হুমায়ুন মাসুদ
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৩ ১২:২৭ পিএম
তখনও ইফতারের ৩০ মিনিট বাকি। চট্টগ্রাম নগরীর এমএ আজিজ স্টেডিয়াম গেটসংলগ্ন ফুটপাতে সাজিয়ে রাখা ইফতারি সামনে নিয়ে বসে আছেন বেশ কয়েকজন। মধ্যবয়সি কয়েকজনের মাঝখানে ইফতারি নিয়ে বসে আছে ছিপছিপে গড়নের এক শিশু। ওর নাম শাহেদ। সে একটি ভালো কাজের বিনিময়ে ইফতার করতে এসেছে এখানে। শাহেদ জানায়, রাস্তায় পড়ে থাকা ময়লা সে ডাস্টবিনে ফেলেছে। এ কাজের বিনিময়ে ইফতার করার সুযোগ পেয়েছে ‘ভালো কাজের হোটেলে’।
এই হোটেলের উদ্যোগে প্রতিদিন ইফতারের আয়োজনে অংশ নেন তার মতো প্রায় ১০০ জন। এদের কেউ বৃদ্ধ লোককে রাস্তা পার করিয়ে দিয়ে, কেউ রাস্তায় পড়ে থাকা ময়লা ডাস্টবিনে ফেলে। আবার কেউ নামাজ, রোজা রেখে মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করার বিনিময়ে এখানে ইফতার করতে এসেছেন। চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ফয়েজ ইফতার করতে এসেছেন এখানে। তিনি বলেন, ‘কালুরঘাট এলাকার মৌলভীবাজারে একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করতাম। মালিক দোকানটি বন্ধ করে দেওয়ায় এখন বেকার। কাজের সন্ধানে বিকালে জুবলি রোডে গিয়েছি। সেখান থেকে হেঁটে বাসায় যাওয়ার সময় দেখি এখানে ইফতার করানো হচ্ছে। তাই ইফতার করতে এসেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানে ইফতার করার জন্য একটি ভালো কাজ করতে হয়, সেটি আমি জানতাম না। ইফতার করতে এসে জেনেছি। আজকে আমি দুইজন অসহায় মানুষকে অন্য একজন থেকে ইফতারিসামগ্রী সংগ্রহ করে দিয়েছি।’
প্রথম রমজান থেকে প্রতিদিন নগরীর এমএ আজিজ স্টেডিয়াম গেটসংলগ্ন ফুটপাথে ইফতারের আয়োজন করে আসছে এই সংগঠনটি। বিকাল সাড়ে ৫টায় সেখানে দেখা যায়, ফুটপাতে ১০০ জনের জন্য ইফতারি সাজিয়ে রাখা আছে। ১০ থেকে ১৫ জন স্বেচ্ছাসেবক ইফতারের আয়োজন তদারকি করেন। পুরো বিষয়টি তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন সংগঠনের সিনিয়র স্বেচ্ছাসেবক মোহাম্মদ মোরশেদ। তিনি বলেন, প্রতিদিন আমরা এখানে ১০০ থেকে ১২০ জনের ইফতারের আয়োজন করি। প্রথম রমজান থেকেই নিয়মিত এই আয়োজন করে আসছি। আজ আমরা ১০০ জনের জন্য ইফতারি নিয়ে এসেছি। তিনি আরও বলেন, ‘সারা দেশে দুই হাজারের মতো ডেইলি টেন মেম্বার সদস্য রয়েছেন, তারা প্রতিদিন ১০ টাকা করে মাসে ৩০০ টাকা দেন। এর পাশাপাশি আমাদের কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী আছেন, তারা আর্থিক সহযোগিতা করেন। ওই ফান্ডের মাধ্যমে আমরা ব্যয় নির্বাহ করি। আমাদের ৪০ থেকে ৪৫ জন স্বেচ্ছাসেবক আছেন। তারা বিনা পারিশ্রমিকে এই কাজে আমাদের সহযোগিতা করেন। প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ জন আমাদের সঙ্গে কাজ করেন।’
স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এ সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছেন নগরীর সরাইপাড়া সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মোস্তফা। ভালো কাজের হোটেলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষের পাশে থাকতে ভালো লাগে। স্কুলপর্যায়ে যুব রেড ক্রিসেন্টের দলনেতা হিসেবে কাজ করেছি। পরিবার থেকে ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা পাই।’
একই ধরনের মন্তব্য করেছেন মোহাম্মদ মোরশেদ। তিনি বলেন, আমাদের একটা স্লোগান আছেÑ কেউ একটা ভালো কাজ করলে ১০টা খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে। ওই স্লোগান থেকেই আমি ভালো কাজের হোটেলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছি। পাশাপাশি ঢাকায় যারা এই উদ্যোগ শুরু করেছেন, তারা আমার পূর্ব পরিচিত। ওনাদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চট্টগ্রামে যখন এই উদ্যোগ শুরু হয়, তখন থেকে ভালো কাজের হোটেলের সঙ্গে আছি।
তিনি আরও বলেন, কেউ কেউ ইফতার করতে এসে প্রতিদিন একই ভালো কাজের কথা বলেন। উনি হয়তো সত্য বলছেন না সেটি আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু তার পরও আমরা তাদেরকেও খাবার পরিবেশন করি। আমরা মনে করি প্রতিদিন ভালো কাজ করার কথা বলার কারণে কখনও খারাপ কাজ করতে গেলে অন্তত বিব্রত লাগবে।’