ঘরে ফেরার গল্প
রাতুল মুন্সী
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৩ ১১:০৩ এএম
২০১০ সাল, সবেমাত্র এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশ হতে মাঝখানে লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হয়। সাধারণত এই সময়টুকু সবার ঘুরেফিরেই কাটে। পরীক্ষা শেষ করে কিছুদিনের জন্য ঘুরতে গেলাম গাজীপুর। গাজীপুরে মামা পরিবার নিয়ে থাকে। সেখানেই উঠলাম বেশ কয়েক দিন থাকার জন্য।
এই প্রথম গাজীপুর আসা। এর আগে কখনও উপজেলা শহর ছাড়া কোথাও তেমন যাওয়া হয়নি। ঘুরতে এসে সবার কর্মব্যস্ততা দেখে মনে হলো রেজাল্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত একটা চাকরিতে ঢুকে যাই। মামা বাসার কাছেই একটা গার্মেন্টসে চাকরির ব্যবস্থা করলেন।
ভালোই চলছিল কর্মজীবন। সহকর্মীরা সবাই আন্তরিক। এর মধ্যে রমজান মাস চলে এলো। প্রথম দুয়েকটা রোজা রাখলাম। এরপর আর রোজা রাখা হলো না। কাজের প্রচণ্ড চাপ। যতই দিন যাচ্ছে কাজের চাপ বাড়ছে। অনেকেই বলছেন, আমরা নাকি ছুটি পাব না। কাজের চাপ শেষ করে যতটুকু সময় পাই। বাড়িতে থাকা মানুষগুলোর মুখ চোখের সামনে ভাসে। এর আগে রোজা কিংবা ঈদের সময় বাড়ির বাইরে কখনও থাকা হয়নি। বাড়ি থেকে কেউ কোনো তাড়া দিচ্ছে না। মাঝে মাঝে মনে হয় বাড়ির মানুষ ভুলে গেল নাকি।
ওভারটাইমের টাকা পেলাম। মন খুশিতে ভরে গেল। এখন একটু নিশ্চিত হলাম। ছুটিটা তাহলে পাব। টাকা পেয়ে বাড়ির সবার জন্য টুকটাক কাপড়চোপড় কিনলাম। বাড়িতে যাওয়ার ব্যাগ প্রস্তুত। ছুটি পেলেই দৌড়। প্রতিরাতে অফিস ছুটি হলে বাসায় এসে ব্যাগ খুলে গুছিয়ে রাখা কাপড়চোপড় দেখি। সময় যাচ্ছে না। কাজের চাপ। ঈদের দুই দিন আগ থেকে সারারাত চলল ডিউটি। অবশেষে নিশ্চিত হলাম ছুটি পাচ্ছি। পরদিন রেডি করা ব্যাগ নিয়েই অফিসে ঢুকলাম। ছুটি হতে হতে দুপুর হয়ে গেল। বাড়ি গিয়া খাব বলে সকাল থেকে কিছুই খাইনি। আম্মারে ফোন দিয়ে পছন্দের খাবার সব রান্না করতে বলেছি।
ছুটি হলো। অফিস থেকে বের হয়ে রাস্তায় দাঁড়ালাম। গাড়ির প্রচণ্ড চাপ। কোনো গাড়িতে দাঁড়ানোর মতো জায়গা খালি নাই। আমার সঙ্গে এলাকার এক বড় ভাই। ঘণ্টাখানিক দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা লেগুনা করে চন্দ্রা পর্যন্ত এলাম। চন্দ্রা এসে আরেক বিপদ। যত বাসই আসছে সবটারই বাসের ভেতরে ও ছাদে মানুষ আর মানুষ।
আমরা যেহেতু মধুপুর নামব। মধুপুরের কোনো বাস নেই। মধুপুর আসতে গেলে ধনবাড়ি না হয় জামালপুরের বাসে আসতে হবে। হঠাৎ জামালপুরের একটা বাস এলো। দেখতে দেখতেই ভেতরে পা রাখার জায়গা নেই। ছাদ এখনও ফাঁকা। কোনো উপায় না পেয়ে বাসের ছাদে উঠে গেলাম।
চন্দ্রা থেকে বাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে অন্ধকার করে আকাশে মেঘ করল। বাস মির্জাপুর আসতেই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। বৃষ্টি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে থাকা কাপড়চোপড়ের ব্যাগটাকে উপুড় হয়ে বুকের মধ্যে চেপে ধরলাম। মির্জাপুর থেকে টাঙ্গাইল পর্যন্ত বৃষ্টি। বৃষ্টিতে ভিজছি আর কাঁদছি। চোখের পানি আর বৃষ্টির পানি কেউ বুঝতে পারল না। জামাকাপড়সহ ভেজা শরীর বাসের ছাদের ওপর বাতাসে থরথর করে কাঁপছে। মনে হচ্ছিল বাড়ি যাওয়ার জন্যই বেঁচে ছিলাম।