এলিজা বিনতে এলাহী
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৩ ১৫:২৯ পিএম
সংগ্রাহক ড. আশরাফুজ্জামান মণ্ডল
ইতিহাস পড়াতে ইতিহাস জানতে যেমন আনন্দ; তেমনি আনন্দ ইতিহাসের দূর্লভ বিভিন্ন বিষয় সংগ্রহ করার মাঝে। সেই কাজটিই নিভৃতে করে যাচ্ছেন লালমনিরহাট জেলার সংগ্রাহক ড. আশরাফুজ্জামান। প্রাচীন যুগ থেকে ব্রিটিশ আমল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এমনকি স্বাধীনতারও বিভিন্ন স্মারক আছে তার সংগ্রহশালায়। তার সংগ্রহশালা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন...
‘বাংলাদেশের ঐতিহ্য ভ্রমণ’-এর অংশ হিসেবে দ্বিতীয় বারের মতো ঘুরে এলাম লালমনিরহাট জেলা। দীর্ঘ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, চিরচেনা স্থানেও আপনি যদি বারবার ভ্রমণ করেন, তাহলে প্রতিবারই আপনি খুঁজে পাবেন ভিন্ন বিষয়, ভিন্ন স্বাদ ও ভিন্ন মুগ্ধতা। ভ্রমণের রহস্য এখানেই!
লালমনিরহাট জেলা সদরের চার্চগুলো পরিভ্রমণ করছি। সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করছিলাম, জেলা শহরের কোথায় রয়েছে পুরোনো খ্রিস্টান সমাধিভূমি। যে সমাধিভূমি খুঁজে পেলাম তাতে সব থেকে পুরোনো সমাধির স্থাপনকাল পেলাম ১৯২৩। কিন্তু সেই সমাধিভূমিতে ব্রিটিশ কোনো রেল কর্মকর্তার সমাধি খুঁজে পেলাম না। স্থানীয় লোকজন, চার্চের কর্মকর্তা ও সাংবাদিক ভাইদের বললাম, লালনিরহাটের ইতিহাস চর্চা করছে কিংবা স্থানীয় ইতিহাস লেখকের সঙ্গে আমি দেখা করতে চাই। এই কাজটি আমি প্রতি জেলাতেই করে থাকি। প্রত্নস্থাপনা, প্রত্নস্থল কিংবা ঐতিহাসিক বিষয়ের পাশাপাশি ইতিহাসের সংগ্রাহক কিংবা ইতিহাস লেখকরা আমার কাছে একেকজন একটি জীবন্ত ইতিহাস।
লালমনিরহাট জেলার সবাই এক বাক্যে একটি নাম উচ্চারণ করলেন ‘সবুজ ভাই’। তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে সে রকম বেগ পেতে হয়নি, উপরন্ত তার সঙ্গে দেখা করতে সহায়তা করলেন স্থানীয় সাংবাদিক আজিজ ভাই।
সবুজ ভাইয়ের পুরো নাম ড. আশরাফুজ্জামান মণ্ডল। পেশায় শিক্ষক হলেও নেশায় তিনি ইতিহাসের সংগ্রাহক। এটুকু বলা সবুজ ভাই সম্পর্কে খুব সহজ। এরপর থেকে সবুজ ভাই সম্পর্কে তথ্য দেওয়া কিংবা তার কাজকে ব্যাখ্যা করা বেশ কষ্টসাধ্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় সবুজ ভাইয়ের শুধু একটি সংগ্রহ তুলে ধরার পর পেয়েছি অগণিত মানুষের খুদেবার্তা।

ড. আশরাফুজ্জামান সম্পর্কে আরও জানতে চাই। তার জাদুঘরের ছবি দেখতে চাই। শুভাকাঙ্ক্ষী ও নিজের তাড়না থেকেই এই লেখাটি লিখছি। যদিও একটি ফিচারে একজন ইতিহাসের সংগ্রাহক, গবেষক ও লেখকের দীর্ঘ পরিশ্রম ফুটিয়ে তোলা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। কারণ তার প্রতিটি সংগ্রহের পেছনে রয়েছে একটি করে বিরাট ইতিহাস।
তিন-চার ঘণ্টাব্যাপী সবুজ ভাইয়ের সংগ্রহশালা দেখে আমার মনে হলো- ঘুরে এলাম, জেনে এলাম গোটা ভারতবর্ষ, পূর্ববাংলা ও বাংলাদেশ। যদিও আমি মনে করি, আশরাফুজ্জামানের সংগ্রহের খুব সীমিত পরিমাণই দেখা হয়েছে। এই সংগ্রহগুলো ধারণ করার জন্য আসলে বারবার সেই জাদুঘরে যেতে হবে।
এই উপমহাদেশে একক সংগ্রহের সেরা কীর্তি ভারতের হায়দরাবাদের সালর জং মিউজিয়াম। ঠিক তার কাছাকাছি না হলেও একই মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায় বলধার জমিদার শ্রী নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর সংগ্রহশালায়। আজকের বিখ্যাত বলধা গার্ডেনের কর্ণধার। যদিও বলধা জাদুঘর বিলুপ্ত। বলধা সংগ্রহশালার একটি অংশ রয়েছে ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে। আশরাফুজ্জামানের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা আসলে আমাকে সে রকমই অভিভূত করেছে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলায় বসে একজন সমাজসেবী ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন একটি প্রতিষ্ঠান ‘লালমনিরহাট জেলা জাদুঘর’।

আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘লালমনিরহাট জেলা ও আশপাশের জেলাগুলোর প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির স্মৃতি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের সামনে উপস্থাপনের লক্ষ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠেছে অনন্য এই সংগ্রহশালা ‘লালমনিরহাট জেলা জাদুঘর’।
তিনি সংগ্রহ করেছেন রংপুর বিভাগের সংশ্লিষ্ট কয়েকশ প্রাচীন ও আধুনিক মুদ্রা (কড়ি, রুপা, তাম্র, মিশ্রধাতু এবং কাগজের নোট), প্রাচীন দলিল দস্তাবেজ (ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমল), স্থানীয় জমিদারদের পট্টকপত্র/পাট্টা, খাজনা আদায়ের রসিদ ও সিলমোহরের ছাপ। এ ছাড়াও সংগৃহীত হয়েছে নবাব বাহাদুর মুর্শিদাবাদ এবং কাকিনা রাজ স্টেটের পুণ্যাহ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র। এ জাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে দুষ্প্রাপ্য প্রাচীন পুঁথি ও দুর্লভ গ্রন্থ। বিশেষ করে বাংলাদেশ আমলের প্রথম ঐতিহাসিক ডকুমেন্টগুলোর অধিকাংশ মূলকপি।

আরও আছে ব্রিটিশ সময়ের প্রশাসনিক রিপোর্টের কপি, রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেলের সামনের অংশ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কামানের গোলার পেছনের অংশ, ১৯৭১ সালে প্রকাশিত বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা, লিফলেট, শরণার্থী শিবিরের রেজিস্ট্রেশন কার্ড, গুলির বাক্স, গুলির খোসা প্রভৃতি। সংগ্রহশালায় আরও রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র।
জানতে আগ্রহ হয়েছিল ইতিহাসের সংগ্রাহক হয়ে ওঠবার পেছনের গল্পটি। লালমনিরহাট জেলা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা, তরুণ গবেষক ও লেখক ড. আশরাফুজ্জামানের জন্ম ১৯৭৭ সালের ২ জানুয়ারি। তিনি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিতে কাশিপুর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষা সফরে যান। সেখানে গিয়ে বিমানঘাঁটির ইতিহাস জানতে চাইলে কেউ তাকে সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। সেখান থেকে তার ইতিহাসের সংগ্রাহক হয়ে ওঠবার সূচনা।

২০০৩ সালের ১৮ মে বিশ্ব জাদুঘর দিবসে লালমনিরহাট জেলা শহরের পূর্ব থানাপাড়ায় তার পারিবারিক বাসভবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে লালমনিরহাট জেলা জাদুঘর। সবুজ ভাইয়ের কর্মযজ্ঞের সফলতার স্বীকৃতিও জমা হয়েছে নিজস্ব ঝুলিতে। অল্প কিছু উল্লেখ করছি। রোদ্দুর সম্মাননা-১৪১১ বঙ্গাব্দ, প্রথম আলো গ্রামীণফোন সম্মাননা-২০০৬, লালমনিরহাট রত্ন-২০০৭, স্মৃতি ৭১ স্বর্ণপদক-২০১৫। এ যাবৎ তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৪৬টি।
লালমনিরহাট জেলা জাদুঘরের বিকাশ সাধনের লক্ষ্যে এর স্থায়ী ভবনের জন্য জমি বরাদ্দ, ভবন নির্মাণসহ গবেষণা, প্রকাশনা ও অন্যান্য কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হলে তা ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় সুদূরপ্রসারী অবদান রাখবে। ড. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘স্বতন্ত্র ভবনে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে লালমনিরহাট জেলা জাদুঘরকে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।’
‘দ্য মিউজিয়ামস অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে উপমহাদেশের ১০৫টি জাদুঘরের উল্লেখ আছে। সেখানে আমাদের বরেন্দ্র জাদুঘরের উল্লেখ থাকলেও ঢাকার জাতীয় জাদুঘর কিংবা বলধা জাদুঘরের উল্লেখ নেই। নিশ্চয়ই একদিন উপমহাদেশের জাদুঘরের তালিকায় স্থান পাবে লালমনিরহাট জেলা জাদুঘর।
ঢাকায় ফিরে এসেছি তৃতীয়বার লালমনিরহাট ভ্রমণের আকুলতা নিয়ে। সেই আকুলতা ভীষণভাবে তীব্র করেছে লালমনিরহাট জাদুঘর ও ইতিহাসের সংগ্রাহক সবুজ ভাইকে কেন্দ্র করেই।