× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ছন্দে আনন্দে সান্দাকফু

শূন্য সাগর

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৩ ১৭:০৮ পিএম

আপডেট : ১৩ মে ২০২৩ ১৭:১৩ পিএম

কালপোখরি হ্রদে লেখক                        ছবি :  বেঙ্গল ট্রেকার্স

কালপোখরি হ্রদে লেখক ছবি : বেঙ্গল ট্রেকার্স

ছন্দে আনন্দে সান্দাকফু

কাঞ্চনজঙ্ঘার ‘স্লিপিং বুদ্ধ’কে চোখের সামনে দেখতে হলে যেতে হবে সান্দাকফুতে। শিলিগুড়ি থেকে মানেভঞ্জন নামক পাহাড়ের কোলে একটি ছোট্ট গ্রামে পৌঁছাতে হবে আপনাকে। এখান থেকেই শুরু হয় ট্রেকিং। সান্দাকফু ঘুরে এসে বিস্তারিত লিখেছেন শূন্য সাগর

পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ সান্দাকফুর কথা প্রথম শুনি ২০১৮ সালে। তখন থেকেই প্ল্যান ছিল তিন হাজার ৬৩৬ মিটার উচ্চতায় উঠে কাঞ্চনজঙ্ঘা তথা স্লিপিংবুদ্ধকে দেখার। সেই অপেক্ষার শেষ হয় ২০২৩-এর ঈদের ছুটিতে। বাই রোড এই ট্রিপে আমার এন্ট্রি পোর্ট চেংড়াবান্ধা দিয়ে ছিল না। তাই ঢাকা-বুড়িমারী-চেংড়াবান্ধা-শিলিগুড়ি রুটে টিমের বাকিরা গেলেও আমার যাত্রা হয় বেনাপোল-কলকাতা হয়ে শিলিগুড়ি। 

আঁকাবাঁকা পথ ধরে...

শিলিগুড়ি থেকে রিজার্ভ গাড়িতে আমরা চলে যাই ধোতরের উদ্দেশে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে দারুণ প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে চা-বাগানের মাঝ দিয়ে ছুটে চলে আমাদের গাড়ি। মাঝে মানেভঞ্জন থেকে আমরা এন্ট্রি করে ফেলি। ধোতরে পৌঁছাতে রাত হয়ে যায় আমাদের, আর মেঘের আনাগোনা থাকায় বৃষ্টি হয় বেশ। 

ছবির মতো সুন্দর 

পরের দিন সকালে আমরা বের হয়ে পড়ি সিঙ্গালিলা ফরেস্ট ধরে ট্রেকিং করতে। আজকে টংলু-তুমলিং-জাউবাড়ি-গাইরিবাস- এই পথে ট্রেক করব। ছবির মতো সুন্দর জঙ্গলের পাথর বাঁধানো রাস্তা ধরে আমরা হেঁটে চলি টংলুর পথে। টংলু (৩০৩৬ মিটার) ওঠার পথেই দেখলাম দলবেঁধে মেঘ এসে পুরো উপত্যকা ঢেকে দিচ্ছে। এই জায়গায় শুধু মেঘের আনাগোনা দেখে দিন কাটিয়ে দেওয়া যাবে!  বলে রাখা ভালো, সান্দাকফু যাওয়ার ট্রেকটা একেবারে ইন্ডিয়া-নেপালের বর্ডার ধরে। তাই এই ট্রেকের বেশ কিছু রাস্তা আমরা কখনও হেঁটেছি নেপালের মধ্য দিয়ে, আবার ইন্ডিয়ার মধ্য দিয়ে। টংলু থেকে গাড়ির রাস্তায় না হেঁটে আমরা উপত্যকা ধরে নেপালের দিক থেকে তুমলিংয়ের (২৯৭০ মিটার) পথে চললাম; সেখানেই আমাদের চায়ের ব্রেক হলো। ছবির মতো সুন্দর এই রাস্তায় বিরতি নিয়ে ছবি না তুললে পাপ হবে। 

টঙলু হয়ে তুমলিং যাওয়ার রাস্তা

চা-ব্রেক শেষ করে হাঁটা শুরু করতেই ঠান্ডা বেড়ে গেল, আর প্রচুর মেঘ নেপালের দিক থেকে এসে আমাদের ভিউ আটকে দিচ্ছিল। এক পর্যায়ে এক-দেড় মিটারের বেশি দূরে দেখতেই পারছিলাম না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেঘ ভারী হতে শুরু করল আর শুরু হয়ে গেল শিলাবৃষ্টি! কিছুক্ষণের জন্যে মনে হলো এই অনন্ত পথ শেষই হবে না। একে তো সামনে বেশি দূরে দেখা যাচ্ছে না, আর তার উপরে এই বৃষ্টিতে কোথাও দাঁড়িয়ে আশ্রয় নেব তেমন কিছুই নেই। আর একই ধরনের রাস্তা আমরা হেঁটে চলেছি সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে। অনেকক্ষণ পরে আমরা রাস্তার ধারে কিছু ঘরবাড়ি দেখতে শুরু করি। এর পরও জাউবাড়ি পৌঁছাতে আমাদের আরও ২০ মিনিটের উপরে লাগল। 

নেপালের সীমান্ত ঘেঁষে

জাউবাড়ি নেপালি একটা বর্ডার গ্রাম। এখানে পৌঁছানোর পরই পুরোদমে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। অপেক্ষা করে বৃষ্টি একটু কমার পরই আমরা বের হয়ে যাই আজকে যেখানে রাতে থাকব, গাইরিবাস (২৬২১ মিটার) এর উদ্দেশে। এই শেষ দুই ঘণ্টার হাঁটায় টিমের কমবেশি সবাই বৃষ্টিতে ভিজে যাই। তবে সন্ধ্যার আগে মেঘ সরে গেলে নেপালের দিকের দারুণ কিছু ভিউও দেখতে পাই আমরা। রাতে তাপমাত্রা ৭-৮ ডিগ্রির নিচে চলে গেলেও বাইরে বইতে থাকা প্রচণ্ড বাতাসেই বেশ ভুগতে হয় আমাদের। আজকের দুপুরের পরের মেঘ ও শেষের দিকের বৃষ্টি পাওয়ায় পরের দিনের ট্রেকিং আমরা এক ঘণ্টা এগিয়ে নিয়ে আসি। কারণ আমাদের প্ল্যানের দ্বিতীয় দিন তথা সান্দাকফু ওঠার দিন শেষের দিকে বেশ একটা চড়াই আছে, তাই হাতে সময় নিয়ে বের হওয়া ভালো। রাতে জিটিএ (গোর্খাল্যান্ড টেরিটরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) ট্রেকার্স হাটে আমরা রাত যাপন করি।

রাতে বেশ ঝড়বৃষ্টি হলো। তবে সকাল ছিল দারুণ সুন্দর। আমরা সম্পূর্ণ পরিষ্কার আকাশ পেলাম। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা আগেই ট্রেক করতে বের হয়ে গেলাম। গাইরিবাস থেকে রওনা হয়ে আমাদের প্রথম বিরতি হবে কালোপখরিতে, সেখান থেকে ভিকেভঞ্জন হয়ে আমরা চলে যাব সান্দাকফু। 

এ পথ যদি না শেষ হয়...

আমাদের প্রথম দুই ঘণ্টার ট্রেকিং ছিল মনোমুগ্ধকর। আবহাওয়া ক্লিয়ার হওয়ায় আমরা দারুণ কিছু ভিউ দেখতে দেখতে পৌঁছে যাই কালোপখরিতে। কিংবদন্তি আছে যে কাল নাগের বসবাস এই কালোপখরির লেকে। এটি হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্যে পবিত্র জায়গা। 

কালোপখরিতে দুপুরের খাবার শেষ করে হাঁটা শুরু করলাম সান্দাকফুর জন্যে। পুরো ট্রিপের চ্যালেঞ্জিং পর্ব শুরু হয় এখান থেকেই। যথারীতি দুপুরের পরই মেঘের ঘনঘটা বেড়ে যায় আর আমাদের দৃষ্টিসীমা কমে আসে দেড়-দুই মিটারের মধ্যে। আর প্রচণ্ড বাতাসের সঙ্গে বৃষ্টিও আসার আশঙ্কা দেখা দেয়। গত দিনের অভিজ্ঞতায় চেষ্টা করলাম দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার। প্রায় দুই ঘণ্টা হাঁটার পর আবিস্কার করলাম যে ভিকেভঞ্জন পার করে আমরা উপরে উঠে আসার পরে নিচে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের জন্যে নিজেকে মেঘের ওপরে আবিষ্কার করে সবাই নেপালের তিঞ্চুলের জঙ্গল থেকে ইন্ডিয়ার সিঙ্গালিলা জঙ্গলের দিকে আসা মেঘের খেলা দেখতে লাগলাম। সবার জন্যে শেষ দুই কিলোমিটার রাস্তা একটু চ্যালেঞ্জিং ছিল। ঠান্ডা, বাতাসের তীব্রতা আর শেষ দুই কিলোমিটার উপরে ওঠার রাস্তার ধকল সবাই সমানভাবে নিতে পারেনি।

তাই টিম মেম্বার সবাই একে অন্যকে সাহায্য করে ব্যাগ বহন করতে। তবে সান্দাকফু শূন্য কিলোমিটার লেখা ফলকের সামনে দাঁড়িয়ে একটু বোকাই হয়ে যাই আমরা। কারণ আরও ৪০০ মিটার ওপরে উঠলেই তারপর আমাদের থাকার কটেজ মিলবে! আমরা কটেজে ঢোকার পরই শুরু হয় প্রচণ্ড বাতাস আর বৃষ্টি। গত দুই দিন সান্দাকফু থেকে কোনো ভিউ দেখা যায়নি। সেই শঙ্কা মনে নিয়েই রাতে ট্রেকার্স হাটে ঘুমাতে গেলাম, তাপমাত্রা তখন ৩ ডিগ্রির নিচে।

অবশেষে স্লিপিং বুদ্ধার সাক্ষাৎ 

ভোর ৫টায় আমরা যখন বের হয়ে ভিউ পয়েন্টে যাই, তখন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না, এত দারুণ একটা ভিউ ছিল। সমস্যা একটাই, স্লিপিং বুদ্ধাকে দেখলাম গায়ে মেঘের চাঁদর লাগিয়ে ঘুমাচ্ছে। তাই সূর্যোদয়ের অপেক্ষা করতে করতে দূরের সিঙ্গালিলার জঙ্গলের ওপরে দুধের ফেনার মতো ভেসে বেড়ানো মেঘের ঢেউ দেখতে থাকলাম। আরেক পাশে আমরা মাকালুর আর এভারেস্টের ক্লিয়ার ভিউ দেখা যাচ্ছিল। সূর্যের কিরণ পড়ার পর স্লিপিং বুদ্ধার আড়মোড়া ভাঙতে লাগল, মেঘ সরে যেতেই দেখলাম দারুণ এক দৃশ্য, যেটা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। এই অনুভূতির জন্যে ১১ হাজার ৯৩০ ফিট ওপরে একবার হলেও দাঁড়াতে হবে।

আমাদের রুট ছিল এমন

ঢাকা-বেনাপোল-কলকাতা-শিলিগুড়ি-ধতরে-টংলু-তুমলিং-গাইরিবাস-কালপোখরি-ভিকেভাঞ্জন-সান্দাকফু। তবে চেংড়াবান্ধা পোর্ট থাকলে বাই রোডে ঢাকা থেকে সরাসরি শিলিগুড়িতে চলে যেতে পারবেন।

যা লক্ষ্য রাখা জরুরি 

  • মানেভঞ্জনে এন্ট্রির জন্যে গাইড অবশ্যই লাগবে। 
  • নেপাল সাইডে কোনোভাবেই রাত কাটানো যাবে না।
  • প্রতি পয়েন্টে এসএসবির চেক পোস্টে এন্ট্রি ও এক্সিটের সময় পাসপোর্ট ও ভিসার তথ্য দেওয়া লাগবে 
  • বৃষ্টি থেকে বাঁচতে রেইনকোট/পঞ্চ আর বাতাস থেকে বাঁচতে উইন্ড ব্রেকার অবশ্যই সঙ্গে রাখবেন। 
  • থার্মাল ওয়াটার বোতল সঙ্গে রাখবেন, না হলে পানি দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যাবে।
  • সিজনের সময় আগেই থাকার জন্যে লজ বুকিং করে ট্রিপ প্ল্যান করুন।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা