দেবাশীষ বিশ্বাস
প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৩ ১৩:০০ পিএম
আপডেট : ২৪ মে ২০২৩ ১৩:০৬ পিএম
তীব্র গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন। তবে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এসি বা এয়ার কন্ডিশনার এই ভোগান্তি অনেকাংশে কমাতে পারে। একসময় উচ্চবিত্তদের বিলাসবহুল পণ্য ছিল এসি, এখন সবার প্রয়োজনীয়তায় রূপ নিয়েছে। তবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি কেনার সময় খেয়াল রাখতে হবে নানা বিষয়

এয়ার কন্ডিশনারের রয়েছে নানা প্রকারভেদ। যেমন-
উইন্ডো এসি : ছোট রুম বা ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে উইন্ডো এসি। এতে কম্প্রেসার, কনডেনসার, কয়েল ও ইভাপোর্টের সবকিছু একটি ইউনিটে যুক্ত থাকে। তাই খুব সহজে স্থাপন করা যায়। তবে একটু বড় কক্ষের ক্ষেত্রে ব্যবহার না করা ভালো।
পোর্টেবল এসি : এটি এক ধরনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, যা খুব সহজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া যায়। এই এসি স্ট্যান্ড-আপ এয়ার কন্ডিশনার হিসেবেও পরিচিত। নিচে চাকা সংযুক্ত থাকায় পোর্টেবল এসি খুব সহজেই নড়াচড়া করা ও সরানো যায়। মূলত দৈনন্দিন কুলিংয়ের প্রয়োজন মেটাতে বিভিন্ন রুমে স্থানান্তর করা হয়ে থাকে। তবে এই এসি স্থাপন করতে উইন্ডো কিটের প্রয়োজন হয়। রুমের বাইরের দিকে একটি পাইপের দ্বারা বাতাস আনা-নেওয়া করতে হয়। সেন্ট্রাল বা উইন্ডো এসির বিকল্প হিসেবে পরিচিত পোর্টেবল এসি।
স্প্লিট এসি : ইনডোর ও আউটডোর দুই অংশে বিভক্ত থাকে স্প্লিট এসি। ইনডোর অংশ- ইভাপোরেটর, ব্লোয়ার ফ্যান সমন্বয়ে গঠিত। একটি কয়েল থাকায় এই ইউনিট কক্ষ থেকে উত্তাপ গ্রহণ কিংবা প্রদান করে। আর আউটডোর-কম্প্রেসার, কন্ডেন্সার সমন্বয়ে গঠিত। এই ইউনিট খোলা বাতাসে রাখতে হয়।
ওয়াল এসি : এটি অনেকটা উইন্ডো এসির মতো। এর একটি সিঙ্গেল ইউনিটে সবকিছু থাকে, যা সরাসরি দেয়ালে স্থাপন করা যায়। দামে কিছুটা বেশি হলেও উইন্ডো বা পোর্টেবল এসির চেয়ে বেশি জনপ্রিয় ওয়াল এসি।
এসি কেনার সময় কী কী বিষয় খেয়াল রাখবেন-
ইনভার্টার নাকি নন-ইনভার্টার : এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মূল চিন্তার বিষয় বিদ্যুৎ বিল। তবে বাজারে থাকা ইনভার্টার এসি তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ খরচ করে। এসি চালু করলে এর কম্প্রেসার মোটর সম্পূর্ণ গতিতে ঘর ঠান্ডা করে। ঘর ঠান্ডা হয়ে গেলে কম্প্রেসার মোটর নিজে গতি কমিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। এই গতি কমিয়ে চলার জন্যই বিদ্যুৎ বিল কম আসে। পাশাপাশি ইনভার্টার এসিতে শব্দও অনেক কম। তাই দিন দিন এই এসি কেনার প্রতি আগ্রহ বেশ বাড়ছে। নন-ইনভার্টার এসির দাম একটু কম, তবে বিদ্যুৎ খরচ বেশি। এই এসির কম্প্রেসার মোটর দ্রুতগতিতে চলে এবং ঘর ঠান্ডা হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায়। ঘর গরম হলে এসি পুনরায় চালু হয়। তাই প্রতিবার নতুন করে কম্প্রেসার চালু হওয়ার কারণে বিদ্যুৎ বিল বেশি আসে।
উইন্ডো নাকি স্প্লিট : এসি কেনার আগেই ঠিক করে নিতে হবে স্প্লিট নাকি উইন্ডো এসি কিনবেন। স্প্লিট এসিতে কম্প্রেসার ঘরের বাইরে থাকে বলে মেশিনের শব্দ শোনা যায় না। কিন্তু সমস্যা হলো কম্প্রেসার বসানোর জন্য ঘরের দেয়াল ভাঙতে হয়। অন্যদিকে উইন্ডো এসি স্থাপন করতে জানালা বন্ধ হয়ে যায়। তাই এসি বন্ধ থাকলে ঘরে আলো-বাতাস ঢোকার সম্ভাবনা কমে যায়। দামের দিক থেকে উইন্ডো এসির দাম কম এবং স্প্লিট এসির দাম বেশি।
আরও পড়ুন : ব্লেন্ডার কেনার আগে
ঘরের আকার অনুসারে
এসি কেনার সময় অবশ্যই ঘরের আকার অনুযায়ী কিনতে হবে। ঘরের আয়তন সর্বোচ্চ ১৪০ স্কয়ার ফিট হলে এক টন ক্ষমতাসম্পন্ন এসি কিনলেই চলবে। তবে ঘরের আকার যদি ১৪০ থেকে ১৯৬ স্কয়ার ফিটের মধ্যে হয় তবে দেড় টন কার্যক্ষমতার এসি কিনতে হবে। ঘরে জানালা থাকলে পছন্দ অনুসারে ভালো ব্র্যান্ডের উইন্ডো এসি বসালে ভালো হবে। ঘরের আকার বড় ও জানালা না থাকলে স্প্লিট এসি লাগানোই ভালো।
কত টন এসি
টন বলতে এসির ওজন নয় বরং ঘণ্টায় কী পরিমাণ গরম হাওয়া বাইরে বের করতে পারে তার সক্ষমতা বোঝায়। বাজারে এক টন থেকে চার টনের এসি কিনতে পাওয়া যায়। কত টনের এসি প্রয়োজন তা নির্ভর করে ঘরের আয়তন, সূর্যের আলো কতটা পড়ছে ইত্যাদি বিষয়ের ওপর। তাই ঘরের আয়তন অনুসারে এসি কিনতে হবে। এসি ওয়্যার হাউসের তথ্য মতে, এক টনের এসি প্রতি ঘণ্টায় ঘর থেকে ১২,০০০ বিটিইউ (ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) গরম বাতাস অপসারণ করতে পারে। চার টনের এসি ৪৮ হাজার বিটিইউ তাপ বের করতে পারে। তাই ঘরের আয়তন ১০০-১২০ বর্গফুট হলে এক টন এসি। আবার ১২০-১৫০ বর্গফুট ঘরের জন্য প্রয়োজন দেড় টন এসি। অন্যদিকে ১৫০-২০০ বর্গফুট বা তার বেশি আয়তনের ঘর ঠান্ডা করতে দুই টন এসি যথেষ্ট। প্রয়োজনের চাইতে বেশি টনের এসি কিনলে ঘর খুব বেশি ঠান্ডা হয়ে যায়। অযথা বেশি বিদ্যুৎ বিল আসে। অন্যদিকে বড় ঘরে কম টনের এসি লাগালে ঠান্ডাও হবে না, কম্প্রেসার চাপ পড়ে এসি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কনডেনসার ও কম্প্রেসার
এসির মান অনেকটাই নির্ভর করে কনডেনসার ও কম্প্রেসার অ্যালুমিনিয়ামে নাকি কপারে তৈরি তার ওপর। সাধারণত ১০০% কপার কনডেনসার ও ১০০% কপার কম্প্রেসারযুক্ত এসি বেশি টেকসই হয়। আবার কপারের পরিবহন ক্ষমতা বেশি, তাই বিদ্যুৎ খরচ কম হয়। কপার শক্তিশালী ধাতু হওয়ায় সহজে নষ্ট হয় না, বেশি চাপ নিতে পারে। ফলে কোনো ছিদ্র হলেও সহজে মেরামত করা যায় ও ব্যবহার নিরাপদ হয়। কিন্তু অ্যালুমিনিয়াম কনডেনসারে কোনো সুবিধা নেই। তাই এসি কিনার সময় অবশ্যই কপারের তৈরি কনডেনসার ও কম্প্রেসার দেখে কিনতে হবে।
স্টার রেটিং
এসির গায়ে স্টিকারে কিংবা বিজ্ঞাপনে এক থেকে পাঁচটি স্টার রেটিং দেওয়া থাকে। এই স্টার দিয়ে মূলত এসির বিদ্যুৎ সাশ্রয় করার ক্ষমতাকে বোঝায়। অর্থাৎ যত বেশি স্টার তত বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়। তাই এসি ক্রয়ের সময় গায়ে স্টার রেটিং দেখে কেনা উচিত। একটি স্টার বলতে, এসিটি বছরে ৮৪৩ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং ঘণ্টায় আড়াই থেকে সাড়ে তিন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে। অন্যদিকে পাঁচ স্টার মানে এসিটি বছরে ৫৫৪ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং সাড়ে তিন থেকে পাঁচ কিলোওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে সক্ষম। ভালো মানের এসিতে কুলিং ও হিটিংয়ের পাশাপাশি ঠান্ডা নিয়ন্ত্রণে টাইমার, টার্বো কুলিং, স্লিপিং মুডসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকে। অনেক এসিতে বিল্ট ইন এয়ার ফিল্টার থাকে, ওয়ারেন্টি ও বিক্রয়-পরবর্তী সেবা পাওয়া যায়। এ ছাড়া এসিতে কোন গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে সেদিকে নজর দিতে হবে।
সাবধানতা
১. এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বছরে দুইবার এর ফিল্টার পরিষ্কার করা এবং দক্ষ টেকনিশিয়ানের সাহায্যে কম্প্রেসার চেক করতে হবে।
২. সময়ের সঙ্গে এসিতে গ্যাসের মাত্রা কমতে থাকে। রিফিল করতে হলে গ্যাস পরিবেশবান্ধব কি না তা অবশ্যই যাচাই করে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ৪১০-এ গ্যাস সবচেয়ে নিরাপদ, যা বায়ুমণ্ডলের ওজন স্তরের কোনো ক্ষতি করে না।
৩. এসি ব্যবহারে তাপমাত্রা ২৫ বা তার বেশি দিয়ে রাখলে বিদ্যুৎ বিল কম আসবে।
৪. এসি বারবার বন্ধ ও চালু করলেও বিদ্যুৎ বিল বেশি আসে। টাইমার, টার্বো কুলিং মুড বা স্লিপিং মুড ব্যবহার করলে বিল নিয়ন্ত্রণে থাকবে।