শিশির কুমার নাথ
প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৩ ১২:৩৫ পিএম
সিলেটের জিন্দাবাজার মোড় থেকে বাঁয়ে এগোতে চোখে পড়ল বড় একটি সাইনবোর্ড। লেখা ‘রাজাকুঞ্জ’। কৌতূহল নিয়ে পৌঁছালাম একটা টিনশেডের পুরোনো বাড়ির সামনে। বুঝলাম এটি মরমি কবি হাছন রাজার স্মৃতি জাদুঘর ‘মিউজিয়াম অব রাজাস’। মূল কক্ষের দরজার দুই পাশের সিংহের প্রতিকৃতি জোড়া যেন দর্শনার্থীদের স্বাগত জানাচ্ছে। বারান্দার দেয়ালে সাঁটানো কিছু ছবি ও বর্ণনাচিত্র দেখে জানলাম জাদুঘরটি দেওয়ান তালেবুর রাজা ট্রাস্টের পৃষ্ঠপোষকতায় ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হাছন রাজার পরিবার ও সিলেট বিভাগের মরমি কবিদের মূল্যবান ইতিহাস সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করাই এর লক্ষ্য।
দুই কক্ষবিশিষ্ট এ সংগ্রহশালার একটিতে হাছন রাজার জীবনপঞ্জিসংবলিত বাঁধাই করা ছবি। সেটিতে হাছন রাজার জন্ম ৭ পৌষ, ১২৬১-মৃত্যু ২২ অগ্রহায়ণ, ১৩২৯ ছাড়াও আরও কর্মপঞ্জির দিনতারিখ উল্লেখ করা হয়েছে। দৃষ্টি কাড়ল হাছন রাজা পরিবারের ব্যবহৃত লোহার সিন্দুক। এর মধ্যে এগিয়ে এলেন জাদুঘরের কিউরেটর মাহবুব রহমান শেখ। তিনি একে একে দেখাতে লাগলেন দেওয়ান তালেবুর রাজার ব্যবহৃত রুপার তারের পোশাক, হাছন রাজার স্ত্রী সাজেদা বানুর (পিরানি বিবি) ব্যবহৃত পাথরের বাসন, পুত্রবধূ মেহেরজান বানুর সোনার তারের পোশাক, শিকার করা হরিণের মাথা, শ্বেতপাথরে তৈরি সিংহের মুখোশ, হাছন রাজার হাতে লেখা গানের পাণ্ডুলিপি। ১৯৮৬ সালে এসব সামগ্রী সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি। শোকেসের ভেতর একটি মেডেল দেখিয়ে বললেন, এখানে যে মেডেলটি দেখতে পাচ্ছেন সেটি ১৯২৯ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক হাছন রাজার ছেলে দেওয়ান একলিমুর রাজাকে দেওয়া খান বাহাদুর মেডেল। দেয়ালে টানানো তালিকায় লেখা হাছন রাজার পোষা ৮০টি কোড়া পাখির নাম। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম টক্করিয়া, সেরেরিয়া, পরিজাত, মিয়াধনের কোড়া, হাছনজান প্রভৃতি। ঘোড়দৌড় হাছন রাজার শখ ছিল। তা বোঝা গেল তাঁর নিজের হাতে লেখা প্রিয় ৭৮টি ঘোড়ার নাম দেখে; যা জাদুঘরে টানানো রয়েছে। কদমবাজ, দুলদুল, ২৭৫ টেকি আড়ুয়া, নিউ হোপ, চান্দ মুসকি, চান্দা, মাসুদ পিয়ারিসহ আরও সুন্দর সুন্দর নাম। জিবা, বাংলা বাহাদুর, রাজরানী, হাছন প্যারী, সুরতজান প্রভৃতি বাহারি নামে তাঁর ৯টি হাতি ছিল। সেগুলোর নামও লিপিবদ্ধ রয়েছে।
এ ছাড়া জাদুঘরটিতে রয়েছে সারিন্দা, একতারা, ঢোলক, খমক, মৃদঙ্গ, ব্যর্থ জুরি, বাঁশিসহ বেশ কিছু লোকবাদ্যযন্ত্র। ময়মনসিংহ থেকে সংগৃহীত লোকবাদ্য তুম্বিরা, মারমাদের ব্যবহৃত প্লুং ও হ্ণে বাঁশি, উগান্ডা থেকে সংগৃহীত বাদ্যযন্ত্র এনগোমো, আফ্রিকান গিটার, হুক্কা, খড়ম, কয়লাচালিত আয়রন, পিতলের কলস, শ্বেতপাথরের বাসন, মুদ্রা, রাজ পরিবারে ব্যবহৃত আসবাবপত্র, হাছন রাজার ঘোড়ার পায়ের খাট, ঘোড়ার লাগাম, ক্ষুদ্রাকৃতি কুরআন শরিফ, আলোকচিত্র, হাছন রাজাকে নিয়ে লেখা ৩২টি বই, চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘হাছন রাজা’ সিনেমায় ব্যবহৃত পোশাক, ক্যাসেট, হাছন রাজাকে নিয়ে প্রকাশিত ডাকটিকিট ইত্যাদি। সব মিলিয়ে দুটি গ্যালারিতে শতাধিক নিদর্শন প্রদর্শিত হচ্ছে। কতটা অধ্যাত্ম উপলব্ধি হলে এমন রাজসিক জীবন বিসর্জন দিয়ে ‘উদাস’ হাছনে পরিণত হওয়া যায়! সাউন্ড সিস্টেমে মৃদু শব্দে বাজছে ‘একদিন তোর হইবে রে মরণ হাছন রাজা, একদিন তোর হইবে মরণ।’ এর মধ্যে কথা হলো রিফাত নামে এক দর্শনার্থীর সঙ্গে। হাছন রাজার গান তার প্রিয়। তিনি অভিভূত হয়েছেন কবির হাতের লেখা পাণ্ডুলিপি দেখে।
সুনামগঞ্জের লক্ষ্মণছিরিতে (লক্ষ্মণশ্রী) জন্ম দেওয়ান হাছন রাজা চৌধুরীর। জাদুঘরের কিউরেটর জানালেন, এই মরমি কবিকে জানতে প্রতিদিনই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন আসেন। বিশেষ করে গবেষকরা তাঁদের কাজের জন্য আসেন। জাদুঘরে প্রবেশমূল্য ২০ টাকা। সাপ্তাহিক ছুটি রবিবার। দুপুর গড়িয়ে বিকাল। ব্যস্ত সিলেট নগরের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি আর কানে বাজছে, ‘হাছন রাজায় কয় আমি কিছু নয় রে আমি কিছু নয়’। কিছু না হতে চেয়েও মানুষের মনে স্থান করে নিলেন দেওয়ান হাছন রাজা।