রফিকুল ইসলাম সান
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৩ ১৪:১৩ পিএম
আপডেট : ২৪ জুন ২০২৩ ১৪:১৭ পিএম
জ্যৈষ্ঠের গনগনে মধ্যদুপুর। পাবনার বেড়া উপজেলা পরিষদ থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে কৈটোলা পাম্পিং স্টেশনের কাগেশ্বরী নদীর পাড় ধরে যাচ্ছিলাম। একটু জিরিয়ে নিতে দাঁড়ালাম একটি গাছের ছায়াতলে। অদূরে ছোট্ট একটি ডিঙি নৌকার মাথায় বসে ফাঁস জাল দিয়ে মাছ ধরছেন বয়স্ক একজন। মাছ দেখার কৌতূহল থেকে হাঁক ছাড়লাম কাছে আসার জন্য। তিনি বৈঠা বেয়ে পাড়ে যখন নৌকাটি ভেড়ালেন মনটা বিষাদে ভরে উঠল। দূর থেকে তাকে একজন দিব্যি সুস্থ-সবল মনে হয়েছিল। কাছে আসার পর দেখতে পাই তার পা দুটি নেই। জীবন কত নির্মম!
অসহায় এই মানুষটির পা না থাকলেও থেমে নেই জীবন সংগ্রাম। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেন নদীতে মাছ ধরতে এসেছেনÑ জানতে চাইলে তিনি বলা শুরু করলেন, ‘বাপুরে আমি অ্যাকা (একা) কুনু জাইগা যাবার তো পারি না। আমাক লিয়া বাড়ির হগ্যলেরই (সবার) বিপদ। ওই অসুখে আমার পা দুইডা কাইট্যা ফ্যালাইনা লাগছিল। ব্যাকার অইছি আইজ ২৬ বচ্ছর। জমিটমি কিছুই নাই। অল্প অ্যাল্লা বাড়ি আছে, তাও ওহানে ছাওয়ালগোরেই জায়গাই অয় না। অ্যাক ছাওয়াল আবার ফের ওর হশুরবাড়িই থ্যাহে। তিনড্যা ছাওয়াল আর চাইরড্যা মিয়ার সংসার আছিল। তাগরে বিয়্যা হয়া গ্যাছে ম্যালা আগেই। তারা কেউ খোঁজ ল্যায় না, দুইড্যা পা আরা (হারানো) আইজ ২৬ বচ্ছর পানিত এই নৌকাতি থ্যাহি।’
দুই যুগেরও বেশি সময় ড়ধরে নৌকায় জীবন-যাপন করছেন এই মানুষটি। এ কথাটি শোনার পর বুকটা কেঁপে উঠল। প্রত্যেক মানুষের স্বাভাবিকভাবে চলাচলের জন্য প্রয়োজন দুটি পা। সেই চলাচলের পা দুটিই যদি না থাকে তাহলে পরিবারে বোঝা হয়ে থাকতে হয়। তেমনই অবস্থা সিরাজুল ইসলামের। পরিবার-পরিজনের কেউ তার পাশে নেই। ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে কৈটোলা পাম্পিং স্টেশনের পাশে নদীর ওপর প্লাস্টিকের ড্রামের ওপর ঘর বানিয়ে থাকতে হচ্ছে। নদীতেই তার জীবিকা, নদীতেই বাস।
স্বাভাবিক চলছিল সবকিছু, ছিল পরিবার-সংসার। ছিল হেঁটে চলাফেরার ক্ষমতা। হঠাৎ অজ্ঞাত রোগে পা দুটি কেটে ফেলতে হয়। ক্রমেই পরিবারের বোঝা হয়ে ওঠেন তিনি। হাত দুটি সহজে কাজে লাগানো ও চলাচলের জন্য বেছে নিয়েছেন মাছ ধরার জীবন।
মাছ ধরে স্থানীয়দের কাছে বিক্রি করেন। আত্মীয়স্বজন, এলাকাবাসীর সহযোগিতায় কোনোমতে চলছে তার দিনকাল। দিন কেটে গেলেও থাকতে হয় ভাসমান কুটিরে। পা হারানো মানুষটি সরকারি সহায়তা হিসেবে পান শুধু প্রতিবন্ধী কার্ডের অল্প কিছু টাকা। যে টাকা পান তাতে তার ওষুধও কেনা হয় না।
তিনি জানান, যদি সরকার একটি ঘর করে দিত তাহলে তার থাকার ব্যবস্থা হতো। পরিবারের অবহেলার কারণে নদীর ধারে তেলের ড্রামের ওপর ঝুপড়ি ঘর বানিয়ে দিয়েছে এলকাবাসী। সেখানেই থাকছেন তিনি।
স্থানীয়রা জানান, আমরা প্রায় ২৬ বছর তাকে এভাবে নদীতে বসবাস করতে দেখছি। ঈদে এলাকাবাসী সাহায্য-সহযোগিতা করে। বয়স হচ্ছে, এখন একটা স্থায়ী বসবাস দরকার।
স্ত্রী জয়নব বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্টে দিনযাপন করছি আমরা। তাকে দেখভাল করতে আমার কষ্ট হয়। প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিলে শৌচাগারে নিতে পারি না। তাই নদীতেই থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। এখানে কয়েকজন মিলে প্লাস্টিকের ড্রাম দিয়ে ঝুপড়ি ঘর বানিয়ে দিয়েছে। এখানেই থাকেন, শৌচাগারে নিতে হয় না।’