ইমরান উজ-জামান
প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৩ ১৪:১৮ পিএম
সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করছেন একজন মৌয়াল ছবি: আশিকুর রহমান
চলছে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের মৌসুম। প্রতি বছর এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত চলে মধু সংগ্রহ। এর সঙ্গে জড়িত থাকেন প্রায় সাত হাজার মৌয়াল। ২০২২ সালে সুন্দরবন থেকে ২ হাজার ৩২০ কুইন্টাল মধু সংগ্রহ করা হয়। যা থেকে রাজস্ব আয় হয় ৩৬ লাখ ৯৩ হাজার ৬০০ টাকা। এ বছর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন হাজার কুইন্টাল বা তিন লাখ কেজি মধু সংগ্রহের। সুন্দরবনের মৌয়ালদের সঙ্গে মধু সংগ্রহের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা...
পশুর নদ যখন পার হই, বিহানের আলোকপ্রভা তখনও মৃত্তিকার দুনিয়ায় পা রাখেনি। পোর্টঘাটে পারাপারে ধুম পড়েছে, সবাই রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের চাকুরে। অতি প্রত্যুষ হওয়ায় মোংলা ঘাট পার হয়ে বানিশান্তা বাজারে পৌঁছাতে সাড়ে তিনশ টাকা গুনতে হলো, অথচ নিয়মিত পারাপার শুরু হলে জনপ্রতি ৩০ টাকা লাগত। তবে বসে থাকতে হতো আরও ঘণ্টা দুই।
বানিশান্তা বাজার তখনও আড়মোড়া ভাঙেনি। দুয়েকটি দোকানে ঝাঁপ খোলার শব্দ শোনা যাচ্ছে। নদের পাড়ের কিছু খাবার দোকানে ইতোমধ্যে পরোটা ভাজা শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই করমজল থেকে ফোন দিয়েছেন কবির ভাই (করমজল পয়েন্টের অফিসার ইনচার্জ)। জানালেন বোটের ব্যবস্থা করছেন। বসতে হবে।
হোটেলে পরোটা-ভাজি দিয়ে নাশতা শেষ করে বসেছি কেবল, একজন জানতে চাইলেন কোথায় যাব। করমজল বলতে ফের জানতে চাইলেন ভ্রমণ কি না। বললাম, কবির ভাইয়ের কাছে যাব। লোকগুলো বললেন, তারা ফরেস্ট অফিসারের কাছে যাচ্ছেন। আমাদের দুজনকে যেতে বললেন। কবির ভাই ফোনে তাদের সঙ্গেই যেতে বললেন। শ্যালো নৌকায় প্রায় ঘণ্টার পথ করমজল ফরেস্ট অফিস। গিয়ে পৌঁছলাম বনের রাজার বাসভবনে।

আমি আর হাবিব বোট থেকে নেমে দৌড় দিয়েছি নতুন করে নির্মিত ওয়াচিং টাওয়ার, সিঁড়ি আর খালের ওপর ঝুলন্ত ব্রিজ পরিদর্শনে। বানরের বাঁদরামি বেশ দেখা হলো, বন্দুক হাতে একজন বনরক্ষী আমাদের পাশে পাশে হাঁটছেন। তিনি দেখালেন গত পরশু মামা এসেছিলেন খালের পাড়ে। পায়ের ছাপ তখনও দৃশ্যমান। কুমির চাষ, কচ্ছপ চাষ প্রকল্প দেখলাম।
ফিরে দেখি ঢাংমারির মৌয়ালি আলমকে খবর দেওয়া হয়েছিল। বাউল আর নিতেশবাবুকে নিয়ে হাজির হয়েছেন। বসে আছেন ঘাটে। আমাদের নিয়ে বনে যাবেন। আমরাও ফুলহাতার শার্ট, ট্রাউজার, প্লাস্টিকের জুতা পরে কোষা নৌকায় চড়ে বসলাম। নৌকার ছনে হাল ধরে নিতেশ। সামনে বৈঠা সমানে চালিয়ে যাচ্ছেন বাউল ভাই। মাঝে আমি, হাবিব আর আলম মৌয়াল।
ঢাংমারি খালের মুখে চড়ায় নৌকা টেনে তুলে রেখে মোজা ও প্লাস্টিকের জুতা পরে নিলেন মৌয়ালরা, মুখে পরলেন প্লাস্টিকের সুতার জালটুপি। কেউবা আবার এসবের ধারই ধারেন না। খেজুরের মতো ঘরে আছে কিন্তু খাওয়া যায় না, মানে বিচিসর্বস্ব একটা ফল, নাম হেতাল। হেতাল গাছের শুকনো পাতা ছিঁড়ে মুড়িয়ে তার ওপর কাঁচা পাতায় মোড়ানো হয়। শুকনো পাতাগুলো আগুন জ্বলতে সহায়তা করে আর কাঁচা পাতাগুলো ধোঁয়া তৈরি করে।

পরে তিন দিক থেকে তারা তিনজন বনের গহিনে ঢোকা শুরু করলেন। আমরা তাদের অনুসরণ করতে থাকি। একসময় কুঁইকুঁই করে কেমন একটা শব্দ করতেই সবাই একসঙ্গে মিলিত হয়ে যায়। আমরাও। একটা দশাসই মৌচাক সামনেই ঝুলছে। গাজি গাজি বলে মামার চরণে অভিবাদন রেখে ম্যাচের কাঠিতে তা দেয়। জ্বলে ওঠে আগুন। হেতালপাতার বান্ডেলে আগুন দিতেই লকলকিয়ে শিখা জ্বলে ওঠে।
একটু ওপরের গাছের শাখে মৌচাক। প্লাস্টিকের বালতি গলা থেকে হাতলিতে ঝুলিয়ে লকলকিয়ে আলম মৌয়াল গাছে উঠে যান। নিচে হাত পাততেই নিতেশ আগুনের বোন্দা ছুড়ে মারেন বিশেষ কায়দায়। আলম লুফে নেন। আরও দুই কদম উঠে মৌচাকের নিচে ধোঁয়ার বান্ডিল ধরে রাখেন। সব মৌমাছি সরে গেলে বালতি বাসার নিচে ধরে ছোট আকারের বিশেষ রকমের দা দিয়ে কচকচ করে চাকের মধুর অংশটুকু কেটে বালতিদাবা করে তরতর নেমে আসেন আলম।

বালতিতে মধুর চাকের অংশবিশেষ মুখে দিতেই আঃ! একেই বলে মধুর আবেশ। সুন্দরবনেই মেলে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের মধু। মধুগুলোর পুরোটাই নিয়ে নিলাম চাকসহ। পরের চাক কাটতে গিয়ে ১১টি হুল নিয়ে হাঁসফাঁস করতে করতে বসতিতে ফিরলাম।
এক ফাঁকে ভুল করে করমজলসংলগ্ন খাড়িতে গোসল করতে নেমে গেলাম। আশপাশে যারাই ছিলেন দৌড়ে এসে মাথায় হাত দিয়ে হাহুতাশ করছেন। কবির ভাই এসে খুব তাড়াতাড়ি উঠে যেতে বললেন। কারণ এ খাড়িতে একটি কুমিরের পরিবার বাস করে! ওপারের গোলবনে প্রায় সময়ই রোদ পোহাতে উঠে আসে। এসব শুনে আর মোবাইলে তোলা ছবি দেখে আমার শরীর হিম হয়ে আসছিল। ছোট নৌকায় চড়ে আমরা রওনা দিলাম ঢাংমারি গ্রামে। দিনমান সেখানে কাটিয়ে অবশেষে বনবাসী বন্ধু উৎপলের বাড়ি পৌঁছলাম।