চয়ন বিকাশ ভদ্র
প্রকাশ : ১৮ জুন ২০২৩ ১২:২৪ পিএম
ময়মনসিংহ শহরের কাচিঝুলি মোড় থেকে সোজা রাস্তার উত্তর মাথায় ব্রহ্মপুত্র নদ। নদের পাড়েই সবুজে ঘেরা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালার দ্বিতল সাদা ভবন। সামনে শিল্পাচার্যের নামে গড়ে তোলা বিস্তৃত পার্ক। সংগ্রহশালার প্রবেশদ্বারের সামনে দাঁড়াতেই চীনামাটি দিয়ে গড়া শিল্পীর আবক্ষ ভাস্কর্য যেন দর্শনার্থীদের হাতছানি দিচ্ছে।
শিল্পাচার্যের আঁকা চিত্রশিল্প ও তাঁর ব্যবহার্য জিনিসপত্র নিয়ে গড়ে তোলা হয় সংগ্রহশালাটি। ১৯৭৫ সালে এর যাত্রা হলেও ২০০৬ সালে নতুন করে সাজানো হয়। সংগ্রহশালার পুরো চত্বরটি গাছগাছালি পরিবেষ্টিত মনোরম পরিবেশ। সামনে প্রশস্ত আঙিনা। নদের পানির কলকল ধ্বনি। শীতল বাতাস। বৃক্ষের ডালে বসে পাখিরা ডেকে যাচ্চে নানান সুরে। প্রকৃত অর্থেই এটি শিল্পকুঞ্জ।
ভবনের নিচতলায় পোস্টার, পুস্তিকা ও বই বিক্রয়কেন্দ্র। উত্তর দিকের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গিয়ে দেখি বারান্দার দেয়ালে প্রদর্শিত করা আছে জয়নুলের জীবনের বিভিন্ন আলোকচিত্র। এরপর ১ নম্বর গ্যালারি। এ গ্যালারিতে রয়েছে শিল্পীর আঁকা শম্ভুগঞ্জ ঘাট, শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ, স্কেচ (বংশীবাদক), বাস্তুহারা, প্রতিকৃতি, মহিষের বাচ্চা, কাজী নজরুল ইসলাম, কংকালসার, দুর্ভিক্ষ, রমণী-১, ১৯৫১, কাগজে টেম্পোরা, মনপুরা, মা ও ছেলে-১৯৫১, কলসি কাঁকে-১৯৫১, স্নানশেষে-১৯৫১, মা ও শিশু-১৯৫৩, তিন রক্ষী-১৯৫৩, চিন্তা-১৯৫৩ (১), চিন্তা-১৯৫৩ (২)।
২ নম্বর গ্যালারিতে রয়েছে শিল্পাচার্যের ব্যবহার্য জুতা, কোট, রঙতুলি, চিত্রপট, কলম, শার্ট-প্যান্ট ও খাট, শিল্পাচার্যের ডি. লিট ডিগ্রি প্রাপ্তির গাউন, টুপি, ডি. লিট সনদ (দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়), টেপাপুতুল, সম্মাননা সনদ (বুলবুল ললিতকলা একাডেমি), শ্রদ্ধার্ঘ্য (চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে আগমন উপলক্ষে), ঘড়ি, শেরওয়ানি, কোট, পায়জামা (শিল্পাচার্যের সহধর্মিণীর নিজ হাতে সেলাই করা) ইত্যাদি।
এখানে জয়নুলের আঁকা মোট ৬২টি চিত্রকর্ম রয়েছে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন সংগ্রহশালাটিতে বর্তমানে ১৮৫টি শিল্পকর্ম ও ব্যক্তিগত স্মৃতি নিদর্শন এবং আলোকচিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। তার বিখ্যাত চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা, নবান্ন, ফসল মাড়াই, সংগ্রাম, সাঁওতাল রমণী, ঝড়, কাক ও বিদ্রোহী, গুণটানা, নদী পারাপারের অপেক্ষায় পিতা-পুত্র ইত্যাদি।
এখানকার প্রতিটি শিল্পকর্মই আমাদের ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের পরিচয় বহন করে। নান্দনিক এ আঙিনা আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় শিল্পীর সৃজনজগতের সঙ্গে। ভবনের নিচতলায় একটা মিলনায়তন রয়েছে। যেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন বর্ষবরণ এবং ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া এ সংগ্রহশালা থেকে 'জয়নুল আবেদীন আর্ট স্কুল' পরিচালিত হয়। বৃহষ্পতি ও শুক্রবার ক্লাস হয়।
প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত অনেক দর্শনার্থী এ সংগ্রহশালা পরিদর্শনে আসেন। শনিবার থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এটি খোলা থাকে। প্রতি শুক্রবার খোলা থাকে বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। ১২ বছর বয়স পর্যন্ত প্রবেশ ফি ১০ টাকা, বড়দের জন্য ২০ টাকা। এ সংগ্রহশালায় প্রথমে ৭০টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছিল, যার বেশিরভাগই ছিল তৈলচিত্র। এখানকার ১৭টি আকর্ষণীয় ছবি ১৯৮২ সালে
চুরি হয়ে যায়। এর মধ্যে ১০টি ১৯৯৪ সালে উদ্ধার হয়। সংগ্রহশালার ভবনটি প্রায় শতবর্ষ পুরোনো। বর্ষাকালে আর্দ্রতা বেশি থাকায় ভবনটি স্যাঁতসেঁতে হয়ে যায়। এখানে রোদ বা সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না। ফলে ছবি বা চিত্রকর্মগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।