ইয়োগাচর্চা
দীপান্ত রায়হান
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৩ ১২:৩১ পিএম
ভোরের রমনা পার্কের দৃশ্যাবলি অন্যরকম সুন্দর। একরাশ স্নিগ্ধতা, সতেজতা ও মুগ্ধতার রেশ ছড়িয়ে পড়বে আপনার দেহ-মনে। গাছের গাঢ় সবুজ পাতায় ভোরের মিষ্টি বাতাসের তালে তাল মেলাতেই আপনার মনোযোগ কেড়ে নেবে একটু দূরে চেনা পাখির চেনা কোনো সুর। এরই মধ্যে শরীরচর্চায় ব্যস্ত শত শত নাগরিক। কেউ হাঁটছেন, দৌড়াচ্ছেন, কারাতের কসরত করছেন। আবার কেউবা প্যারেড-পিটিতে ব্যস্ত। কেউ একা, আবার কেউ দলবদ্ধভাবে। এমনই এক দলের নাম আলফা ইয়োগা সোসাইটি। দলটি দীর্ঘদিন ধরে রমনা পার্কের কাঁঠালতলায় ইয়োগাচর্চা করছেন। অবশ্য কাঁঠালতলার পরিবর্তে এখন জায়গাটি বেশিরভাগ মানুষ ‘আলফা ইয়োগা চত্বর’ হিসেবেই চেনেন।
আলফা ইয়োগা সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা মো. নিজামউদ্দীন। পেশাগত জীবনে তিনি অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার। ১৯৯৬ থেকে ২০০৫ সাল- এই নয় বছরে তার শরীরে দশটি মেজর অপারেশন হয়। প্রথমে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ফলে এনজিওপ্লাস্টি করান। এতে কাজ না হলে ১৯৯৭ সালে ভারতে গিয়ে বাইপাস গ্রাফটিং করান। এরপর পালাক্রমে অ্যাপেন্ডিক্স, গলব্লাডার বা পিত্তথলি অপারেশন, ওপেন হার্ট সার্জারি, এওর্টিক বাল্ব রিপ্লেসমেন্টের মতো জটিল অপারেশন করাতে হয়। ধারাবাহিকভাবে এতগুলো অপারেশন করাতে গিয়ে তার শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। দিন যায়, মাস যায়Ñ চিকিৎসকরা কেবল পূর্ণ বিশ্রামের সময় আর ওষুধের ডোজ বাড়িয়ে দেন। এভাবে ক্রমান্বয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিলেন। এমন সময় একদিন রমনা পার্কে হাঁটতে এসে কয়েকজন ইয়োগাসাধকের সঙ্গে কথা হয় তার। সুস্বাস্থ্য ও প্রশান্তিময় জীবনের জন্য ইয়োগার ভূমিকা সম্পর্কে জানতে পারেন। এর কিছুদিন পরই তিনি ইয়োগার উপকারিতা বুঝতে পারেন। তার শরীরের অবশপ্রায় অঙ্গগুলো ওষুধ ছাড়াই সেরে উঠতে শুরু করে। সেই থেকে শুরু। এখন মো. নিজামউদ্দীন নিজেই ইয়োগাসাধক। প্রতিষ্ঠা করেছেন ইয়োগাচর্চার প্রতিষ্ঠান আলফা ইয়োগা সোসাইটি।
এই প্রতিষ্ঠানে কেউ চাইলে বিনা পয়সাতেও ইয়োগাসেবা নিতে পারেন। বেতন দিতে চাইলে সেটাও খুব সামান্য, মাসে তিন শত টাকা মাত্র। প্রতিষ্ঠানটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য এখানে নারী-পুরুষ একই প্ল্যাটফরমে ইয়োগা করতে পারেন। রমনা পার্কের অন্য কোনো সংগঠনে যেটি নেই। এখানে সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ শামসুল আলম নিয়মিত ইয়োগা করতে আসেন। তিনি জানান, ‘আমি যখন ইয়োগা করতে আসি তখন আমার উচ্চ রক্তচাপ ছিল। ইয়োগা শুরু করার সাত মাসের মধ্যে আমার রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।’ বীর মুক্তিযোদ্ধা এজেডএম শাহজাহান পেশাগত জীবনে ছিলেন ব্যাংকার। ৭৫ বছর বয়সে নানাবিধ রোগ নিয়ে ইয়োগা শুরু করেন। এখন তিনি অনেকটা সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. শহিদুল ইসলামও এখানে নিয়মিত ইয়োগা করতে আসেন। অন্যদের মতো তারও একই রকম অভিজ্ঞতা। ইডেন মহিলা কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নবীবা খাতুন। তিনিও নিয়মিত আসেন এখানে। প্রশিক্ষক মো. নিজামউদ্দীন বলেন, ‘যখন ইয়োগা করে উপকৃত হলাম, তখন থেকেই ভাবছিলাম কীভাবে ইয়োগার উপকারিতা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। সেই ভাবনা থেকেই আলফা ইয়োগা সোসাইটির যাত্রা শুরু। ইয়োগা করার সবচেয়ে বড় সুফল হলো, ব্যথা-বাতমুক্ত জীবনযাপন। আর এই ব্যথা সাধারণত মেয়েদেরই বেশি হয়। সে কারণে প্রথম থেকেই চেয়েছি নারীদেরও ইয়োগা করার ক্ষেত্র উন্মুক্ত থাকুক। প্রথম দিকে বিষয়টি নিয়ে অনেকেই নানা কথা বলেছেন। এখন অবশ্য কোনো সমস্যা নেই। নারী-পুরুষ পাশাপাশি এখানে ইয়োগা করতে পারেন।’
ইয়োগা অনেক পুরাতন যোগসাধন, যা এখন বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। ডায়াবেটিক, উচ্চ রক্তচাপ, অবসাদ, দুশ্চিন্তামুক্ত সুস্থ জীবনের জন্য আপনিও ইয়োগা করতে চাইলে ঠিক ভোর ছয়টায় চলে আসুন রমনা পার্কের আলফা ইয়োগা চত্বরে। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ : ০১৭১৬১২৩৫৬১