাতেন না। তার বাবা দেশে এসে ছেলেকে কিছুদিন নিজের কাছে রাখেন এবং পুনরায় তার ছোট চাচির কাছে রেখে আবার বিদেশ চলে যান। বাসস্থান বদল হলেও বদল হয়নি সাইফানের ভাগ্যের। সেই একই রকম গালমন্দ, দুর্ব্যবহার, খাদ্যাভাবে দিন কাটতে লাগল তার। 

একটা সময় নিজের ইচ্ছাতেই চলে যায় নানির বাড়িতে। কিন্তু ততদিনে মায়ের বিয়ে হয়ে গেছে অন্যত্র। সে ঘরেও একটি ভাই হয়েছে তার। মা তাকে নিজের কাছে নিয়ে গেলেও নতুন বাবা মেনে নিতে পারেনি সাইফানকে। শুরু হয় আবারও মানসিক অশান্তি। এসব মেনে নিতে না পেরে সাইফান এবার চলে আসে দাদির কাছে। মাঝখানে বয়ে গেছে অনেকটা সময়। বাবা-মায়ের কলহ, আত্মীয়দের দুর্ব্যবহার, অপুষ্টি- সব মিলিয়ে কেমন এক অন্ধকারময় জীবনের সাক্ষী হয়ে গেছে সে। কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না তার। স্কুলে গেলে বন্ধুবান্ধব থেকে শুরু করে শিক্ষক ও অন্যরা নানারকম কটু কথা বলে। তাই সে স্কুলে যাওয়াও বন্ধ করে দেয়। মানুষের প্রতি বিরক্ত কাজ করে এখন। বাইরে বের হতেও ইচ্ছে করে না।

চিরজীবন একসঙ্গে থাকার ব্রত নিয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও বর্তমানে বিবাহবিচ্ছেদ যেন বানের পানির মতো বেড়েই চলেছে। স্বামী-স্ত্রীর মতের অমিল, ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিকতা, নির্যাতন, যৌতুক, সন্তানদানে অক্ষমতা, নেশায় আসক্তি, দারিদ্র্য, পরকীয়াসহ আরও বেশকিছু কারণে সাম্প্রতিক সময় তথা বছরগুলোয় বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ। যার বলি হচ্ছে এসব দম্পতির কোমলমতি সন্তানরা। 

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালে দুই সিটির মেয়রের কার্যালয়ে তালাকের আবেদন জমা হয়েছে ১৩ হাজার ২৮৮টি। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৭ হাজার ৬৯৮টি এবং উত্তর সিটি করপোরেশনে ৫ হাজার ৫৯০টি। সেই হিসাবে দেখা যাচ্ছে, শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ভাঙছে প্রতিদিন ৩৭টি করে বিবাহিত সম্পর্ক। অর্থাৎ প্রতি ৪০ মিনিটে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে ১টি করে। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে বিচ্ছেদের আবেদন জমা হয় ২ হাজার ৪৮৮টি। বিগত সালগুলোর পরিসংখ্যানের দিকে চোখ রাখলেও প্রায় একই পরিস্থিতির দেখা মেলে। ২০২০ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বিচ্ছেদের আবেদন জমা হয় ১২ হাজার ৫১৩টি। এবং ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৬৫৯টি। 

বিবাহবিচ্ছেদ যে কয়েক বছর ধরে বাড়ছে, তা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য দ্বারাও প্রমাণিত। বিবিএসের ২০২১ সালের ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস’ শিরোনামের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশে গত ১৫ বছর ধরেই তালাকের হার ঊর্ধ্বমুখী। বিবাহবিচ্ছেদ বেশি ঘটছে শিক্ষিত দম্পতিদের মধ্যে। বিচ্ছেদের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে দেশের রাজশাহী বিভাগ আর কম বিচ্ছেদ ঘটছে সিলেট বিভাগে। 


দাম্পত্য বিচ্ছেদের প্রভাবটা যে শুধু স্বামী-স্ত্রীর ওপর পড়ে এমনটা নয়। বিচ্ছেদের কারণে বিচ্ছিন্ন হয় দুটি পরিবার। আর এর সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ে সন্তানদের ওপর। একটি ভাঙা পরিবারের সন্তানরা বেড়ে ওঠে চরম হীনম্মন্যতা নিয়ে। তারা মানসিক দিক দিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ সন্তানের জীবনের মূল শিরা-উপশিরাগুলো ভেঙে দেয়। সন্তান কাছে পায় না তাদের বাবা-মাকে। ফলে তাদের জীবনের চাহিদা পূরণ হয় না। মনের মধ্যে লুকায়িত না বলা কষ্ট নিয়ে তারা বেড়ে ওঠে। সন্তানের জীবনে বাবা-মায়ের আদর-ভালোবাসা পরিপূর্ণভাবে না পেলে সে সন্তান হয়ে ওঠে হিংস্র, নয়তো একদম গম্ভীর। সমাজের কটু কথায় তারা কোনো পরিবেশেই নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না। পরিবারের ঝগড়া-বিবাদ দেখতে দেখতে তারাও হারায় সৌজন্যবোধ। দীর্ঘদিন মনোকষ্টে ভুগতে থাকা এসব শিশুর মাদকাসক্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। অনেক সময় তারা আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। 

এমনটা মনে করেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জিল্লুর কামাল। বিবাহবিচ্ছেদপরবর্তী সন্তানদের মনের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে এ বিষয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাবা-মায়ের নিত্যদিনের কলহ কখনও এমন পর্যায় চলে যায় যে বিচ্ছেদ ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। যার বিরূপ প্রভাব পড়ে তাদের সন্তানদের ওপর। সেক্ষেত্রে বাবা-মায়ের উচিত বিচ্ছেদের পর সন্তানের কথা ভেবে হলেও একে অপরকে শ্রদ্ধা করা। সন্তানের সঙ্গে বাবা-মা উভয়ই যোগাযোগ রাখলে তারা নিজেদের নিরাপদ মনে করবে। সন্তানের সামনে একপক্ষকে দোষারোপ করে কথা বলা যাবে না। সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে সন্তানের যেকোনো ব্যাপারে বাবা-মা উভয়ের মিলিত সিদ্ধান্ত নেওয়া বাঞ্ছনীয়।’

বিবাহবিচ্ছেদের পর আরও একটি জটিলতা দেখা দেয় সন্তানদের ভরণপোষণ ও তত্ত্বাবধান নিয়ে। বেশিরভাগ সময়ই বাবা ও মা চান- সন্তান যেন যেকোনো একজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুক। কর্মজীবী মা হলে তিনিও চান সন্তানের দায়িত্ব পালন করতে। আবার অনেক ক্ষেত্রে সন্তান মায়ের কাছে থাকলে বাবা কোনো দায়িত্ব নিতে চান না। ফলে সন্তানরা অর্থনৈতিক টানাপড়েন ও অভিভাবকের শূন্যতায় ভোগে। 

বিবাহবিচ্ছেদের পর সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব কার- এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনজীবী আমির হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ আইন অনুযায়ী সন্তানের সাত বছর বয়স পর্যন্ত তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব মায়ের। মা যদি অন্যত্র বিয়ে করেন, তা হলে এই দায়িত্ব পাবেন বাবা। বাবা ও মা উভয়ই বিয়ে করলে সন্তান তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নানি এবং দাদি। সেক্ষেত্রে নানির অগ্রাধিকার রয়েছে। সাত বছর পূর্ণ হলে সন্তানের মত অনুযায়ী কার কাছে থাকবে- এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বাবা-মা উভয়েরই সন্তানের সঙ্গে দেখা করার অধিকার রয়েছে। তবে সন্তান যার কাছেই থাকুক না কেন, তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব সম্পূর্ণ বাবার।’

স্বামী-স্ত্রীর মনের বা মতের অমিল হলে একই ছাদের নিচে বসবাস করবেন না বলে যখন সিদ্ধান্ত নেন, তখন বিচ্ছেদ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। সে ক্ষেত্রে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে হলেও নিজেদের বোঝাপড়ার মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করে নেওয়া উচিত। কারণ আপনার সন্তান বড় হয়ে উঠবে আপনার পরিচয়েই। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা