মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৩ ১৪:২১ পিএম
এবারের গ্রীষ্মের কথা। তীব্র দাবদাহে পুড়ছে মাঠঘাট, মানুষ ও প্রাণী। হাতে সময় কম বলে কাঠফাটা দুপুর রোদের ভেতরেই যশোর শহর থেকে বেরিয়ে পড়লাম একটি আঙুর বাগান দেখতে। যশোর থেকে মাগুরার পথে কিছুদূর গিয়েই পড়ল যশোর সদর উপজেলার লেবুতলা বাজার। বাঁ দিকে মোড় নিয়ে চললাম লেবুতলা গ্রামে। রাস্তার দেই ধারে সবুজ গাছপালার ছায়ায় গরম অনেকটা কমে এলো। গরম অনুভূতিটা যেন পরম প্রশান্তি পেল একটি আঙুর বাগান দেখে। দোকানে সাজানো থোকা থোকা আঙুরের মতো মাচায় গাছের লতার গিঁটে গিঁটে ঝুলছে সবুজ থোকা থোকা আঙুর। যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছে না, বাংলাদেশের মাটিতে এভাবে আঙুর ধরতে পারে!
আঙুর চাষ করে চমক লাগিয়েছেন লেবুতলা গ্রামের একজন কৃষক, নাম মুনসুর আলী। আমাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি তার আঙুর বাগান দেখাতে লাগলেন আর বলে যেতে লাগলেন তার আঙুর চাষের কথা। প্রায় দেড় বছর আগে তিনি ভারত থেকে ষাট হাজার টাকায় ১২০টি চয়ন জাতের আঙুরের চারা সংগ্রহ করে ৩৩ শতক জমিতে লাগান। ইতালির সোনিকা জাতের চারাও কিছু লাগান। সোনিকা জাতের আঙুর পাকলে তার রঙ হয় লাল, চয়ন জাতের আঙুরের রঙ সবুজ। চারাগুলো লাগানোর সময় কেউ কেউ তাকে পাগল ভেবেছিল। বলেছিল, এ দেশে আঙুরের চাষ করে খামোখা টাকা নষ্ট করছেন, সঙ্গে জমিটাও। এ জমিতে বরাবর তিনি সবজি চাষ করে আসছেন। অনেকেই বললেন সেটাই তো ভালো ছিল-আঙুর চাষের ঝুঁকি নেওয়ার দরকার কি? কিন্তু মুনসুর আলীর প্রশ্ন, পাশের দেশ ভারতে আঙুর হলে বাংলাদেশে কেন হবে না?
চারা লাগানোর সাত মাসের মাথায় গাছে আঙুর ধরে। প্রতিটি গাছে প্রায় ১০ থেকে ১৫ কেজি করে আঙুর ধরে। তিনি নিয়ত করেছিলেন, আঙুর যদি ধরে ও স্বাদে মিষ্টি হয় তা হলে তা প্রতিবেশীদের ফ্রি খাইয়ে দেবেন, বিক্রি করবেন না। তাই তিনি করেছেন। চারা লাগানোর জন্য তিনি ৮ ফুট দূরে দূরে সারি করে গর্ত করেন, গর্তের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেন কিছু জৈব সার, ইটের গুড়া ও মোটা সিলেট বালি। গর্তের মাটি ঢিবি করে সেই ঢিবির ওপরে ২০২২ সালের ভাদ্র মাসের ১০ তারিখে চারাগুলো লাগিয়েছিলেন। প্রথম ফুল আসে চারা লাগানোর ৭ মাস পর। ফুল আসার পর তাতে আঙুর ধরে, প্রায় ৯০ দিন পর সেগুলো পাকে। শ্রাবণ-ভাদ্র মাস পর্যন্ত পাকা আঙুর তোলা যায়। শীতে পাতা ঝরে গাছ ন্যাড়া হয়ে যায়। শীত শেষে ফাল্গুন মাসের প্রথম সপ্তাহে তিনি গাছ ছেঁটে দেন। লতার কাঠের মতো অংশ রেখে দিয়ে সবুজ অংশটুকু তিনি ছেঁটে দেন। এসব গাছ থেকে তিনি লতা কেটে প্রায় ৫ হাজার চারা তৈরি করেছেন।
তার আঙুরের বাগান দেখতে রোজ অনেক মানুষ আসেন। দেখে তার মতো আঙুরের চাষ করতে উৎসাহী হয়ে চারা কিনে নিয়ে যান। এমনকি কুরিয়ারেও তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে আঙুরের চারা পাঠাচ্ছেন। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা ও নড়াইলের প্রায় ২০টি স্থানে তার কাছ থেকে চারা নিয়ে আগ্রহী কৃষকরা বাগান করেছেন। তিনি এখন সারা দেশে আঙুরের চাষ ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর রয়েছেন। আশা করছেন, বাগানে এবার ২০-৩০ মণ আঙুর হবে।
সঙ্গে ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যশোরের জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার সুশান্ত কুমার তরফদার। তিনি বলেন, ‘এ দেশে আঙুর ফলছে দেখে খুব ভালো লাগছে। তবে এ দেশের উপযোগী জাত উন্নয়ন ও চাষ প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা দরকার। আঙুর চাষ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এর আকার, ফলন ও মিষ্টতা পরীক্ষা করা দরকার। দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব পরীক্ষার পর ফল সন্তোষজনক হলে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের কথা চিন্তা করা যাবে।’