× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বর্ণান্ধতা সমাধানে সাইফের উদ্ভাবন

সিফাত রাব্বানী

প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৩ ১৩:৪৯ পিএম

আপডেট : ০৪ জুন ২০২৩ ১৩:৪৯ পিএম

বর্ণান্ধতা সমাধানে সাইফের উদ্ভাবন

সাইফ আহামেদ, পড়ছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে। প্রবল ইচ্ছা ছিল পাইলট হবেন। কিন্তু বিপত্তি আসে মেডিকেল টেস্টে যে তিনি বর্ণান্ধতা বরণ করেছেন। যে কারণে সাইফের স্বপ্ন পূরণ হলো না। চেষ্টা চালালেন নিজেই বর্ণান্ধতা দূর করার গ্লাস বানানোর। অজস্র চেষ্টা বিফলে গেলেও শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছেন, যেন স্কটিস বীর রবার্ট ব্রুসের মতো যুদ্ধ জয় করলেন। তার প্রচেষ্টার পেছনের পুরো গল্প জানাচ্ছেন সিফাত রাব্বানী

অদম্য সাইফের সঙ্গে গল্প করতে গিয়ে একটা পর্যায়ে জানতে চাওয়া হলো কখন এবং কেন ‘ভাইব্র্যান্ট’ বানানোর ইচ্ছে প্রবল হলো? জানা গেল, স্বপ্নভঙ্গ থেকেই ‘ভাইব্র্যান্ট’-এর আগমন হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতো তার বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল তিনি মেডিকেল কলেজে পড়বেন । কিন্তু ছোটবেলা থেকে পাইলট হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করে পাইলট হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ফ্লাইং একাডেমিতে ভর্তির জন্য নিজে নিজেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অবশেষে গ্যালাক্সি ফ্লাইং একাডেমিতে ভর্তি হলেন। কিন্তু সব পর্যায় শেষে চূড়ান্ত মেডিকেল টেস্টে জানতে পারলেন তিনি কালার ব্লাইন্ড বা বর্ণান্ধতায় ভুগছেন।

মুহূর্তে যেমন জীবন অমাবস্যায় অন্ধকার হয়ে যায়- ঠিক যেন স্বপ্ন হাতে পেয়েও না পাওয়াই থেকে গেল তার। কারণ তার আর কোথাও ফিরে যাওয়ার মতো সুযোগ ছিল না, প্রায় সব জায়গাতেই ভর্তি পরীক্ষা শেষ। এক বছর পর ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হন। তিনি ভেবেছেন পৃথিবীতে রোগের সমাধান ওষুধে আছে। তবু এই কালার ব্লাইন্ডনেসের বা বর্ণান্ধের ব্যথা নিয়ে এগোতে থাকেন। অনেক ঘাঁটাঘাঁটির পর আমেরিকাতে রঙের বর্ণান্ধদের জন্য একটি গ্লাস ‘অ্যানকোমা’র সন্ধান পান সাইফ। এটি অর্ডার করে আনলেও তেমন কোনো উপকার পাননি তিনি। ওই গ্লাসে তিনি কালার ব্লাইন্ড টেস্টে পাস করতে পারছিলেন না। তবে কালার ব্লাইন্ডনেস নিয়ে গ্লাস বানানো যেহেতু সম্ভব, তার পর থেকে তিনি একটা কথাই মাথায় রেখেছেন যে চশমা পরে যদি পাইলট হওয়া যায়, তা হলে তিনি পাইলটে যেভাবেই হোক ফিরে যাবেন। এভাবেই শুরু হলো ভাইব্রেন্টের সূচনা। 

সাইফ বাড়িতে নিজের ঘরে গবেষণা করে, নিজেই সাধারণ গ্লাসে ধাপে ধাপে পরীক্ষা করতে শুরু করেন প্রথমে। বহুবার ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও হাল ছেড়ে দেননি। ব্যথাও তাকে পেছাতে দেয়নি। প্রতিবার যখন হেরে যেতেন, আকাশে প্লেনের শব্দে তিনি আবার তার রুমে ফিরে আসতেন, বসে পড়তেন এই গ্লাসের রঙ পরিবর্তনে। এভাবে আড়াই বছর পর অবশেষে বহু কষ্টে সাফল্যের মুখ দেখেন। তার তৈরি করা গ্লাস সফলভাবে রঙ আলাদা করতে পারে বর্তমানে।

প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা অনুযায়ী তিনি এটার উদ্ভাবনের জন্য স্বীকৃতি পাবেন কি না এ ব্যাপারেও তথ্য পাওয়া গেল। তিনি আশা রাখেন, তার পড়াশোনা যেহেতু মেডিসিন নিয়ে আর এই চশমা তো এক ধরনের রোগেরই সমাধান। তার প্রতিষ্ঠান তাকে সাহায্য করলে তিনি এটাকে আরও অনেকদূর নিয়ে যাবেন এবং কালার ব্লাইন্ডের নতুন কোনো সমাধান নিয়ে আসবেন, যা আগে কখন পৃথিবী দেখেনি।

এর উদ্ভাবনের পেছনের পরিশ্রম নিয়ে জানিয়েছেন ভিন্নভাবে। তার মতে, পরিশ্রম বলতে গেলে ভুল হবে। এগুলো ‘না বলা কষ্ট’। কারণ তিনি বাবা-মায়ের কথা না শুনে যার পেছনে দৌড়েছেন, তাও তিনি পাননি। তার গ্লাস রঙ কেনার জন্য টাকার প্রয়োজন হতো; ওই টাকাও তিনি চাইতে পারেননি। কারণ তার বাবা-মা তার প্রতি তখন রাগান্বিত ছিলেন। সেই টাকার জন্য অনেক না বলা গল্প রয়েছে। তার পর গ্লাসগুলো তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে কিনে আনতেন। ঘরে বলতেও পারতেন না তিনি কি করছেন? নিজের ভেতরের সেই স্বপ্নভঙ্গের কষ্টের সঙ্গে এসব চাপে তিনি প্রায় অনেক সময় মানসিকভাবে বিষণ্নতায় ভুগছিলেন এবং চিকিৎসার জন্য অনেক ডাক্তারের কাছেও যেতে হয়েছিল। এখনও ঘরে খুঁজলে অনেক ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র পাওয়া যাবে। 

সাইফের উদ্ভাবন করা কালার ব্লাইন্ড মানুষকে রঙ পার্থক্য করতে সাহায্য করবে এবং রঙ চিনতে সাহায্য করবে। মানুষের ক্যারিয়ার সমস্যার সমাধান করবে। মানুষ যখন প্রথম রঙ আলাদা করে দেখতে পায় গ্লাস পরে, তখন তারা আবেগি হয়ে যায়। এটা নিরাপত্তা হিসেবেও কাজ করবে।

এটি সম্পূর্ণ সঠিক কি না, কীভাবে মান যাচাই করা হলো- এ বিষয়ে তার অভিমত হলো, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে জরিপ করে দেখেছেন এটা কাজ করে কি না এবং প্রশংসনীয় ফল পেয়েছেন। গত বছর ফার্মা ফেস্টে তার এই গ্লাস প্রথম স্থান অধিকারী হয়েছিল। 

এটি বানাতে কোন স্তরে আপনি বেশি ব্যর্থ হয়েছেন এবং তা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল?- এ প্রশ্নে তিনি একটু নিঃশ্বাস ফেলে শুরু করলেন। যখন তিনি গ্লাস কালার করতেন কিন্তু টেস্টগুলো পাস করতে পারতেন না, হাল ছেড়ে দিতেন। কিন্তু আকাশে বিমানের শব্দ তাকে আটকিয়ে রেখেছিল পিছু হটা থেকে। ভেবেছেন মানুষ কতভাবে অনুপ্রেরণা পায়? 

সাইফের সফলতা আপনাদেরও অনুপ্রেরণার রাস্তা হতে পারে। তার আত্মবিশাস ছিল আকাশচুম্বী। কারণ একটাই ছিল- তাকে যেভাবে হোক আকাশে পাখির মতো ঘুরে বেড়াতে হবে! কষ্টের সঙ্গে বললেন- ‘সত্যি বলতে আমার পাশে কেউ ছিল না। এমনকি আমার বাবা-মাও না! আমি কি করছি আর কেন করছি- এটা বোঝানো আমার জন্য ওই সময় অনেক কঠিন ছিল।’ 

একে বাজারজাত করা কিংবা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছা আছে?- এ ব্যাপারে স্পষ্ট উত্তরই এলো। তিনি চান কালার ব্লাইন্ড নিয়ে আর কারও যেন পিছনে ফিরতে না হয়, তিনি যা অনুভব করেছেন আর কেউ যেন সেই একই অনূভুতি অনুভব না করে, আর তা তার উদ্ভাবিত গ্লাস দিয়ে সম্ভব। পৃথিবীতে যে গ্লাসগুলো আছে, সব চশমার ডিজাইনের, বাইরে থেকে চোখ দেখা যায় না। তার গ্লাসগুলোয় চোখের দৃষ্টিশক্তির অক্ষমতা থাকলে সে অনুযায়ী পাওয়ার সংযুক্ত করা যাবে। যা আগে কোনো প্রতিষ্ঠান করতে পারেনি। আর এর দামও তুলনামূলক সব গ্লাস থেকে কম। এই উদ্ভাবনের পেটেন্ট নিয়ে শিগগিরই আবেদন করবেন সাইফ। এতদিন চেষ্টা করছিলেন পাওয়ার যুক্ত করা যায় কি না, এখন তা সফল।

তার গ্লাস নিয়ে ব্যবসা করার তেমন ইচ্ছে নেই। কিন্তু মানুষের উপকারের জন্য ভাইব্র্যান্ট  সব সময়ই থাকবে বলে আশ্বস্ত করলেন তিনি। সাইফের একটাই ইচ্ছে, তিনি এখন কালার ব্লাইন্ড টেস্ট যেহেতু পাস করতে পেরেছেন আর পাইলটদের চশমা পরার অনুমোদন আছে। সুতরাং তিনি আমার স্বপ্নকেই ছুঁতে চান।জীবনযুদ্ধে, ইচ্ছাপূরণে যারা ব্যর্থ হয় কিংবা তার মতো এগিয়ে যেতে চায়- তাদের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা দিয়েছেন। তার বার্তাটি হলো- তার লক্ষ্যে এখনও পৌঁছাতে পারেননি, কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে এই ভাইব্র্যান্টের আবিষ্কার হয়েছে। তাই বলতে চান, লক্ষ্যটা যদি অটুট থাকে- তার পেছনের ধৈর্য আর পরিশ্রম কখনও ব্যর্থ হয় না। ভালো কিছু ঘটবেই।

তিনি দুটো কথা শিখেছেন নিজের জীবন থেকে। চারপাশে মানুষ নানা কথা বলবে। 

-নিজের জীবনের স্বপ্নকে মন দিয়ে রঙিন করো। 

-মস্তিষ্ক দিয়ে ওই স্বপ্নকে সাজিয়ে তুলো।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা