ইমতিয়ার শামীম
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৩ ১২:০১ পিএম
আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৩ ১২:১৪ পিএম
সুযোগ পেলেই বাসার নিচে রাস্তার ওই পারে চলে যায় স্নেহা। আর একা-একাই যেতে পারে কিন্তু। বয়স তো আর কম হলো না। এই তো সামনের আষাঢ় মাসে ওর বয়স সাড়ে পাঁচ বছর হবে। তাই একা-একাই সেখানে যেতে পারে সে।
কিন্তু মাকে আবার বাসায় একা রেখে গেলে ভীষণ সমস্যা হয়। দেয়ালে টিকটিকি দেখলেই মা ভয়ে কাঁপতে থাকে। আরশোলা দেখলেই চিৎকার করতে থাকে।
স্নেহা তাই বাইরে বেরুলে মাকে সঙ্গে নিয়ে যায়।
কখনও অবশ্য বাবাকেও সাথে নিয়ে যায়। অফিস থেকে ফেরার পর বাবা ভীষণ ক্লান্ত থাকে তো। তাই বাবাকে একটু বাইরে থেকে ঘুরিয়ে আনে স্নেহা। তাতে বাবার মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে যায়।
তা ছাড়া আরেকটি ঘটনা আছে। সেটা হলো, বাসার নিচে রাস্তার ওপাশে গেলে মজার মজার শিঙারা খাওয়া যায়।
এই যে বাসার এই চারতলা থেকেই রাস্তার ওই ধারে বড় একটা কাঠগোলাপ গাছ দেখা যাচ্ছে না? ওই গাছটার নিচেই সেই শিঙারার দোকান। ছোট্ট দোকান, আর শিঙারাগুলোও ছোট ছোট। তবে ভারী সুস্বাদু।
অনেক- অনেক লোকজন তাই সেই দোকানে আসে। কেবলমাত্র শিঙারা খেতে।
ফারাজি চাচা শিঙারা বানিয়ে কূল পায় না।
আরও একটা কারণে সেখানে যেতে ভারী ভালো
লাগে স্নেহার।
দোকানটার কাছে সব সময়ই বেশ কয়েকটা কুকুর থাকে। সেগুলো শুয়ে বসে খালি ঝিমায়। কখনও আবার চার পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকে দুই চোখ বুজে। তা দেখে স্নেহার কী যে ভালো লাগে! বাবাকে বলে, ‘বাবা- দেখ, দেখ, কী আরামে ঘুমাচ্ছে। আমারও ওরকম করে মাটির ওপর শুয়ে ঘুমাতে ইচ্ছা করছে।’
‘তাই? মাটির ওপর শুয়ে পড়ে ঘুমাতে ইচ্ছা করছে? শুয়ে পড় মা। তোমার মতো বয়সে আমরা মানে আমি, তোমার ফুপু, তোমার কাকু, আমরা সবাই এভাবে আমাদের বাড়ির সামনে গাছের নিচে ঘাসের ওপর কত ঘুমাতাম!’
কিন্তু মা আবার ব্যাপারটা মোটেও পছন্দ করে না।
কখনও কখনও কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করতে করতে ভীষণ ছোটাছুটি করে। বারবার মাটির গন্ধ শুঁকতে থাকে। আকাশের দিক মুখটা তুলে নাক উঁচিয়ে কেমন যেন করে।
এর মধ্যে একটা কুকুর বিস্কুট জিনিসটা একদমই পছন্দ করে না। তিনটা কুকুর আবার একদমই খেতে চায় না শিঙারা। যে কুকুরটা শিঙারা খায়, সেটাকেই স্নেহার বেশি ভালো লাগে।
শিঙারার টুকরো ভেঙে দিতে দিতে সে কুকুরটাকে বলে, ‘নাম কি তোমার?’
শুনে কুকুরটা শিঙারার ভাঙা টুকরোটা মুখ থেকে নামিয়ে কুঁই-কুঁই করে ওঠে।
তা দেখে বাবা বলেন, ‘ও বলছে- ওর নাম কুঁই কুঁই।’
গাছের গুঁড়ির ওপর উঠে কুকুরটাকে খুব ভালো করে দেখে নেয় স্নেহা। কুকুরটার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘কী যে বলো না! তুমি কি কুকুরদের ভাষা বুঝতে পারো? ওটা বুঝি আমি। ও এখন বলছে, এত গরম শিঙারা দিয়েছো কেন? আমার জিভটা পুড়ে গেল তো!’
‘তাই? তাই বলেছে?’- বোকা বাবাটা খালি খালি হা হা করে হাসতে থাকে দোকানের ঝাপির কাছে দাঁড়িয়ে।
‘হ্যাঁ, তাই বলেছে। তুমি বুঝতে পারছ না তো, তাই খালি খালি হাসছ।’
বলে কুকুরটার কাছে এগিয়ে গিয়ে আরও একটু শিঙারা ভেঙে ফুঁ দিয়ে রাস্তার একপাশে টুকরোটাকে নামিয়ে রাখে স্নেহা। কুকুরটা ছোট একটা লাফ দিয়ে সেটার কাছে গিয়ে জিভ দিয়ে টেনে নেয় সেটাকে।
আর স্নেহা কুকুরটার দিকে তাকিয়ে আঁকাবাঁকা হাসি দিয়ে বলে, ‘ শোন, তুমি শিঙারা খেতে খুব ভালোবাস না? এখন থেকে তোমার নাম শিঙ্গুস। বুঝতে পেরেছ?’
কুকুরটা তার দিকে মুখ বাড়িয়ে ফের কুঁই কুঁই করে ওঠে।
‘ বেশ, আরেকটা দিচ্ছি। কিন্তু তোমার নাম কিন্তু শিঙ্গুস। মনে থাকে যেন।’
কুকুরটা এবার ঠোঁট চাটতে চাটতে লেজটা নাড়ায়। তার পর ভুক ভুক করে ওঠে। আর তা দেখে স্নেহা বাবাকে বলে, ‘ও কী বলছে জানো? ও বলছে, নামটা ওর খুব পছন্দ হয়েছে।’
বলে মুখ ঘুরিয়ে কুকুরটার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আমাদের বাসায় যাবে?’
শুনে শিঙ্গুস ঘাড়টা সোজা করে তার দিকে পিট পিট করে তাকায়। কী যে বলে সেটা কেবল স্নেহাই বুঝতে পারে, ‘ কেন, তোমাদের বাসায় যাব কেন?’
‘বাহ্, থাকবে- আমাদের বাসায় থাকবে, খাবে-দাবে, ঘুমাবে-
শিঙ্গুস তখন চার পায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে আরও জোরে কু-কু করে ওঠে, ‘ওইটা কোনো জীবন হলো? তোমাদের, মানুষদের না যতসব উল্টোপাল্টা কাজ! শোন, ঘেউ ঘেউ করে দৌড়াদৌড়ি করতে পারো না- তোমাদের ওইটা কোনো জীবন হলো। আমি হলাম কুকুর- দৌড়াদৌড়ি করি, ঘেউ ঘেউ করি, হাস-মুরগিকে তাড়া করে সেগুলোকে খোঁপের মধ্যে তুলি, বনবেড়াল এলে সেটার পিছে ধাওয়া করি... কত কাজ পারি! এসব কাজ করতে পারো তুমি?’
স্নেহা অবাক হয়ে যায়, ‘ও রে বাবা, তুমি বনবেড়াল তাড়াতে পার?’
‘নাহ্, আমি অবশ্য পারি না। শহরে থাকি তো! এখানে কি আর বনবেড়াল আছে? হাস-মুরগি আছে? মায়ের কাছে গল্প শুনেছি আর কি। শোন, ওই বনবেড়ালই নাকি ছিল আমাদের প্রধান খাবার। কিন্তু তোমরা বাড়িঘরের কাছ থেকে জঙ্গল-টঙ্গল কেটে ফেলেছ তো! তাই বনবেড়াল আর আমরা খেতে পাই না। এখন এই যে শিঙারা, বিস্কুট এইসব খেতে দাও আমাদের- এগুলো তো আমাদের জাঙ্ক ফুড। বুঝতে পারলে? এইসব খাই জন্যেই তো আগের মতো আর দৌড়াতে পারি না!’
স্নেহা কুকুরটার সামনে বসে হাত নেড়ে নেড়ে বোঝানোর চেষ্টা করে, ‘ শোন, আমাদের বাসার ছাদ অনেক বড়। সেখানে তুমি অনেক জোরে জোরে দৌড়াতে পারবে।’
‘কী যে বলো না! তার চেয়ে এই ফারাজি চাচার দোকানে রাতের বেলা কোনো চোর-টোর এলেও সেটাকে ধাওয়া করে অনেক বেশি দৌড়ানো করা যায়। আর তুমি কি জানো, রাতের বেলা রাস্তায় রাস্তায় পুলিশের গাড়ি ঘোরে? সেগুলোর পেছনে পেছনেও অনেক দৌড়ানো যায়। এই জন্যেই তো আমি কারও বাসায় থাকি না।’
একটু থেমে কুকুরটা স্নেহাকে আবার বলে, ‘তা ছাড়া ফারাজি চাচা দুই-চার মাস পর পর গ্রামে যায়। নিশ্চয়ই একবার না একবার আমাকেও নিয়ে যাবে! তখন যে কী মজা হবে! গ্রামে কিন্তু এখনও দুই-চারটা বনবেড়াল আছে! সেগুলোকে ধরব আর কামড়ে কামড়ে খাব।’
শিঙ্গুসের কপালে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে স্নেহা বলে, ‘ঠিক আছে বাপু, তোমার যেখানে পছন্দ সেখানেই যেও। নাকি বলো বাবা?’
বাবা তো তখন চা খাচ্ছেন আর ফারাজি চাচার সঙ্গে কথা বলছেন। তাই স্নেহার প্রশ্নের আগা-মাথা বুঝতে পারেন না। তবু বলেন, ‘হ্যাঁ রে মা।’
আর শিঙ্গুসটাও কী দিয়ে কী যে বোঝে কে জানে! স্নেহার হাতের সঙ্গে কপালটা ঘসতে ঘসতে সে শুধু তার লেজটাকে নাচাতে থাকে। নাচাতেই থাকে।