উদ্যোগ
সুবর্ণা মেহ্জাবীন স্বর্ণা
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৩ ১৩:২৬ পিএম
আপডেট : ১৪ জুন ২০২৩ ১৪:১৮ পিএম
ছবি : মিতার গল্প
দেশীয় ফেব্রিক, মোটিফকে সব সময় প্রাধান্য দেন ফ্যাশন ডিজাইনার মাসুমা আক্তার মিথিলা। খাদি ও সিল্কের মিশেলে নিজস্ব কারিগর দিয়ে বুনছেন অর্গানিক কাপড়। গামছা, গ্রামীণ চেক কাপড়ের সঙ্গে স্বকীয় ডিজাইনে তৈরি পোশাক রয়েছে তার মিতার গল্পে

নান্দনিক শাড়ি ও ব্লাউজের জন্য পরিচিতি পেয়েছে মিতার গল্প। যার নেপথ্যে আছেন মাসুমা আক্তার মিথিলা। পেশায় আইনজীবী হলেও প্যাশনে তিনি ফ্যাশন ডিজাইনার। নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। এরপর সমাজকল্যাণে মাস্টার্স শেষ করেছেন ইডেন থেকে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডিজাইন থেকে ডিপ্লোমা ডিগ্রি নিয়েছেন ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে। ছোটবেলা থেকেই পোশাকের ব্যাপারে ছিলেন শৌখিন। নিজের পোশাক নিজেই কাস্টমাইজ করতেন, যা ছিল সবার থেকে আলাদা। সেই ধারা থেকেই আইনের মতো কঠিন বিষয়ে পড়ার পাশাপাশি ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে ডিপ্লোমায় ভর্তি হন। পড়াশোনা শেষে একসঙ্গে পেশা ও শখের জায়গায় কাজ শুরু করছিলেন এই উদ্যোক্তা।

২০১৫ সালে দেশের প্রথম সারির বেশ কিছু ফ্যাশন হাউসের সঙ্গে শাড়ি, ব্লাউজ, জুয়েলারির ডিজাইনার এবং প্রডিউসার হিসেবে কাজ করেছেন মিথিলা। কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে নকশা, সেলাইসহ পোশাক তৈরির সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন একা হাতে। একটা সময় অনুভব করেন, নিজের ডিজাইন করা জিনিস চলে যাচ্ছে অন্য প্রতিষ্ঠানে। এর চেয়ে ভালো নিজেই কিছুই করি না কেন!
২০১৮ সালে নিজের উদ্যোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথিলা’স ফ্যাশন অ্যান্ড জুয়েলারি নামের একটি পেজ খুলে শুরু করেন যাত্রা। তবে একসঙ্গে পেশা ও প্যাশন দুই দিক সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। তখন কিছুদিন বন্ধ ছিল নিজের শখের কাজ। ক্যারিয়ারে নজর দিয়েই সামনে আগাচ্ছিলেন। এরই মধ্যে ২০২২ সালের জুন মাসে মিথিলা আক্রান্ত হন থাইরয়েড ক্যানসারে। জুলাই মাসে অপারেশন শেষে সুস্থ হয়ে কাজে ফিরলেও হতাশায় ভুগতে থাকেন। তখন অবসরে কিছু পোশাকের ডিজাইন করেন, মনের আনন্দের জন্য। চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়া-আসা ছিল। আগের ডিজাইন করা কিছু পোশাক ঘরে মজুত থাকায় ভারতীয় বন্ধু তানিয়া রায়ের সহযোগিতায় সেখানে একটি প্রদর্শনীতে অংশ নেন। প্রদর্শনীতে সব পোশাক বিক্রি হয়ে যায় মিথিলার। নতুন করে শখের কাজ শুরু করার উদ্দীপনা পান তিনি। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালের নভেম্বরে নতুন একটি ফেসবুক পেজ খোলেন ‘মিতার গল্প’ নামে; যেখানে রয়েছে স্বকীয় ডিজাইনের নানা পোশাক। যার মধ্যে আছে শাড়ি, ব্লাউজ, কুর্তি, থ্রিপিস, টুপিস, পাঞ্জাবি, শার্টসহ অনেক কিছু।

নারীর পছন্দের পোশাক শাড়ি। কিন্তু শাড়ি পরতে গেলে বেশিরভাগ সময় মানানসই ব্লাউজ বাছাইয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। ব্লাউজের ফিটিংস ও ডিজাইন মনের মতো না হলে পরে স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়া যায় না। এ ছাড়া শাড়িপ্রেমী যারা তাদের সংগ্রহে জামদানি তো থাকবেই। সেই জামদানি শাড়ির ব্লাউজ সুন্দর করে বানালেও কিছুদিন পরই সেলাই ফেঁসে যায়। যেকোনো রঙের জামদানি কিংবা শাড়ির সঙ্গে মানানসই ব্লাউজ যেন পাওয়া যায়, সেই চিন্তা থেকে মিথিলা তৈরি করেছেন স্বকীয় নানা ডিজাইনের ব্লাউজ। বিভিন্ন দাম ও মানের ব্লাউজ মেলে এখানে। গ্রাহক চাহিদার কথা মাথায় রেখে চলতি বছরের মার্চ মাসে রাজধানীর বনানীতে ‘মিতার গল্প’-এর আউটলেট খুলেছেন মিথিলা।

দেশীয় ফেব্রিক, মোটিফকে সব সময় প্রাধান্য দেন সংগ্রামী এই ফ্যাশন ডিজাইনার। খাদি ও সিল্কের মিশেলে নিজস্ব কারিগর দিয়ে বুনন করিয়েছেন অর্গানিক কাপড়। গামছা, গ্রামীণ চেক কাপড়ের সঙ্গে স্বকীয় ডিজাইনে তৈরি করছেন শাড়ি। এ ছাড়া সুতি, সিল্ক, মসলিন, হাফ-সিল্ক, লিলেন, জামদানিসহ নানা ফেব্রিকের শাড়িও রয়েছে তার ভান্ডারে। ব্লাউজ তৈরিতে ব্যবহার করেন খাদি-সিল্ক, গামছা, সুতি, বেক্সি ভয়েল, জর্জেট ও সিল্ক ফেব্রিক। মোটিফ হিসেবে প্রাধান্য দেন স্বাধীন বিষয়কে। যার মধ্যে আছে পাখি, মাছ ও প্রজাপতি। এ ছাড়া ফুল, লতাপাতা, ইতিহাস, ঐতিহ্যও ফুটিয়ে তোলেন সুনিপুণ নকশায়।
আরও পড়ুন : গয়নার নকশাকার

ব্র্যান্ডটির রয়েছে স্বকীয় নকশার বেশ কিছু শাড়ি। যার মধ্যে রয়েছে ট্রেডিশনাল হাতের এম্ব্রয়ডারি, ল-মোটিফ, ইয়োগা মোটিফ, ফ্রিদা-কাহালোর সেলফ পোট্রেট, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, মধুবনী ও ট্রেডিশনাল হাতের এপ্লিক। এসব থিমে তৈরি করেছেন একেকটা সিরিজ। যেখানে একই থিমের ওপর আছে ছয়-সাতটি ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইনের শাড়ি। এ ছাড়া ব্লক, বাটিক, টাই-ডাই, প্রিন্ট, কারচুপি, কাঁথাস্টিচ, নকশিকাঁথার নকশা তো আছেই। তবে চিরচেনা নকশার মধ্যেও নানা বৈচিত্র্য দেখতে পাবেন মিতার গল্পে। প্রতিষ্ঠানটির শাড়ির আরেকটি স্বকীয়তা হচ্ছে প্রতিটি শাড়িতে ফলস পাড় করা অর্থাৎ রেডি টু ওয়্যার।
ভবিষ্যতে মিতার গল্পকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চান মিথিলা। যেখানে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়েও কাজ করতে চান তিনি। এ ছাড়াও বিশ্বের দরবারে দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকেও তুলে ধরতে চান এই উদ্যোক্তা।