মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৩ ১২:৩০ পিএম
তখন তার মাত্র এক বছর বয়স। শরীরে জ্বর উঠল। একপর্যায়ে দুই পায়ের শক্তি হারালেন তিনি। সচল জীবন অচল হয়ে পড়ল। হয়তো সারা জীবনটাই তার অচল হয়ে পড়ে থাকবার কথা ছিল। তিনি তা হতে দেননি একদমই। পা অচল বলে জীবন তার থেমে থাকেনি। মোবাইল সেট মেরামত করে খুঁজে নিয়েছেন জীবিকার পথ। ম্যারাথন রেস করে পেয়েছেন পুরস্কার। আবার মঞ্চনাটকও করেন। এতক্ষণ যে মানুষটির কথা বলা হলো তিনি দেলোয়ার হোসেন সুজন।
তার মা-বাবা অনেক চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। চিকিৎসকরা বলেছেন, তার পা আর ঠিক হবে না। এভাবেই কাটাতে হবে সারা জীবন। এ অবস্থায় বেশিরভাগ মানুষ ভেঙে পড়ে। মনোবল হারিয়ে ফেলে। কিন্তু মাত্র এক বছর বয়সে অসুস্থ হলেও পড়াশোনা করেছেন তিনি। সফলভাবে এসএসসি পাস করেন। তারপর আর পড়াশোনা এগোতে পারেনি। আর্থিক অভাব-অনটন। পাশাপাশি শারীরিক সমস্যা পড়াশোনার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ২০০৬ সালে শরীয়তপুর জেলার নড়বালাখানা গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন সুজন। মোবাইল সেট সার্ভিসিংয়ের প্রশিক্ষণ নেন। বসে বসে কাজ করা যায়, তাই এই কাজটাই বেছে নিয়েছেন। সুজন জানান, তিনি দুজনকে সার্ভিসিংয়ের কাজ শিখিয়েছেন। তারা এখন আয় করে ভালোই। এরপরে তিনি ইনস্ট্রাগ্রামে সফলভাবে মার্কেটিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। দুই মেয়ে, বাবা, মাকে নিয়ে সুজনের পরিবার। থাকেন ঢাকার মিরপুরে। সার্ভিসিংয়ে যে আয় হয়, তা দিয়ে পরিবার চালাতে কষ্ট হয়। সুজন বলেন, সৎভাবে আয় করে কোনোভাবে দিনাতিপাত করছি। খরচ বেড়েছে কিন্তু সেভাবে আয় বাড়েনি।
সুজনের মতো অনেকেরই শারীরিক সমস্যা আছে, তাদের নিয়ে ঢাকায় হুইলচেয়ারে বিভিন্ন রকম খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। সেসব খেলাধুলায় সুজন অংশগ্রহণ করেন। পেয়েছেন পুরস্কার। তিনি ব্র্যাক ব্যাংক দৌড় কল্যাণের পথচলা-২০২৩তে অংশ নেন। এটা ছিল হুইলচেয়ার ম্যারাথন রেস। সেখানে পুরস্কার হিসেবে মেডেল পান। ইউএনডিপির প্যারা অলিম্পিক হুইলচেয়ার রেস প্রতিযোগিতায় ৬ জনের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন সুজন। বাংলাদেশে প্রথম পথশিশু, স্পেশাল চাইল্ড, ট্রানজেন্ডার নিয়ে ফ্যাশন শো হয়। সেখানেও সুজন উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা থিয়েটার ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের যৌথ আয়োজনে শিল্পকলা একাডেমিতে মঞ্চনাটক সুন্দরাম-এর মহড়ায় অংশ নেন তিনি। এর আগে একাধিক মঞ্চনাটকে অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছেন। শারীরিক বাধা থাকা সত্ত্বেও এতকিছু তিনি কীভাবে অর্জন করলেন? সুজন বলেন, মনের জোরে এতদূর এসেছি। আমি পারব, আমাকে পারতেই হবে। মাইন্ড সেটিংটা এমনই ছিল। আমার পরিবারের সদস্যরা সাহস জুগিয়েছে।
সুজনের মতো অসুস্থতা যে কারও হতে পারে। সড়ক দুর্ঘটনায় তো অনেকে পা কিংবা হাত হারান। তারা কি সুজনের মতো কাজ করতে পারেন? এ ব্যাপারে সুজন বলেন, সুযোগ দিলে অবশ্যই পারেন। কেউ সুযোগ দেয়নি। সুযোগ করে নিয়েছি। বরং সীমাবদ্ধতা যাদের আছে, তারা তাদের সুবিধামতো কাজে ব্যস্ত থাকলে মন ভালো থাকবে।
মোবাইল সার্ভিসিংয়ে কাজের জন্য ৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ তিনি সুবর্ণ নাগরিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত ইউসিবি প্রেজেন্ট সুবর্ণ নাগরিক সম্মাননা ২০২২ পেয়েছেন।
প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়; তারা সম্পদ। অথচ তাদের জন্য কাজ হয় কমই। সড়ক, শপিংমল, অফিস-আদালতে যাতায়াতের জন্য যে অবকাঠামো ব্যবস্থা থাকার কথা, তা একদমই নেই। সুজনের মুখে সে কথাই জানা গেল। তিনি বলেন, আমাদের বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াতে নানারকম সমস্যা হয়। সামান্য কিছু টাকা ভাতা পান তিনি। এই ভাতায় একজন মানুষের পক্ষে সারা মাস চলা অসম্ভব। এ ছাড়া সরকারি কোনো সাহায্য তার ভাগ্যে জোটেনি। সুজন আশা করেন, স্থায়ীভাবে সৃজনশীল কোনো কাজের ব্যবস্থা হলে এই কঠিন জীবন সংগ্রামের পথটা চলাটা কিছুটা সহজ হতো।