কালো মানুষের আলো
আমিরুল আবেদিন
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৩ ১১:৫৪ এএম
আলথিয়া গিবসন
পঞ্চাশের দশকের কথা। আমেরিকান সমাজে কৃষ্ণাঙ্গরা তখন সবে মাত্র মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। সামাজিক বিভিন্ন পেশার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও অংশ নিচ্ছে। সে সময় টেনিসের মতো অভিজাত খেলায় একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী অংশ নিয়ে ইতিহাস তথা জয় করে নেন সবকিছু...
‘ছোটবেলায় সবাই বলত আমি নাকি সবকিছুতে একটু বেশিই ছিলাম। যেকোনো বিষয়ে আগে থেকেই মতামত দিতাম। একটু বেশি রোগা, এমনকি অন্যদের থেকে একটু বেশিই কালো। সম্ভবত এই কথাগুলো শুনেই আমি ওইসব নারীদের দেখে মুগ্ধ হই, যাদের জীবনের লক্ষ্য সমাজের কাছে একটু বেশি মনে হয়েছে। জ্যানেট রেনো, মিশেল কুয়ান ও ডমিনিক ডেউইস আমার অনুপ্রেরণা ছিলেন। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, অন্যদের থেকে আমি অনেক আলাদা’- কথাগুলো আলথিয়া গিবসনের। যে সময়ে তার জন্ম, ওই সময় বেজবল, ফুটবল এবং বাস্কেটবলে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু টেনিসের মতো অভিজাত খেলায় কোনো কোনো কৃষাঙ্গ আমেরিকানের অংশগ্রহণ তখনও অসম্ভব। সামাজিক মর্যাদা হিসেবে এই খেলাটি অভিজাত শ্রেণিতেই পড়ে। টেনিস আর গলফে তাই বর্ণবাদী আচরণের প্রভাব অনেক বেশি ছিল।
ছোটবেলা থেকেই আলথিয়া গিবসন প্রচুর মন্তব্য শুনেছেন। কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের আগন্তুক- এই সিলমোহর তাকে দমিয়ে দিতে পারেনি। রাস্তাঘাটেই দৌড়াদৌড়ি করে অধিকাংশ সময় কাটাতেন। গিবসনের বয়স যখন ৩ তখন তার পরিবার সাউথ ক্যারোলিনা থেকে হার্লেমে চলে আসে। হার্লেমে যে এলাকায় তারা থাকতে শুরু করেন, তার মূল সড়কটি বিকালে গাড়ি-ঘোড়া চলাচল যেন করতে না পারে সেজন্য বন্ধ করে দেওয়া হতো। তারা সড়কের নাম দিয়েছিল ‘প্লে স্ট্রিট’। সেখানেই গিবসন প্রথম পিং পং খেলার সঙ্গে সংযুক্ত হন। খেলাটি তার এতই ভালো লেগে যায় যে স্থানীয় প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিতে শুরু করেন। পিং পং খেলার সময়ই সংগীতজ্ঞ ও পুলিশ অ্যাথলেটিক লিগের সুপারভাইজর বাডি ওয়াকার মেয়েটির প্রতিভা বুঝতে পারেন। তিনিই গিবসনকে কসমোপলিটান টেনিস ক্লাবে নিয়ে আসেন।

এই ক্লাবে কৃষ্ণাঙ্গ টেনিস খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তখনও তারা কোনো স্বীকৃত প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারত না। যাই হোক, ১৯৪০ সালের মধ্যভাগে গিবসন দুবার চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নেয়। আস্তে আস্তে প্রতিভার বিকাশ ঘটছিল। কিন্তু আরও বড় পরিসরে খেলতে হলে তার প্রয়োজন আমন্ত্রণ। এটিএ সার্কিটে টানা ১০টি জয় সে আমন্ত্রণের পথ উন্মুক্ত করে দিতে শুরু করে। তার পরও বর্ণবাদী কারণে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ১৯৫০ সালে ইস্টার্ন গ্রাস কোর্ট চ্যাম্পিয়নশিপে তাকে আমন্ত্রণ না জানিয়ে উপায় ছিল না। কারণ ততদিনে টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়।
এভাবেই আলথিয়া গিবসন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় হিসেবে টেনিসের স্বীকৃত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। বর্ণবাদী খেলার প্রভাবের ক্ষমতায় তিনি চিড় ধরান। ওই সময়ের হিসেবে এটি খুব বড় ঘটনা। কিন্তু শুধু অংশগ্রহণটাই তার একমাত্র অর্জন নয়। অ্যাথলেট হিসেবেও তিনি যেন প্রতিপক্ষের কাছে ত্রাস হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সালে তিনি ১১টি গ্র্যান্ডস্ল্যাম শিরোপা জয় করেন। শীর্ষ প্রতিযোগিতায় এককভাবে পাঁচটি শিরোপা, দ্বৈত খেলায় ৫টি এবং মিশ্র দ্বৈতে ১টি শিরোপা জয় করেন। রেকর্ডের তালিকা দিনে দিনে বাড়িয়েই চলেন তিনি। টেনিস কোর্টে তার একচ্ছত্র আধিপত্য দেখে স্পোর্টস ইলাস্ট্রেশন এবং টাইমও তাকে আলাদাভাবে লেখার তাগিদ অনুভব করে। ইতিহাসের সবচেয়ে সম্মানিত কৃষ্ণাঙ্গ নারী হয়ে ওঠেন তখনই।
শৈশবে ছন্নছাড়া, প্রাণবন্ত এই মেয়েটি একটু বেশি ছিল বলেই ইতিহাস গড়তে পেরেছিলেন। পরে কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তিনি এক অনুপ্রেরণা হয়েই টিকে ছিলেন এমনটি নয়। এখনও পিছিয়ে পড়া কৃষ্ণাঙ্গদের ‘একটু বেশি’ কিছু করার তাগাদা দিয়ে যাচ্ছেন।