মাহির জামিল
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৩ ১৪:২০ পিএম
আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৩ ১৭:৫৬ পিএম
ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পর্কে তো আমরা সবাই জানি। একজনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট কখনও অন্যজনের সঙ্গে মেলে না। কারণ ফিঙ্গারপ্রিন্টে লুকিয়ে থাকে একজন ব্যক্তির একেবারেই নিজস্ব পরিচয়। ফিঙ্গারপ্রিন্টের মতোই প্রত্যেক ব্যক্তির আরও একটি পরিচয়সূচক সাইন আছে। যাকে বলে ওডোরপ্রিন্ট (Odor-Print)। প্রতিটি মানুষের একেবারেই নিজস্ব একটি গন্ধ আছে; যা আরেকজনের সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না। এ Odor-Print বলে দেয় আপনার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য।
একটা বিষয় খেয়াল করেছেন কখনও? বদমেজাজি কোনো লোক রাস্তা ধরে হাঁটছে। হঠাৎ রাস্তার কুকুর তাকে দেখে ঘেউ ঘেউ শুরু করে দিল। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে তেড়ে গেল তার দিকে। আবার দেখবেন, মিষ্টি নরম স্বভাবের মানুষ দেখে ওই কুকুরটিই কুঁইকুঁই করে লেজ নাড়াচ্ছে। এর কারণ ওই দুই ব্যক্তির গায়ের গন্ধ। আপনার গায়ের গন্ধ আপনার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে অবিরাম তথ্য ছড়িয়ে যায়। আপনার মনমেজাজ, আবেগ-অনুভূতি, খাদ্যাভ্যাস, শরীর-স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কেও তথ্য দেয় গায়ের গন্ধ। শুধু কি তাই, আপনি বিয়ের জন্য ঠিক কাকে পছন্দ করতে যাচ্ছেন, সেখানেও আছে গায়ের গন্ধের কিঞ্চিৎ ভূমিকা।
সাধারণত আমাদের শরীরের গন্ধ তিনটি স্তর থেকে আসে। যদিও শরীরের সব ধরনের গন্ধই তৈরি হয় আদতে ঘামের সঙ্গে ব্যাকটেরিয়ার বিক্রিয়ায়। প্রথম স্তরের গন্ধ ব্যাকটেরিয়া হামেশাই তৈরি করে বিক্রিয়ার উপজাত হিসেবে। আর দ্বিতীয় স্তরের গন্ধটা আসে আমাদের খাদ্যাভ্যাস থেকে। আমরা যা খাই তার ওপর এটি বেশ খানিকটা নির্ভর করে। তবে তৃতীয় স্তরের গন্ধটা একেবারেই আলাদা। এটা কোনো ব্যক্তির ‘মেজর হিস্টকম্পিট্যাবিলিটি কমপ্লেক্স’ বা MHC নামের এক ধরনের জিনের গুচ্ছ থেকে তৈরি হয়; যা এক ব্যক্তির থেকে আরেক ব্যক্তির ভিন্ন; ঠিক ফিঙ্গারপ্রিন্টের মতোই। এজন্যই একে Odor-Print বলা হয়। এটা সব সময় আপনার ব্যক্তিত্বের স্পষ্ট ধারণা দিয়ে দিয়ে থাকে।
গায়ের গন্ধ কীভাবে আমাদের আবেগ প্রকাশ করে? তা জানতেই একদল গবেষক একটি গবেষণা চালান। তারা কয়েকজনকে বেছে নিয়ে একটি ভয়ংকর মুভি দেখতে দেন। তার আগে তাদের সাফসুতরো টি-শার্ট পরানো হয়। মুভি দেখতে দেখতে ভয়ে তাদের শরীর ঘেমে ওঠে। এরপর এসব টি-শার্ট কিছু নারীকে শুঁকতে দেন। আর তখনই ঘটে অদ্ভুত ঘটনা! গন্ধ শুঁকে তারাও একই রকম ভয়মিশ্রিত মুখভঙ্গি করেন!
আরেক দলকে দেখতে দেওয়া হয় রুডিয়ার্ড কিপলিংয়ের ‘দ্য জঙ্গল বুক’। মন ভালো করা এ ছবিটি যারা দেখেন, তাদের টি-শার্টও শুঁকতে দেওয়া হয় কয়েকজনকে। তখন কিন্তু টি-শার্ট নাকের কাছে ধরতেই তাদের মুখ হাসি হাসি হয়ে যায়!
খাদ্যাভ্যাসও গন্ধের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। যদি খুব বেশি মাংস বা উচ্চমানের প্রোটিন খান, এসব মাংস কখনই পুরোপুরি হজম হয় না। বাড়তি অংশটি ফ্যাটি অ্যাসিড আকারে বেরিয়ে আসে ঘামের সঙ্গে। ত্বকের ওপর থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো এসব ফ্যাটি অ্যাসিডকে তাদের খাবার হিসেবে ব্যবহার করে। আর উপজাত হিসেবে তৈরি করে বিকট গন্ধ। তাই খুব মাংসভোজী কোনো ব্যক্তির শরীর থেকে বাজে গন্ধ আসাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তা ছাড়া পাতাকপি, ব্রুকলি, দারুচিনি, পেঁয়াজ, রসুনে থাকে সালফার। এ সালফারও উৎকট গন্ধ তৈরিতে ভীষণ ওস্তাদ!
তাই আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব তৈরি করতে গায়ের গন্ধকে আমলে নিতেই হবে আপনার। গন্ধকে নিশ্চয়ই থামানো যাবে না। তবে পরিবর্তন আনা যাবে খাদ্যাভ্যাসে। উন্নয়ন ঘটানো যাবে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের। তখন আপনার গায়ের গন্ধেও নিশ্চয়ই তার প্রতিফলন ঘটবে। অর্থাৎ গায়ের গন্ধেই ফুটে উঠবে পরিশীলিত ব্যক্তিত্বের আঁটোসাঁটো একটি ছাপ।