আমীরুল ইসলাম
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৩ ০০:২৩ এএম
আপডেট : ১৬ জুন ২০২৩ ১১:১২ এএম
অলংকরণ: মামুন হোসাইন
আমার বাবা খুব নৈতিক মানুষ ছিলেন। সত্য বলতেন। অনিয়ম-অনাচার পছন্দ করতেন না। সৎ উপার্জন করতেন। কিন্তু তার কোনো সংস্কার ছিল না। ষোল আনা বাঙালি তিনি। খাবারের ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে ছিলেন। স্বাদ গ্রহণে তার জিব ছিল অতি ধারালো। একটু ঝাল লবণ কম হলেই বাবা রাগ করতেন। তরকারিতে স্বাদ কম হলে বাবা বলতেন, মমতা ছাড়া রান্না। স্প্যানিশ ভাষায় বলা হয় ‘দুয়েন্দা’। এ রান্নায় দুয়েন্দা নেই।
এই বলে মায়ের দিকে তাকাতেন। মা কোনো মন্তব্য করতেন না। কারণ মা জানেন তিনি খুব খারাপ রান্না করেননি। মায়ের রান্নায় জাদু ছিল। মা শেষ পর্যন্ত রান্না করে বাজিমাত করতেন। সবাই মায়ের রান্নার প্রশংসা করত। তাই বাবার কথা তিনি কানে তুলতেন না। ভাবতেন পরের বেলা ভালো রান্না করে বাবাকে খুশি করবেন।
ছোটবেলায় দেখেছি বাবা অঙ্কে খুব পাকা। পাটিগণিত, সরল অঙ্ক, ঐকিক নিয়মের অঙ্ক, লসাগু, গসাগু কিংবা সুদকষার অঙ্ক। আমরা যদি ছোটবেলায় অঙ্ক না পারতাম বাবা বেত দিয়ে পেটাতেন।
হারামজাদা! পিঠের ছাল তুলে নেব।
একদিন সত্যি সত্যি বাবা আমার বড় ভাইদের পিঠে একটা বেত ভাঙলেন। মা ভাইয়ার পিঠের কাপড় তুলে দেখেন সেখানে চাক চাক লাল দাগ। রক্ত জমাট বেঁধেছে। বড় ভাই হাউমাউ করে কাঁদলেন। বাবা নির্বিকার। তখনও বকা দিয়ে যাচ্ছেন।
হারামজাদা অঙ্ক পারছ না। সামান্য যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ এটাও ঠিকমতো শিখল না।
বড় হয়ে কোন কাজ করে খাবি? কোথাও চাকরিবাকরি পাবি না।
বাবা রাগে গজগজ করছেন। তার ভয়ানক মন খারাপ। বড় ভাইকে বেত দিয়ে মেরেছেন বলে নয়, অঙ্ক কেন পারবে নাÑ এ নিয়ে মন খারাপ। বাবা ভাঙা বেতটা দূরে ফেলে গভীরভাবে অঙ্ক বইয়ের পাতা ওল্টাতে লাগলেন। মন তার চঞ্চল। অস্থিরভাবে কী যেন ভাবছেন।
বাবা হঠাৎ রেগে যান, হঠাৎই ঠান্ডা হয়ে যান। যখন ঠান্ডা হয়ে যান তখন একদম চুপ। কারও সঙ্গে কথা বলেন না। বাবা তখন গল্পের বই পড়ায় মনোযোগী হন। রাগ করলে অবশ্যই বাবা হাসির গল্প পড়তে ভালোবাসতেন।
সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা পড়তেন। বাবার খুব প্রিয় লেখক।
পড়তে পড়তে বাবা একাই হো হো করে হেসে উঠতেন। তারপর বাবা নিজেই বলতেন অসাধারণ লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী।
কী সুন্দরভাবে বলেছেন দ্যাখ।
বলেই বাবা পঠিত লেখাটা আমাদের শোনানোর চেষ্টা করতেন। বাবা হেসে হেসে গল্প বলতেন। তোরা সব মূর্খ। লেখাটার মর্ম কিছুই বুঝলি না। মুখ গোমড়া করতেন বাবা।
বাবা অল্প খেতেন কিন্তু খাওয়ার মধ্যে স্বাদ হতে হবে। ঝাল লবণ পরিমাণমতো না হলে বাবা খাবার মুখে তুলতেন না।
বাবার প্রিয় ছিল গরুর মাংস।
বলতেন, গরুর মাংস না খেলে আমার শরীর ঠিক থাকে না। ম্যাজম্যাজ করে।
শীতকালে বাঁধাকপি দিয়ে গরুর মাংস কিংবা পুঁইশাক দিয়ে গরুর মাংস বাবার খুব প্রিয়। ঘন মসুরের ডাল, টাকি মাছের ভর্তা, সাদা ঝরঝরে ভাত, ইলিশ মাছের যেকোনো ধরনের রান্না বাবার রসনাকে উদ্দীপ্ত করত। বাবা ভাতের সঙ্গে ঘি মাখিয়ে খেতেন। কাগজি লেবুর রস, আমের আচার আর গরুর মাংস দিয়ে সাদা ভাত পেলে বাবা গোগ্রাসে খেতেন। তখন তার চেহারায় আলোর জেল্লা খেলে যেত। সেই বাবাকে নিয়ে একটা গল্প বলি।
খাবার খরচের বাইরে অন্য কোনো ব্যাপারে খুব কৃপণ ছিলেন বাবা। বাসে উঠেই ভাড়া নিয়ে তর্কবিতর্ক। এক আনা দুই আনা নিয়ে তুমুল বাগবিতণ্ডা।
বাবা হয়তো গেছেন জামার দোকানে। অনেক দরদামের পর বাবা কিনতেন।
ওই ব্যাটা! টাকা কি গাছের পাতা, চাইলি আর ঝরঝর করে পড়ল?
এটা ছিল বাবার খুব কমন কথা। কিন্তু ভালো মাছ বা মাংসের দরদাম করতেন না। বাবার অসুখবিসুখ হতো না। খুব সময় মেনে চলতেন। সময়ের বাইরে খাদ্যগ্রহণে তার অনীহা ছিল। এই আমার বাবা।
একবার বাড়িতে বেড়াতে গেছেন আমাকে আর ডিনাকে নিয়ে।
ডিনা আমার ছোট ভাই। অকালপ্রয়াত। ক্লাস ফোরে থাকতে রিউমেটিক ফেভারে মারা যায়। খুব মেধাবী ছিল। হৃৎপিণ্ড দুর্বল বলে লাফঝাঁপ, খেলাধুলা কম করত। দুপুরবেলা বাবা খেতে বসেছেন।
বাবার বন্ধু অর্থাৎ আনোয়ার কাকা বিশাল আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেছেন। টেবিলজুড়ে নানা পদের খাবার।
বাবা বসলেন। তারপর খাওয়া শুরু হলো। আনোয়ার কাকা বাবাকে ভালোই চেনেন।
বাবার খুঁতখুঁতানি সম্পর্কে জানেন। কাকিমা পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। হ্যাঁ, ভাবির রান্না খুব ভালো হয়েছে। কাকিমা চমকে উঠলেন। সাইফ ভাইয়ের কাছে রান্নার প্রশংসা পাবেন না কোনো রাঁধুনি।
তবে একটা কথা ভাবি। কাকিমা উৎসুক হলেন। রান্নাবাড়া করার সময় তাড়াহুড়া করবা না। খুব যত্ন নিয়া রানবা।
কাকিমা মাথা নামিয়ে আছেন। লজ্জায় জবুথবু। বাবা অনর্গল বলে যাচ্ছেন।
গরুর মাংসটায় আরও ঝাল হতো ভাবি। ঝোলের মধ্যে কেমন পানি কেটে আছে। মাছের ফ্রাইটা ভালোই হয়েছে। তবে ওপরে ভাজা হয়েছে ভেতরে কাঁচা। ডালে আরেকটু লবণ-পেঁয়াজ প্রয়োজন ছিল। বুঝলা ভাবি। কাকিমা বললেন, হ্যাঁ, সাইফ ভাই ঠিকই বলেছেন।
আনোয়ার কাকা চতুর মানুষ। হাসতে হাসতে বললেন, সাইফ ভাই আপনাকে আর কী বলব! এই তাড়াহুড়ার রান্না খেয়েই আমাকে জীবন ধারণ করতে হয়।
বাবা হাসলেন। ভাবি কষিয়ে রান্না করলে স্বাদ ভালো হবে। চুলায় হাঁড়ি চড়ালাম আর নামিয়ে নিলাম। তাহলে কিন্তু রান্না হবে না। কাকিমা চুপ রইলেন। তার বলার কিছু নেই। আনোয়ার কাকা অনেক আপ্যায়ন করেছেন। কিন্তু বাবার এক কথায় সব আনন্দ মাটি হয়ে গেল। বাবা টুকটাক খেয়ে উঠে পড়লাম।
কাকিমা পরে চা-মুড়ি দিলেন। মুড়ি চিবানো আর চায়ে চুমুক দেওয়া বাবার প্রিয় অভ্যাস।
আমার বাবা খুব সরল ও বোকা ছিলেন বলে সরাসরি সবকিছু বলে দিতেন। কোনো রাখঢাক ছিল না। তাই বলে বাবার কোনো শত্রু ছিল না। কেউ বাবাকে অপছন্দ করত না। সরলতায় মোড়া এক আশ্চর্য মানুষ ছিলেন তিনি। বাবাকে নিয়ে আমার লেখালেখি কোনো দিন শেষ হবে না।