চিরায়ত বাংলা
মোহাম্মদ মহসীন
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৩ ১৩:৩২ পিএম
সোনালি অতীতের সাক্ষী এ অট্টালিকা নজর কাড়ে দেশি-বিদেশি জ্ঞানপিপাসু পর্যটকের ছবি:লেখক
গ্রামীণ আঁকাবাঁকা মেঠোপথ। সেই পথের পাশে নীরবতা আর মলিন সৌন্দর্য নিয়ে হাজারো স্মৃতি ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে প্রতাপ চন্দ্র সাহা বাড়িটি। অনেকের মতে, এটি পঞ্চদশ শতকের একটি প্রাচীন নিদর্শন, যা কারও কাছে অচেনা হতে পারে। ইটের তৈরি ইমারতের গায়ে লোনা ইট কালো পাথরের টেরাকোটা ধূসর বাড়িটিকে এখনও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
সোনারগাঁর নিকটবর্তী আড়াইহাজার উপজেলার ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের তহশিল অফিস ঘেঁষা বালিয়াপাড়া গ্রামটি খাতা-কলমে থাকলেও জনশ্রুতিতে বাইল্যাপাড়া গ্রামে এই জমিদার বাড়িটি অবস্থিত। লোকমুখে জানা যায়, বাড়িটির প্রকৃত মালিক প্রতাপ চন্দ্র সাহা। অনেকটাই পানাম নগরীর ইমারতের নির্মাণশৈলীর মতো দেখতে মনোরম, মনকাড়া!
কথিত আছে জমিদার প্রতাপ চন্দ্র সাহার এল শেপের বাড়ির ১৪টি কামরার, লাল রঙের দালানের তৃতীয় তলায় তিনি থাকতেন আর দ্বিতল ভবনে পুত্র মাধব চন্দ্র সাহা ও পশ্চিমের কামরায় বল্লব চন্দ্র সাহা থাকতেন।
শাখা নদ ব্রহ্মপুত্রের তীরে কালের সাক্ষী হয়ে বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে। ছায়া নিবিড় পরিবেশে গড়ে ওঠা জমিদার বাড়ি। পার্শ্ববর্তী বাইল্যাপাড়া গ্রামের ৯০ বছরের বয়োজ্যেষ্ঠ মোহাম্মদ শহিদুল্লা মোল্লা জানান, বাড়িটি রাজকীয় রাজপরিবারের কথা মনে করিয়ে দেয়। জমিদার বাড়ির জমির পরিমাণ ৬৮ শতাংশ। তা অক্ষত রেখেই দেশভাগের আগেই সপরিবারে কলকাতায় চলে যান তিনি। চুন-সুরকির মিশ্রণে জাফরি ইটের স্থাপত্যশৈলী ব্যবহৃত সুসজ্জিত এ ভবনে বসবাস করতেন জমিদার প্রতাপ চন্দ্র সাহা তার পরিবার-পরিজন নিয়ে।

বাড়িটির তিনটি সিঁড়ি (অনুরূপ রাধিকা মোহন বড় সরদার বাড়ি, পানাম নগরের নাচ ঘরের সিঁড়িগুলোর মতো)। বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। কিন্তু নেই আগের কোনো বর্ণিল উৎসবের আয়োজন, ধন-সম্পদে ভরে ওঠা খাজাঞ্চিখানা। হারিয়ে গেছে জীবনের সব বর্ণাঢ্য নানা আয়োজন, সাজানো বাগান। রয়ে গিয়েছে শুধুই সময়ের স্মৃতিমালা।
সুলতানি আমলের হিন্দু সমাজপতি ও জমিদাররা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আঙ্গিকে ইমারতগুলো তৈরি করেছেন, বাইল্যাপাড়ার জমিদার বাড়িটিও অনুরূপ প্রাচীন ইমারতের মধ্যে একটি। তবে অট্টালিকা, মসজিদ, মন্দির, উঠান, ঠাকুর ঘর, গোসলখানা, সরাইখানা, খাজাঞ্চিখানা, কূপ, নাচঘর, দরবার কক্ষ, বিচারালয়, প্রমোদালয় থাকলেও নেই শুধু সেকালের মানুষজন। এখন শুধুই অনাদর আর অবহেলার চিহ্ন গায়ে মেখেই দাঁড়িয়ে আছে অট্টালিকাটি।
সোনালি অতীতের সাক্ষী এসব অট্টালিকা এখনও নজর কাড়ে দেশি-বিদেশি জ্ঞানপিপাসু পর্যটকের। পাশেই একটি কূপ আর প্রাচীরঘেরা একসময় ছিল, এখন নেই, অনেক কিছু খোয়া গেছে তার সন্ধান মেলেনি। বহু অনুসন্ধান করে মেলেনি সন-তারিখও। চার পাশে চোখ-জুড়ানো প্রাকৃতিক মনোলোভা দৃশ্য দূরে নয়, কাছেও টানে যে কাউকে। তবে ৬৮ শতাংশের এক খণ্ড ভূমি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে থাকলেও অনাদরের অভাবে স্মৃতিচিহ্নটুকু বিলুপ্তির পথে...।
স্থানীয় বাসিন্দা মতিউর রহমান জানালেন, প্রতাপ চন্দ্রের আত্মীয় বাড়ির উত্তরে বজেন্দ্র মোহন পোদ্দারের বাড়িতে ছেলেসন্তানরা বসবাস করছে আর দক্ষিণে কিশোর মোহন পোদ্দারও দেশভাগের আগে পরিবার নিয়ে ভারতে চলে যান। এরপর থেকে প্রতাপচন্দ্রের বাড়িটি সরকারি খাতায় চলে যায়।
এই তথ্যগুলো পূর্বে যারা বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি কিংবা ইতিহাসের লেখক তারা কেউ লিপিবদ্ধ করেনি। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জের আশপাশের নিভৃতের আঙিনার কথাগুলো লিপিবদ্ধ করে গেছেন ব্রিটিশ পর্যটক জেমস টেলরই।
প্রতাপ চন্দ্রের বাড়িটিকে সংরক্ষণের মাধ্যমে পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তোলা যেন এখন সময়ের দাবী। যার মাধ্যমে এই অঞ্চলের ইতিহাস যেমন রক্ষা পেত তেমনি ভ্রমণপিয়াসুদের মনও ভরত।
যেভাবে যাবেন: ঢাকা গুলিস্তান হতে দেড় ঘণ্টা সময় লাগবে গাউছিয়া (ভুলতা)। সেখান থেকে সিএনজি অথবা অটোরিকশায় ১৫ টাকায় প্রতাপ চন্দ্র সাহার জমিদার বাড়িতে সহজেই পৌঁছানো যায়।