ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ-২০২৩
আসমাউল হুসনা
প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৩ ১৪:৩৮ পিএম
ইউআইইউ শিক্ষার্থীদের নির্মিত রোবট ‘ইউআইইউ মার্স রোভার’ এশিয়ায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে
সৌরজগৎ নিয়ে মানুষের জল্পনা-কল্পনা বহুদিনের। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে সৌরজগৎ ও মহাকাশ সম্পর্কে অনেক তথ্যই যেমন আমরা জানতে পেরেছি তেমনি আগ্রহ বেড়েছে আরও জানার। সৌরজগতের দ্বিতীয় ক্ষুদ্র গ্রহ মঙ্গল। এটিকে লাল গ্রহও বলা হয়।
মঙ্গল গ্রহ অর্থাৎ মার্সে প্রাণ প্রতিষ্ঠায় সম্প্রতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মার্স সোসাইটি কর্তৃক ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ-২০২৩ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বনামধন্য মার্কিনভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। লক্ষ্য মঙ্গল গ্রহে মানুষের বসবাসের সম্ভাব্যতা অনুসন্ধান। ১ থেকে ৩ জুন তিন দিনব্যাপী এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ৩৬টি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউডা স্টেটের হ্যাঙ্কসলিভে অবস্থিত বিখ্যাত মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশনে প্রতিবছরই চূড়ান্ত প্রতিযোগীরা তাদের উদ্ভাবিত রোবট নিয়ে আসেন। এ বছর মার্স সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ (ইউআরসি) ২০২৩-এ ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) শিক্ষার্থীদের নির্মিত রোবট ‘ইউআইইউ মার্স রোভার’ এশিয়ায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে। ৩৬টি দলের মধ্যে বিশ্বে নবম হয়েছে ইউআইইউ থেকে অংশ নেওয়া এই দলটি।
ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ নামের এ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণের সুযোগ পান বলে জানা যায়। মহাকাশ বিজ্ঞানীদের একটি অংশ মনে করে, ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহের বুকে গড়ে উঠবে মানববসতি। এ কারণে দিনরাত কাজ করে চলেছেন নানা দেশের বড় বড় বিজ্ঞানীরা। তবে এই লক্ষ্য অর্জন করতে চাই অত্যাধুনিক সরঞ্জাম। চাই এমন সব আধুনিক রোভার, যেগুলো মঙ্গলপৃষ্ঠে মানুষের বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ যাচাই করবে। এরকম রোভার তৈরির চ্যালেঞ্জ নিয়েই এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে যুক্তরাষ্ট্রের দ্য মার্স সোসাইটি।
আয়োজকদের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, চূড়ান্ত রাউন্ডে নিজেদের তৈরি রোভারের ক্ষমতা এবং অপারেশন দক্ষতা প্রদর্শন করে অংশগ্রহণকারী দলগুলো। এ জন্য রোভারগুলোকে অনুসন্ধান, স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন, চরম পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা এবং ইকুইপমেন্ট সার্ভিসিং- এই চারটি মিশনে পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। বিজয়ী ইউআইইউ দলের এক সদস্য জানান, প্রাথমিক রাউন্ডে দলটিকে একটি সিস্টেম অ্যাকসেপ্টেন্স রিভিউ (এসএআর) ভিডিও জমা দিতে হয়েছিল, যা বিভিন্ন মিশন যেমন বিজ্ঞান অনুসন্ধান, স্বায়ত্তশাসিত নেভিগেশন, এক্সট্রিম ডেলিভারি এবং সরঞ্জাম পরিষেবা সম্পাদনে রোভারের সক্ষমতা তুলে ধরা হয়।
ইউআইইউ মার্স রোভারের প্রটোটাইপ হচ্ছে টেলস সম্ভাব্য জীবনের লক্ষণ শনাক্ত করতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা পরিচালনা, মাটি ও শিলার নমুনা বিশ্লেষণে তার দক্ষতা প্রদর্শন করেছে। এসএআর ভিডিওটি টেলসের মূল ইলেকট্রনিক এবং যোগাযোগব্যবস্থা, সে সঙ্গে পরীক্ষা এবং অপারেশনের দৃঢ়তাকে সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করেছে।
মার্স সোসাইটির উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইউআরসি চ্যালেঞ্জে শিক্ষার্থীদের দলকে পরবর্তী প্রজন্মের মার্স রোভার নকশা তৈরি করতে বলা হয়, যা পরবর্তী সময়ে মঙ্গলযাত্রার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।
ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ-২০২৩ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর ‘ইন্টারপ্ল্যানেটার’ ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ‘ইউআইইউ মার্স রোভার’ দলসহ ব্র্যাক, এইউএসটি, এমআইএসটি, এআইইউবি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা।ইউআইইউ মার্স রোভার দলটির সমন্বয় ও তত্ত্বাবধানে ছিলেন ইউআইইউর কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক আকিব জামান।

ইউআইইউ মার্স রোভার টিমের দলনেতা ছিলেন ইইই বিভাগের আবিদ হোসেন। সফরকারী দলের অন্য সদস্যরা হলেন আহমেদ জুনায়েদ (সিএসই), টিএম আল আনাম (সিএসই), সুরাইয়া আফরোজ মারিয়া (সিএসই), শেখ সাকিব হোসেন (সিএসই), শাহ মেহরাব হোসেন ফাহিম (সিএসই), মো. ইয়াসিন (সিএসই), আবদুল্লাহ আল মাসুদ (সিএসই), শোরওয়ার হোসেন (সিএসই) ও মো. বদিউজ্জামান শিকদার (ইইই)।
ইউআইইউ মার্স রোভার দলে কম্পিউটার বিজ্ঞান, বৈদ্যুতিক বিজ্ঞান এবং ব্যবসাসহ বিভিন্ন শাখার ২৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। রোভার ডিজাইনিংয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্র সম্পর্কিত ছয়টি উপদলে বিভক্ত করা হায়। দলের সদস্যদের রোবোটিক্স এবং অটোমেশনের পাশাপাশি থ্রিডি সিমুলেশন, মহাকাশে জীবন শনাক্তকরণ, ড্রোন ও স্বায়ত্তশাসিত নেভিগেশনের মতো ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত রাউন্ডে পৌঁছানোর আগে বিশ্বব্যাপী অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কঠোর প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়েছে দল ‘ইউআইইউ মার্স রোভার’কে।
চূড়ান্ত ফাইনালিস্ট ৩৬টি দলের চ্যাম্পিয়নশিপের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৪২৫.৩৫ পয়েন্ট নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ইউনির্ভাসিটির একটি দল, ৩৫৪.৮৩ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির একটি দল এবং ৩৪৪.০৯ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিংহাম ইয়ং ইউনিভার্সিটির একটি দল।
২৭৩.৫৯ পয়েন্ট নিয়ে ‘ইউআইইউ মার্স রোভার’ ৩৬টি দলের মধ্যে এশিয়ায় প্রথম এবং বিশ্বে নবম স্থান অর্জন করেছে। তালিকার সেরা দশের মধ্যে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের আরও তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কানাডা, মেক্সিকো ও পোলান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে।