মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ : ২০ মে ২০২৩ ১২:০৮ পিএম
মোখা ঝড়ের পরে এক প্রসন্ন বিকালে রাজশাহী থেকে রওনা দিলাম নওগাঁর মান্দার পথে। সঙ্গে নাঈম, সীমা ও সাহেদ। উদ্দেশ্য সেখানকার কালীগ্রামে একটি কৃষি পাঠাগার ও জাদুঘর দেখা। প্রায় ৩০ কিলোমিটার চলার পর কালীগ্রামে পৌঁছলাম। রাস্তার দুই পাশে বড় বড় গাছের ছায়া, গাছে গাছে ডাকছে পাখি, সুনসান ঘরবাড়ি। গাড়ি থেকে নামতেই মো. জাহাঙ্গীর আলম শাহ্ আমাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে গেলেন সেখানে। প্রথমে পাঠাগার, তারপর দর্শনের সুযোগ ঘটল জাদুঘর। তিনি এটার নাম দিয়েছেন ‘শাহ্ কৃষিতথ্য পাঠাগার ও জাদুঘর’। পেশায় শিক্ষক হলেও নেশায় ও উত্তরাধিকারের সূত্র ধরে তিল তিল করে নিঃস্বার্থভাবে একজন মানুষ নিভৃত পল্লীতে নিজের বাড়িতেই মাটির ঘরে গড়ে তুলেছেন অসাধারণ এই কীর্তি।
এই কৃষি জাদুঘরে রয়েছে ৫০টি কর্নার। কর্নারগুলোয় রয়েছে কৃষি ব্যক্তিত্বদের ছবি ও পরিচিতি, প্রাচীন লোককৃষি ঐতিহ্য, কৃষি ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতি, মধু-মৌয়াল, ডিজিটাল কৃষি, ধান, রাসায়নিক ও জৈবকৃষি দ্রব্য, পোকামাকড়, মাথাল, আলোকবাতি, পাদুকা, পাথর, জাইলেবিয়াম বা কাঠ, মাটি, পানি, মৃৎশিল্প, লাঠি, গর্ত খননের হাতিয়ার, দড়ি কাটা ও পাকানো সামগ্রী, ইঁদারা, বিভিন্ন রকমের দড়ি, গাছিদের হাতিয়ার, বেঁজা, জুম চাষিদের হাতিয়ার, চাষিদের পোশাক, মিস্ত্রিদের হাতিয়ার, ফসল ভাঙানোর যন্ত্র, ফসল মাপার সামগ্রী, আইপিএম, চাষি পরিবারে ব্যবহার্য হাতিয়ার, কামার, কুমোর, জাল, মাছ ধরা ও ফাঁদ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণী ধরার ফাঁদ, পাখির বাসা, কৃষিকাজে চলাচল ও যানবাহন, চুলা, ভার, মই, গোলা, আসবাবপত্র, পাখা, পিড়া, স্প্রে যন্ত্র, ইঁদুর মারার ফাঁদ, আলপনা, হারানো ফসল, কোদাল ও বিবিধ সামগ্রী রাখার কর্নার।
জাহাঙ্গীর আলম শাহের বাবা মরহুম আবদুর রশীদ শাহ্ ছিলেন কৃষক ও কৃষির বন্ধু। তিনিও ছিলেন একজন কৃষি ঐতিহ্যের সংগ্রাহক। এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীর আলম শাহ্ বলেন, ‘ওই যে চামরটা ঝোলানো দেখছেন, এটি তিনি ১৯৫০ সালে সংগ্রহ করেছিলেন চট্টগ্রাম থেকে। এরকম যত পুরোনো এমনকি শতবর্ষী লোককৃষি ঐতিহ্যের উপকরণ এ জাদুঘরে দেখছেন, তার প্রায় সবই আমার আব্বার সংগৃহীত।’ এসব প্রাচীন উপকরণের মধ্যে রয়েছে চামর, আউশ ধানের জমিতে সেকালে আগাছা নিড়ানোর উপকরণ নাইংলা। এখনকার মতো সেকালে জমি মাপার জন্য ছিল নল ও চেইন। চেইনের নমুনাও সে জাদুঘরে রক্ষিত আছে। আছে জমির চাষে গরুর কাঁধে দেওয়ার জন্য কাঠের জোয়াল, নৌকার পাল তোলার জন্য কপিকল, কাঠের তৈরি প্রাচীন সেচযন্ত্র দোন ইত্যাদি। কত রকমের লাঠির ব্যবহার যে সেকালে ছিল, সেগুলো দেখেও অবাক হতে হয়। সাপ ধরার জন্য হুক লাঠি, হাতি চরানোর জন্য অঙ্কুর লাঠি, গরুর গাড়ির লাঠি সাটা, গরু চড়ানোর লাঠি পানকি, ঘোড়া চরানোর লাঠি চাবুক, শূকর চরানোর লাঠি শূকরিতল ইত্যাদি। কৃষি জাদুঘরে রয়েছে ৪৫ জন গুণী ব্যক্তির ছবি ও পরিচিতি যাঁদের কৃষির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রয়েছে। শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁর এই কৃষি পাঠাগার ও জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন। কৃষিক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে পেয়েছেন কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (এআইপি) সম্মাননা ২০২০।
রয়েছে গবেষকদের থাকার জন্য একটি কক্ষ, বৈঠক বা সভা করার জন্য সুপ্রশস্ত জায়গা, পাঠের ব্যবস্থা। পাঠাগারে রয়েছে ৬ হাজারের বেশি বই ও পুস্তিকা যার মধ্যে প্রায় ৫ হাজার কৃষিবিষয়ক। পড়া ও গবেষণার এক চমৎকার জায়গা এটি। চাকরির পাশাপাশি তিনি সেগুলো সযত্নে রক্ষা করে চলেছেন, বাড়াচ্ছেন সংগ্রহ, দেখভাল করেন সুকুল মুরমু। আসার সময় সুকুল আমাদের একটা সাঁওতালি গান গেয়েও শোনালেন- ‘জেনাম বেলে একান জরু জরু...’।