বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র
হৈমন্তী শুক্লা
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৩ ১১:৪১ এএম
বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র’র উদ্যোক্তা গিরিধর দে
২০১১ সালের কথা। সদ্য স্কুলগণ্ডি পার করা এক কিশোর বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির ছবি সংরক্ষণের জন্য বেছে নিলেন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। নিজের জমানো ছবি, পেপার কাটিং, পুরোনো বই এসব ঘেঁটে ১০ হাজার ছবি দিয়ে শুরু করলেন ‘বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবিসমগ্র’ নামের একটি অনলাইন সংগঠন। একদশকে এই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা দেড় মিলিয়ন।
সংগঠনটির কর্ণধার গিরিধর দে। প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপে জানালেন জনপ্রিয় এ সংগঠনটি গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নানা কথা।
প্রথমেই জানতে চাই, এই বয়সে এত কাজ করে ফেলেছেন। যখন শুরু করেছিলেন, তখন কি মনে হয়েছিল, এতটা সাড়া পাবেন? মৃদু হেসে গিরিধর দে বললেন, ‘শুরুর দিকে আসলে এতটা সারা পাব কল্পনাও করিনি। তবে আশাবাদী ছিলাম। ভালো কাজ করছি, অবশ্যই ভালো সাড়া পাব।’
ছোটবেলা থেকেই ইতিহাস আর প্রযুক্তিপ্রেমী ছিলেন গিরিধর। আর এই আগ্রহের সলতে জ্বালিয়েছিলেন তার বাবা সুধীর কুমার। বাবা ছিলেন ইতিহাস ও প্রযুক্তিপ্রেমী একজন মানুষ। বাড়িতে নিয়মিত পত্রিকা রাখতেন। বনেদি পরিবার হওয়ায় পারিবারিকভাবেই একটি ভালোমানের সংগ্রহশালা ছিল। সেই সঙ্গে পুরাতন দলিল-দস্তাবেজ বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন প্রযুক্তির উদ্ভাবনের খবর সব ছিল এখানে। বাবার সঙ্গে এসব সংগ্রহের কাজ করতেন গিরিধর। পারিবারিক ওই পাঠাগার ও সংস্কৃতিচর্চার আবহ থেকেই মূলত ‘বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবিসমগ্র’ সংগঠনটির ভাবনার বীজ বোনা। একযুগ আগে নিজের জমানো ছবি, পেপার কাটিং, পুরোনো বই সব মিলে ১০ হাজার ছবি দিয়ে শুরু করলেন ‘বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবিসমগ্র’ নামের একটি অনলাইন সংগঠন।

এসএসসি পাস করেই সংগঠনটি শুরু করেছিলেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি যতটা সময় পেয়েছেন কাজ করেছেন ‘বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবিসমগ্র’-এর জন্য। সম্প্রতি ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন তিনি। পাশাপাশি একজন সমাজকর্মী হিসেবেও কাজ করেন তিনি।
গিরিধর জানান, অল্প বয়সে শখ বা নেশার বসেই এত বড় কাজ হাতে নিয়েছিলেন। যে বয়সে বন্ধুরা আড্ডা দিয়েছে, খেলেছে তখন তিনি বিভিন্ন বই-পত্রপত্রিকা ঘেঁটেছেন। গুণিজনদের কাছে ছুটে গেছেন তথ্যের জন্য। এটাই ছিল তার আনন্দের। তিনি বলেন, ‘আসলে দীর্ঘদিন একটা কাজ নিয়ে পড়ে থাকলে, কাজটাকে যদি নিজের মনে করা যায়, তাহলে প্রেম-ভালোবাসা ওই কাজটার ওপরেই হয়ে যায়। এই কাজটাই আমার প্রেম-ভালোবাসা এবং ভালো লাগার একটা জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি এই কাজেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’
গিরিধর জানান, বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবিসমগ্র সংগঠনটি কেবল অনলাইন সংগঠন বা সংগ্রহশালা নয়। অফলাইনেও তারা কাজ করছেন। বেশ কিছু উদ্যোগ চলমান রয়েছে। ছবি সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইনেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য কালেক্ট করা হয়। বিভিন্ন জায়গার, ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত ছবি, ভিডিও, দলিলÑ সেগুলো চর্চা, প্রচার, গবেষণা ও তথ্য বিকৃতি রোধের মাধ্যমে দুভাবে সংরক্ষণের জন্য কাজ করা হচ্ছে।
এসব কাজের জন্য একটা ফান্ডিংয়ের বিষয় আছে। সেটাও এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণটাই ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও অর্থায়নে করে যাচ্ছেন তিনি। বলেন, ‘জানি না কত দিন আসলে পারব, তবে চেষ্টা করব। আমরা এ পর্যন্ত দেশব্যাপী প্রায় ৮০ হাজার ইতিহাসভিত্তিক দলিল-দস্তাবেজ সংকলন, ছবি, ভিডিও, পত্রিকা, নথি সংগ্রহ করছি, যেটা আমরা আশা করছি ২০২৩ সালের ভেতর লাখ ছাড়িয়ে যাবে।’
তবে এই কাজ করে যেমন ইতিবাচক সারা পেয়েছেন, তেমনি নেতিবাচক কিছু বিষয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে। দুটোকেই দক্ষতার মোকাবিলা করতে হয়। তিক্ত কথায় ভালো কাজ যেন পিছিয়ে না পড়ে সে জন্য দৃঢ় মনোবল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।
প্রায় দুই মিলিয়ন সদস্যের সংগঠন এখন এটি। এত বড় কার্যক্রম একা সামলানো সম্ভব নয়। তিনি জানান, দেশব্যাপী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। সদস্যদেরও এর সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করা হয়, যারা ওই বিষয় সম্পর্কে অবগত রয়েছে, এটির ওপরে তাদের চর্চা রয়েছে। নিজস্ব লেখক, গবেষক রয়েছেন প্রায় তিনশ জন। তথ্য সংগ্রহের জন্য অনেক সদস্য রয়েছে। এ ছাড়া অনলাইনে নিয়মিত অনেকে ছবি-ভিডিও-তথ্য পাঠান। এটা নির্ভরযোগ্য করে গড়ে তুলতে নির্ধারিত গবেষকের কাছে পাঠানো হয়। তাদের যাচাই-বাছাইয়ের পর এটি তথ্যবহ হয়ে ওঠে।
প্রাণের এই সংগঠনটি ঘিরে রয়েছে গিরিধরের অনেক পরিকল্পনা। একটা ডিজিটাল মিউজিয়াম করতে চান। যেখানে বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি সম্পৃক্ত থাকবে। সব ছবি, ভিডিও, দলিল, নথি...সব কিছু একটা জায়গায় সংগ্রহ থাকবে বিস্তারিত তথ্যসহ। যেখান থেকে দেশের এবং দেশের বাইরের মানুষ খুব সহজে একটা জায়গা থেকে, প্রয়োজনে যেকোনো তথ্য, ছবি নিতে পারেন এবং সেটাকে ব্যবহার করতে পারেন।
এর মধ্যেই বাংলার আবহমান ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টিচর্চা, প্রসার এবং বিভিন্ন দলিলাদি সংগ্রহ ও গবেষণার মাধ্যমে সেগুলো ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ, পাশাপাশি সমাজের নানা বিষয় নিয়ে কাজ করার স্বীকৃতি হিসেবে বেশকিছু পুরস্কার পেয়েছেন গিরিধর ও তার সংগঠন। এর মধ্যে রয়েছে জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড ২০২১, হিরো অ্যাওয়ার্ড-২০২২, অগ্রযাত্রা কর্মদীপ্ত পদক-২০২২-সহ আরও অনেক পুরস্কার।