মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৩:১৬ পিএম
আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৩:৩৪ পিএম
তিনি নিজের বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছেন। তার উদ্যোগে বন্ধ হয়েছে নয়জন কিশোরীর বাল্যবিবাহ। কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি তিনি একজন ইয়ুথ স্পিকার। তার কথা সবাই মনোযোগ দিয়ে শোনে। সাহসী আত্মপ্রত্যয়ী এই মানুষটির নাম মোসা. আনিকা। সম্প্রতি মোহাম্মদপুর গভ. ল্যাবরেটরি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। গ্রামের বাড়ি জামালপুর। ঢাকার মোহাম্মদপুরে থেকেই তিনি কাজ করেন। বাবা, মা আর ছোট বোনকে নিয়ে তার পরিবার।
আনিকা যখন স্কুলে পড়েন, তখন তার বিয়ের প্রস্তাব আসে পাশের বাসা থেকে। বিয়ে, সংসার— এসব তখন কিছুই বুঝতেন না। দুই চোখভরা স্বপ্ন— পড়াশোনা করবেন, বড় হবেন। বিয়ের প্রস্তাবে আনিকা সরাসরি ‘না’ করে দেন। ধীরে ধীরে তিনি জানতে পারেন বাল্যবিবাহের নানান কুফল, ক্ষতিকর দিক। কিছুদিন পর পাশের গলির এক মেয়ের বাল্যবিবাহ হচ্ছিল। সেটাও বন্ধ করেন আনিকা। ততদিনে নিজের মধ্যে বাল্যবিবাহ বন্ধের একটা তাড়াও তৈরি হয়। একটা, দুইটা করে একে একে নয়টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে সফল হয়েছেন।
বাল্যবিবাহ দিতে পারবেন না— এমনটা বললেই কি বাবা-মা সেটা বন্ধ করেন? মা-বাবাকে বোঝাতে হয় ভালোমন্দ নানান দিক। প্রয়োজনে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাহায্যও নিতে হয়। তিনি বলেন, ‘অভাবের কারণে এক মেয়েকে তার বাবা-মা বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। আমি আশপাশের কয়েকজনকে নিয়ে সেই কিশোরীর বাসায় গেছি। মেয়েটির বাবা বললেন, টাকা খরচ করে মেয়েকে আর পড়াতে পারবেন না। তখন আমরা বললাম, এই ব্যাপার আমরা দেখব। দেখতে দেখতে সেই কিশোরী আজ দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। যখন আমি এই বাল্যবিবাহ বন্ধ করি, তখন আমার বয়স ১৪ বছর ছিল।’
মোহাম্মদপুরসহ নানান এলাকায় আনিকা কাজ করেন। বিশেষ করে বস্তিগুলোয়, যেখানে কুসংস্কারের শেষ নেই। অভাবের কারণে বেশিরভাগ বাবা-মা মেয়েদের বাল্যবিবাহ দেন। শুরুটা কাউকে না কাউকে করতেই হয়। আনিকার বাল্যবিবাহ বন্ধের উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়েছে। অভিভাবকরা এখন সচেতন হয়েছেন।
আনিকা, সিরাক বাংলাদেশের ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডারে কাজ করছেন। তিনি কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক তথ্য ও পরামর্শ দেন। তিনি একজন ইয়ুথ স্পিকার। সিরাক বাংলাদেশ থেকে ১১ অক্টোবর, ২০২২ তিনি ইয়ুথ স্পিকার হিসেবে অ্যাওয়ার্ড পান।
একজন ইয়ুথ স্পিকারের কী কী গুণ থাকা চাই— জানতে চাইলে আনিকা বলেন, কথা বলার সাহস, সত্যটা উপস্থাপন করার মনোভাব, কাজের প্রতি আগ্রহ। আত্মবিশ্বাস নিয়ে গুছিয়ে কথা বলে মানুষকে বোঝাতে হবে।
একটি ঘটনা আনিকার শিশুদের নিয়ে কাজ করার প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। একবার একটি ছোট্ট শিশুকে রাস্তায় টাকা চাওয়ার কারণে একজন তার গায়ে হাত তুলেছিল। তখন আনিকা প্রতিবাদ করেন। লোকটি আনিকার ওপর ক্ষিপ্ত হয়, লোকজন জড়ো করে। জড়ো হওয়া লোকজন লোকটির পক্ষে সাফাই গাইল। উল্টো আনিকাকে বলা হলো, আপনি ছোট মানুষ, ছোট মানুষের মতো থাকেন। আনিকা বলেন, ‘ওই মুহূর্তে নিজেকে খুবই ব্যর্থ মনে হচ্ছিল। সেখান থেকেই আরও বেশি করে শিশুদের নিয়ে কাজ করছি। তাদের বিভিন্নভাবে পরামর্শ এবং পড়াশোনার ব্যবস্থা করে আসছি অনেক দিন ধরে।’ আনিকা মোহাম্মদপুর ল্যাবরেটরি হাই স্কুলে অনেক শিশুর পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তার এ কাজে সাহায্য করেছেন মোহাম্মদপুর ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. জামাল।
কাজ করতে গিয়ে কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়— জানতে চাইলে আনিকা বলেন, ‘আমি যেহেতু একজন মেয়ে, কাজ করার সময় অনেক বাধা এসেই থাকে। আগে কেউ একটা কথা বললে সেটা খুব বেশি গায়ে লাগত। এখন তেমন লাগে না। প্রথম প্রথম সবাই ভাবত ও ছোট মানুষ, কী এমন কাজ করবে। আস্তে আস্তে সবার চিন্তাধারা বদলে দিয়েছি আমার কাজ দিয়ে।’
আনিকার বাবা ক্ষুদ্র ব্যবসা করেন। ছোটবেলা আনিকার অনেক কষ্টে কেটেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সুবিধাবঞ্চিত শিশু আমি নিজেও ছিলাম। ছোটবেলা খুবই কষ্ট করে কাটিয়েছি। স্কুলের বেতন দেওয়ার জন্য অন্যের বাসায় রুটি বানাতাম।’
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আনিকা বলেন, ‘আমি একজন স্বেচ্ছাসেবী হয়ে জীবনভর মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। সব শিশুকে স্কুলমুখী করা, বাল্যবিবাহ হয়ে অকালমৃত্যু যেন না হয়, নারী নির্যাতন বন্ধ যেন হয়, সেজন্য কাজ করব।’