× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

উপলক্ষ্মী ত্রিপুরা

চা-বাগানে জন্ম চা-বাগানেই দেশসেরা

ওবাইদুল আকবর রুবেল

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৩ ১২:১০ পিএম

 উপলক্ষ্মী ত্রিপুরা পেয়েছেন এ বছরের দেশসেরা পাতা উত্তোলনকারীর পুরস্কার

উপলক্ষ্মী ত্রিপুরা পেয়েছেন এ বছরের দেশসেরা পাতা উত্তোলনকারীর পুরস্কার

মা-বাবার হাত ধরেই মূলত চা-গাছের সঙ্গে পরিচয় তার। বয়স যখন ৯ বছর তখন থেকেই চা-পাতা উত্তোলন (চয়ন) করেন উপলক্ষ্মী ত্রিপুরা। মা-বাবাসহ আগের তিন পুরুষের ধারাবাহিকতায় উপলক্ষ্মী ত্রিপুরাও ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন একজন চা-শ্রমিক।

 ১৯৭৮ সালে নেপচুন চা-বাগানের শ্রমিক পল্লীতেই জন্ম উপলক্ষ্মীর। মা-বাবা পছন্দ করে নাম রেখেছিলেন উপলক্ষ্মী। তার পৃথিবীতে আসার উপলক্ষটা এখন সার্থক হয়েছে বলে মনে করেন তিনি নিজেই।

জন্মের ৯ বছর পর ১৯৮৭ সালেই শুরু হয় তার চা-পাতার সঙ্গে মিতালি। একটি-দুটি পাতা উত্তোলন করতে করতে এখন হয়ে গেছেন দেশসেরা পাতা উত্তোলন কারী (চয়নকারী)।  গত ৪ জুন চা দিবস উপলক্ষে দেশের সেরা চা-পাতা চয়নকারী হিসেবে বাণিজ্যমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন উপলক্ষ্মী ত্রিপুরা।

দেশসেরা হওয়ার পেছনের গল্প জানতে গিয়েছিলাম উপলক্ষ্মীর কর্মস্থল ফটিকছড়ির নারায়ণহাট ইউনিয়নে অবস্থিত নেপচুন চা-বাগানে। খুঁজতে খুঁজতে তার দেখা মেলে বাগানের ১৩ নম্বর ব্লকে। দেশসেরা হলেও এক দিনের জন্যও বন্ধ নেই উপলক্ষ্মীর চা-পাতা উত্তোলন করা। সেরা হওয়ার আনন্দে অন্য শ্রমিকরাসহ দ্বিগুণ উৎসাহে চা-পাতা তুলছেন। তার গত এক বছরের চা-পাতা চয়নের রেকর্ডে রয়েছে ঘণ্টায় প্রায় ৭৮ কেজি পাতা উত্তোলন বা চয়ন। 

উপলক্ষ্মীর চা-পাতা উত্তোলনের মাঝে রয়েছেন এক ধরনের ছন্দ। কাজের ফাঁকেই কথা হয়। সেরা হওয়ার পেছনে কী জাদু- এমন প্রশ্ন করলে উপলক্ষ্মী বলেন,  ‘বেশি পাতা উত্তোলনের জন্য বিশেষ কোনো জাদু নেই’। তিনি বলেন, ছোটবেলায় মা-বাবার সঙ্গে চা-বাগানে প্রবেশ। সব সময় চা-পাতা নিয়েই ভাবনা তার। কীভাবে দুটো পয়সা বেশি পাবেন, সেই চিন্তা থেকে চেষ্টা করেন অন্যদের চেয়ে একটু বেশি চা-পাতা উত্তোলনের। এ জন্য তার চিন্তাচেতনা-ধ্যান সব কিছু চা-পাতাকেন্দ্রিক। একাগ্রতা আর চা-পাতার প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি পৌঁছে গেছেন সর্বোচ্চ স্থানে। 

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন উপলক্ষ্মী ত্রিপুরা

নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠীর হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম হওয়ার কারণে নিজে তেমন লেখাপড়া করতে পারেননি উপলক্ষ্মী। সংসার জীবনের দারিদ্র্যের কশাঘাতে বড় মেয়েকেও পারেননি স্কুলের সর্বোচ্চ গণ্ডি পার করাতে। কিন্তু এখন তিনি বদ্ধপরিকর, বাকি তিন ছেলেমেয়েকে শিক্ষিত করে তুলবেন। মা-বাবার কথা জিজ্ঞেস করতেই জলভরা চোখে উপলক্ষ্মী বলেন, তার শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কারটি প্রয়াত মা-বাবাকেই উৎসর্গ করেছেন। তবে দিনশেষে সেরা হওয়ার পেছনে নেপচুন চা-বাগানের মালিক, সব কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ তার সহকর্মী শ্রমিকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান উপলক্ষ্মী। 

অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি পড়ালেখা করিনি। আমার জন্ম, বড় হওয়া, বিয়ে সবই এই বাগানে। ছোটবেলা থেকেই এখানে কাজ করছি। কাজ করতে করতেই দ্রুত চা-পাতা তোলার কাজ শিখেছি।’

এক বছরে উপলক্ষ্মী ২৮ হাজার ৩৪৪ কেজি চা-পাতা উত্তোলন করেন; যা তাকে এনে দিয়েছে ‘জাতীয় চা পুরস্কার’। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ চা বোর্ডের এ পুরস্কার পেয়েছেন উপলক্ষ্মী। পুরস্কার হিসেবে চা বোর্ডের পক্ষ থেকে এক ভরি ওজনের সোনার ক্রেস্ট ও সনদ দেওয়া হয়েছে। আট ক্যাটাগরিতে দেওয়া পুরস্কারের মধ্যে একমাত্র চা-শ্রমিক হিসেবে   ‘শ্রেষ্ঠ চা-পাতা চয়নকারী’র সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। 

নেপচুন চা-বাগানের ১৭ নম্বর সেক্টরের সর্দারণি প্রণতি মজুমদার বলেন, ‘আমাদের উপলক্ষ্মী চা-পাতা তুলে দেশসেরার পুরস্কার পেয়েছে। এ জন্য আমরা অনেক খুশি! আমরা গর্বিত। আমরা চাই সে আরও সফল হোক; যাতে আমাদের সর্দার, বাবু, সাহেব ও নেপচুন চা-বাগানের অনেক নাম হবে। এ ছাড়া চা-শ্রমিকদের যথাযথ মূল্যায়ন করার জন্য প্রধানমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রীসহ চা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান প্রণতি মজুমদার।

কথা হয় নেপচুন চা-বাগানের ডেপুটি ম্যানেজার রিয়াজ উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পুরস্কারের জন্য প্রাথমিকভাবে মনোনীত হওয়ার পর উপলক্ষ্মীকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। চা বোর্ডের টিমের কাছে পাতা উত্তোলনের পরীক্ষা দিতে হয়। সে পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন তিনি। সেদিন উপলক্ষ্মী এক ঘণ্টায় ৪৯ দশমিক ৯০ কেজি চা-পাতা উত্তোলন করে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছেন। শ্রেষ্ঠ চা-পাতা চয়নকারী হিসেবে আমাদের বাগানের একজন এই পুরস্কার পাওয়ায় সবাই গর্বিত। 

উপলক্ষ্মী ত্রিপুরার এক ছেলে ও চার মেয়ে। তাদের মধ্যে দুজন ইস্পাহানী গ্রুপের মালিকানাধীন নেপচুন চা-বাগানেই কাজ করে থাকেন। স্বামী বিশু কুমার ত্রিপুরাও চা-বাগানের শ্রমিক। ছোট তিন মেয়ে বাগানের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। মেজো মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে, চতুর্থ জন স্থানীয় বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণি এবং ছোট মেয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। পড়ালেখা করা তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ যেন সুন্দর হয়, তা-ই এখন উপলক্ষ্মীর একমাত্র প্রত্যাশা।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা