× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঘরে ফেরার গল্প

হারানো দিনগুলো

সাহিদা সাম্য লীনা

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৩ ১১:২১ এএম

আপডেট : ২৪ জুন ২০২৩ ১১:২২ এএম

হারানো দিনগুলো

ছোটবেলায় একবার ঈদে বাড়ি ফিরেছিলাম ঢাকা হতে একবুক আনন্দ নিয়ে। বাড়ি যাচ্ছি। মায়ের কাছে। ঈদ আসবে। আবার বেশ কয়েকটি ঈদের জামা সঙ্গে। বড়বোন ও ছোটবোনের জন্য।

আনন্দ লাগছিল! নতুন এক বাসে উঠেছিলাম। মিষ্টি খাইয়েছিল উদ্বোধনে। মেজ ভাইয়ার সঙ্গে বাড়ি যাচ্ছি। বমি করতাম বিধায় একদম সামনে বাসের কাচের সঙ্গে বসা। মাঝখানে একজন টুপি পরা ছাত্র ছিল বসা।

অবশ্য ভাইয়ার সঙ্গেই ছিলাম। আমি ছেলেটাকে টেনে সরিয়ে সামনে বসি। ভাইয়ার লক্ষ্য আমার দিকে। ফেনীর প্রায় কাছাকাছি চলে এলাম আমরা। আমি ঘুমে ঢুলুঢুলু। ভাইয়া আমাকে নিয়ে আসে নিজের কাছে। ভাইয়ার এক হাতে চল্লিশ হাজার টাকার একটা ব্যাগ ছিল। পায়ের কাছে ঈদের পোশাকভরা কাপড়ের ব্যাগ। আর এক হাতে বুকে নিয়ে বোনকে। ঠিক দুই মিনিট পর ওদিক থেকে আমাকে আনার পর আধবোজা ঘুমে দেখছি সামনে একটি ট্রাক। বাসে প্রচণ্ড ধাক্কা। জ্ঞান হারাই আমি। জ্ঞান ফেরে, দেখি রাস্তার পাশে আছি আমি শুয়ে। আমার চারপাশে জটলা। একজন মাথায় পানি দিচ্ছে। 

কেঁদে উঠলাম ভাইয়া বলে। ভাইয়া দৌড়ে এলো। আমাকে রেখে ভাইয়া গেল ব্যাগের খোঁজে।  আমাদের ব্যাগ নাই। একটা পলিথিনের ব্যাগে লুঙ্গি আর একটা শার্ট। আমাদের ব্যাগ যে নিয়েছে‌, সে এই কাজ করেছে। আমি কান্না শুরু করি ঈদের জামার জন্য। ভাইয়া বোঝায় আবার কিনবে বলে। আমরা বেঁচেছি এটাই বড় কথা। সামনের টুপি পরা ছেলেটা মারা গেছে- ভাইয়া বলল। কষ্ট পাচ্ছিলাম ছেলেটার কথা মনে করে‌।

প্রাথমিক চিকিৎসা শেশে বাড়ি আসি। মাকে বলি ঈদের জামা হারানোর কথা। ঢাকায় বড় ভাইয়াকে খবর জানানো হয়। ভাইয়া চিঠি লেখে- একদিনের মধ্যেই অনেকগুলো জামা নিয়ে আসছি আমি। একটুও কাঁদবি না। হারানো জামার কষ্ট-স্মৃতি বহুদিন ছিল।

ঈদের বেশ আগে একবার বাড়িতে মায়ের কাছে যেতে কান্নাকাটি করলে ভাইয়া আমাদের প্রেসের এক কর্মচারী হেদায়েতকে দিয়ে পাঠায়। হেদায়েত আমাদের গ্রামের ছেলে। মনে আছে বেচারা আমার সিটের সঙ্গে ফেনী পর্যন্ত আসা অবধি দাঁড়িয়েছিল। হেদায়েতের খবর নেব একদিন বাড়ি গেলে। আহা, আগের মানুষগুলো। ঈদেই সবার সঙ্গে দেখা হয়। 

ঈদের আমেজ, ঈদের পরিকল্পনা, নতুন কাপড়- সব কিছুতে পরিবর্তন এসেছে। ঈদের নতুন জামার প্রতি অদ্ভুত আকর্ষণ! জামা পরে ছুটতে, হাঁটতে ঘুরতে কী যে শিহরণ! মায়ের চোখ রাঙানো, ভাইদের শাসন- তবু ঈদের সেই সোনামাখা ক্ষণগুলো এখনও খুঁজি স্মৃতির পরতে।

জামা ধুতে মন চাইত না, গন্ধটা চলে যাবে, ভাঁজটা নষ্ট হবে। ঈদের জামা সকালে পরব। চাঁদরাতে চাঁদ দেখে খুশিতে থাকতাম। রাতে ঘুমাতাম। তবে সেই ঘুম আনন্দের ঘুম। কখন ভোর হবে- সেই অপেক্ষায় ঘুম আসতে চাইত না। মায়ের ডাকে উঠে জলদি তৈরি হতাম।

মার্কেট ঘুরে বড় ভাইরা যখন জামা কিনে দিত- কেমন জানি সুখ সুখ আনন্দ লাগত। ম্যাচিং জামা-জুতা, লিপস্টিক, চুড়ি, মেহেদি। লুকিয়ে রাখতাম। কেউ যাতে না দেখে। দেখলেই বরবাদ। 

একবার বড় বোন দেখেছিল। সকালে সেই জামা আর পরিনি। ভাইকে বললাম- ভাইয়া পুরান জামা পরব না। ভাই তো অবাক! বলে তোকে না জামা কিনে দিলাম। পরবি না কেন? অনেক কাঁদলাম। সকালে ভোরে সবাই ওঠার আগেই জামাটা দুই টুকরো করে পুকুরে ফেলে দিয়েছিলাম। কেউ বুঝতে পারেনি। পুকুর পাড়ে বসে কাঁদছি। ভাই আমাকে কাঁদতে দেখে বললো, কি হয়েছে? বললাম, জামা ফেলে দিয়েছি। দেখে পুকুরের এক পাশে একটু দূরে- জামাটা পড়ে আছে। ভাইয়া আঁতকে ওঠে। দেয় জোরে এক ধমক। বড়বোন এসে বলে- কালকে আমি ওর জামাটা দেখছিলাম। এ জন্যই এমন করছে। ভাইয়া আর কিছু বললো না। তবে কষ্ট পেয়েছে বুঝেছিলাম।  আজও সেই ঈদের কথা মনে হলে কষ্ট পাই। ঈদ এর পরও এসেছে। সব ঈদ মজার মজা ছিল। ঈদে কত কতবার ফিরেছি একরাশ মধুমাখা আনন্দ নিয়ে।

আর করিনি সেই ভুল। ঈদে জামা দেখলে কিছু হয় না, ভাই বুঝিয়েছিল। ঈদের সঠিক অর্থ জানতে বেশিদিন লাগেনি। হারানো সুখগুলো ঈদের অপার আনন্দ আজও আসে। তবে ছোটবেলার সেই আনন্দের অনুভূতি আসে না। এখন আর মায়ের কাছেও যাওয়া হয় না। আজ কয়েক বছর দুই সন্তানকে নিয়ে স্বামীর কাছে ফিরি শহর থেকে গ্রামে ঈদ করতে। দিন, সময়, মানুষ, সান্নিধ্য, ঈদ সবই রঙ বদলায়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা