আব্দুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৩ ১৪:১৭ পিএম
আপডেট : ০৫ জুন ২০২৩ ১৪:১৮ পিএম
প্রতিদিন খাবার গ্রহণের সময় নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খায় মনে। যা খাচ্ছি তা নিরাপদ তো? ফলমূলে কেমিক্যাল, মাছে ফরমালিন, মাংসে ক্ষতিকর হরমোন, শাকসবজিতে কীটনাশক- নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব খাবারেই রয়েছে ক্ষতির শঙ্কা। স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বাঁচতে খাদ্যের নিরাপত্তায় কঠোর আইন। তবুও কি নিশ্চিত হচ্ছে খাবারের মান? ৭ জুন বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টায় বিশেষ লেখা--
রাজধানী ঢাকার উত্তরা নিবাসী মহিমা ফাইরুজ। এলাকার এক দোকান থেকে সন্তানের জন্য বিস্কুট কিনে বাসায় এনে দেখেন প্যাকেটের গায়ে মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ শেষ হয়ে গেছে দুদিন আগেই। পরবর্তী সময়ে দোকানিকে এ বিষয়ে অবহিত করলে তিনি বলেন, ‘মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। কোম্পানি বদলে দেবে।’ তাহলে এই বিস্কুট কেন বিক্রির জন্য রাখা আছে- এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি দোকানি।
ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহাদ। বন্ধুদের সঙ্গে মেসে থাকেন। কিন্তু নানা কারণে তাকে বাইরের খাবারের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফাহাদ বলেন, কারণে-অকারণে বাইরের হোটেলে খাবার খেতে হয়, কিন্তু এর মান ও এটা কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকে। খাবার নিয়ে অভিযোগ করলে হোটেল মালিকরা থোড়াই কেয়ার করেন। কী খাচ্ছি বা খাবার কতটা স্বাস্থ্যসম্মত, তা না জেনেই খেতে হয় ফাহাদকে। এজন্য মাসের অধিকাংশ সময়ই গ্যাসট্রিক, পেটের পীড়াসহ নানা সমস্যায় ভুগতে হয় তাকে।
খাদ্যের নিরাপত্তা বিষয়ে মহিমা বা ফাহাদের মতো ভুক্তভোগীর সংখ্যা কম নয়। প্রতিদিনই কেউ না কেউ ঘরে-বাইরে এ নিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। কিন্তু এ বিষয়ে প্রতিকার মেলে খুব কমই।
মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম মৌলিক চাহিদা হলো খাদ্য। মূলত আমাদের অস্তিত্ব খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল। তাই সুস্থ সবল জাতি গড়তে খাদ্যের নিরাপত্তা ও পুষ্টি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ২৫/১ ধারায় প্রত্যেক মানুষের খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ আছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) ও ১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য খাদ্যের মৌলিক চাহিদা পূরণ আবশ্যক। কিন্তু খাদ্যের নিরাপত্তা বা নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে আলোচনা শুধু সাধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ যেন।

২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর নাগরিকের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিরাপদ খাদ্য আইন অনুমোদন করা হয়। এ ছাড়া বিএসটিআই আইন ২০১৮ এবং আয়োডিনযুক্ত লবণ আইন ২০২১ নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধানে আইনি কাঠামোর অংশ। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এ নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিধিনিষেধের উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিষাক্ত দ্রব্যের ব্যবহার পরিহার; তেজস্ক্রিয়, ভারী ধাতু ইত্যাদির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার রোধ; ভেজাল খাদ্য বা খাদ্যোপকরণ উৎপাদন, আমদানি, বিপণন ইত্যাদি পরিহার; নিম্নমানের খাদ্য উৎপাদন না করা; খাদ্য সংযোজন দ্রব্য বা প্রক্রিয়াকরণ-সহায়ক দ্রব্যের ব্যবহার না করা; শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত তেল, বর্জ্য, ভেজাল বা দূষণকারী দ্রব্য ইত্যাদি খাদ্য স্থাপনায় না রাখা; মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণ না রাখা; বৃদ্ধি প্রবর্ধক, কীটনাশক, বালাইনাশক বা ওষুধের অবশিষ্টাংশ, অণুজীব ইত্যাদির ব্যবহার পরিহার; বংশগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনকৃত খাদ্য, জৈব খাদ্য, ব্যবহারিক খাদ্য, স্বত্বাধিকারী খাদ্য ইত্যাদি সরবরাহ বা বিক্রয় না করা; খাদ্য মোড়কীকরণ ও লেবেলিং পরিবর্তন না করা; মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিবেচিত প্রক্রিয়ায় খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, বিক্রয় ইত্যাদি পরিহার; রোগাক্রান্ত বা পচা মৎস্য, মাংস, দুগ্ধ বিক্রয় না করা; হোটেল রেস্তোরাঁ বা ভোজনস্থলের পরিবেশনসেবা দ্বারা ভোক্তার স্বাস্থ্যহানি না ঘটানো; ছোঁয়াচে ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তির দ্বারা খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত না করা; নকল খাদ্য উৎপাদন, বিক্রয় ইত্যাদি পরিহার; অনিবন্ধিত অবস্থায় খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, বিক্রয় না করা; কর্তৃপক্ষ বা তদকর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সহযোগিতা করা প্রভৃতি। এ আইনে উল্লিখিত যেকোনো দায়িত্বের লঙ্ঘন আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে পরিচালিত হয় বিশেষ অভিযান। সম্প্রতি মিরপুর-১২ নম্বর এলাকার মুসলিম বাজারে অভিযান চালায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের একটি দল। অভিযোগ ছিল, বাসি-পচা মাছ ও মাংস টাটকা দেখাতে তাজা রক্ত ও রঙ মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছিল ওই বাজারে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক আব্দুস সোবহানের নেতৃত্বে এ অভিযানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। আব্দুস সোবহান উপস্থিত সংবাদকর্মীদের বলেন, ‘মাছ-মাংসের দোকানে পণ্য বিক্রি করার ক্ষেত্রে অনিয়ম পাওয়া গেছে। তারা পচা বা বাসি মাছ-মাংস টাটকা দেখানোর জন্য এটা করছে। এসব মাছ-মাংস আমরা জব্দ করেছি। এটি সচেতনতা বাড়ানোর জন্য অভিযান, সেজন্য তাদের জরিমানা করা হয়নি।’

এ ছাড়া চট্টগ্রামের কিষোয়ান স্ন্যাকস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কারখানার কর্মীরা স্বাস্থ্যবিধি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি বেশ উদাসীন। অধিকাংশ কর্মীই আবার বিভিন্ন ধরনের ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত। এ ছাড়া কারখানার পরিবেশও ছিল নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন। এসব অসঙ্গতি থাকার পরও উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছিল প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে মুচলেকা দিলে এক মাসের সময় বেঁধে দেওয়া হয়।
দেশের অধিকাংশ খাদ্যপণ্য উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের মান ও গুণাগুণের বিষয়ে ভোক্তাদের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৯ সালের রমজান মাস শুরুর আগে খোলা বাজার থেকে ৪০৬টি পণ্যের নমুনা ক্রয় করে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট বা বিএসটিআই। পণ্যগুলো পরীক্ষার পরে দেখা যায়, এর মধ্যে ৫২টি পণ্য ল্যাব পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে ছিল সরিষার তেল, চিপস, খাবার পানি, নুডলস, হলুদ ও মরিচের গুঁড়া, আয়োডিন যুক্ত লবণ, লাচ্ছা সেমাই, চানাচুর, বিস্কুট এবং ঘি। পণ্যগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরেও বাজারে বিক্রি হচ্ছিল সেগুলো। পরবর্তী সময়ে পণ্যগুলো বাজার থেকে প্রত্যাহার বা জব্দ চেয়ে কনসাস কনজ্যুমার সোসাইটির (সিসিএস) পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিহাব উদ্দিন খান জনস্বার্থে একটি রিট দায়ের করেন। ওই রিটের বিপরীতে খাদ্যপণ্যগুলো প্রত্যাহার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।
খাদ্য নিরাপদ না হলে তা আমাদের শরীরের জন্য কতটা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে প্রকাশ পায়। সংস্থাটির মতে, প্রতিবছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়। এ কারণে প্রতিবছর মারা যায় ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষ। এ ছাড়া ৫ বছরের চেয়ে কম বয়সি শিশুর ৪৩ শতাংশই খাবারজনিত রোগে আক্রান্ত হয়, প্রতিবছর প্রাণ হারায় ১ লাখ ২৫ হাজার শিশু। কিন্তু আমাদের দেশে খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণের প্রত্যেকটি ধাপেই অধিকাংশ সময় ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো হয়ে থাকে। এসব বিষযুক্ত খাবার খেয়ে ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে সাধারণেরও রয়েছে সচেতনতার অভাব। লক্ষ করলে দেখা যায়, হোটেল-রেস্তোরাঁ বা পথের খাবার বিক্রির সময় খবরের কাগজ বা লিখিত কাগজ দেওয়া হয়। এসব ছাপা বা লেখা কাগজে ব্যবহৃত রঙ-কালিতে পিগমেন্ট ও প্রিজারভেটিভস থাকে। এ ছাড়া এসব কাগজে রোগসৃষ্টিকারী অণুজীবও থাকে। এসব উপাদানে নিয়মিত খাবার খেলে ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনিরোগসহ নানাবিধ রোগের আশঙ্কা থাকে। নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ অনুযায়ী এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধও বটে। কিন্তু তবু ক্রেতা ও ভোক্তাপর্যায়ে এ বিষয়ে সচেতনতার বালাই নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশে ধানসহ বিভিন্ন কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু অধিক ফসল উৎপাদন করতে গিয়ে জনস্বাস্থ্যকেই যে আমরা হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছি, তার খেয়াল কি রাখছি। ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির গবেষণায় কৃষি পণ্যের মধ্যে ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, সিসা ও আর্সেনিকের অস্তিত্ব মিলেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, সিসা ও আর্সেনিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে তা বের হতে পারে না। সবকটিই দীর্ঘমেয়াদে কিডনি, লিভার ও মস্তিষ্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ ছাড়া ক্যানসারসহ নানা ধরনের ক্রনিক রোগের বড় উৎস হচ্ছে এসব রাসায়নিক। এগুলো ধীরে ধীরে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
ইউরোপীয় কমিশনের নীতিমালা অনুসারে মানবদেহের জন্য ক্রোমিয়ামের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ১ পিপিএম। জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের গবেষণায় চালে ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে ৩.৪১৪ পিপিএম পর্যন্ত। ক্যাডমিয়ামের সহনীয় মাত্রা ০.১ পিপিএম হলেও গবেষণায় পাওয়া গেছে ৩.২৩৯৫ পিপিএম পর্যন্ত। সিসার সহনীয় মাত্রা ০.২ পিপিএম হলেও পাওয়া গেছে ১.৮৭ পিপিএম পর্যন্ত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালে ক্যাডমিয়ামের প্রধান কারণ জমিতে নিম্নমানের টিএসপি সার প্রয়োগ এবং গার্মেন্টস শিল্প, ওষুধ কারখানা, টেক্সটাইল ও ট্যানারির অপরিশোধিত বর্জ্য। তাদের মতে, পরিবেশদূষণের পাশাপাশি কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারের পরিণতি কমবেশি সবাইকে ভোগ করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। সঠিক মান ঠিক না করে এবং প্রয়োগবিধি না মেনে বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগের ফলে একাধারে উৎপাদিত ফসল, মাছ, পানি ও জমি মারাত্মকভাবে বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে মানুষের শরীরে সহজেই প্রবেশ করছে এই বিষাক্ত উপাদান। ফসল ও মাছে ভারী ধাতু প্রবেশ করছে মূলত মাটি ও পানি থেকে। মাটি ও পানি এমনভাবে রাসায়নিক দূষণের কবলে পড়েছে, যা খাদ্যচক্র হয়ে মানবদেহে প্রবেশ করে মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে।
অনিরাপদ খাদ্যে এই বিপন্নতার শেষ কোথায় জানা নেই। তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় এবং বর্তমান সময়ের মানুষদের জীবন বাঁচাতে নিরাপদ খাবারের বিকল্প নেই।