রবিউল হুসাইন
প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১২:২২ পিএম
শোলার তৈরি কুমির, পাখি কিংবা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিয়ের মুকুট, দেখলেই মন ভরে যায়। শোলা দিয়ে এই শিল্পকর্মগুলো যারা করেন তাদের বলা হয় মালাকার। বংশপরম্পরায় এই মালাকাররা জীবিকা নির্বাহের অনুষঙ্গে বাঁচিয়ে রেখেছে ঐতিহ্যবাহী ও নান্দনিক শোলা শিল্পকে। যদিও কালের যাত্রায় আর জীবনের চাহিদায় আরও অনেক কিছুর সঙ্গে শোলা শিল্পও আজ হুমকির মুখে।
বিল-ঝিল শুকিয়ে যাওয়ায় এখন আর আগের মতো শোলা পাওয়া যায় না। অনেক জলাভূমি ভরাটও হয়ে গেছে। একসময় অনেকটা বিনামূল্যেই বিলঝিল থেকে যে শোলা সংগ্রহ করত মালাকাররা, এখন তা পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। কাঁচামালের সংকটের কারণে মালাকাররা পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন। দেশে যে কয়েক ঘর শোলা শিল্পী এখনও টিকে আছে তাদের একজন মাগুরার নিখিল চন্দ্র মালাকার। সোনারগাঁয়ের লোকশিল্প মেলায় এসেছেন তাঁর তৈরি শোলা শিল্প নিয়ে।
আমাদের দেশে সাধারণত দুই ধরনের শোলা পাওয়া যায়Ñ কাঠ শোলা ও ভাট শোলা। মালাকাররা তাদের শিল্পকর্মের জন্য ভাট শোলা ব্যবহার করে থাকেন। একে মালি শোলাও বলা হয়ে থাকে। এ শোলা বেশ নরম ও ওজনে স্পঞ্জের মতো হালকা। কাণ্ডসর্বস্ব এ গাছের ভেতরটা ধবধবে সাদা। জলাভূমি, বিলঝিল ও হাওর-বাঁওড় থেকেই মালাকাররা শোলা সংগ্রহ করে তা রোদে শুকিয়ে পরে ছুরির মাধ্যমে অপরূপ নকশা ফুটিয়ে তোলেন।
এক সময় বিয়ে, নববর্ষ, পূজা, মেলা ও উৎসব-পার্বণে মালাকাররা তাদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করলেও এখন বছরের বেশিরভাগ সময় তাদের কর্মহীন থাকতে হয়।
মাগুরা জেলার শালিখা থানার শতরূপা গ্রামের শোলা শিল্পী নিখিল চন্দ্র মালাকার জানান, আমি আমার বাপ-দাদার কাছ থেকে এ কাজ শিখেছি। আগে আমাদের গ্রামে শতাধিক পরিবার এ পেশায় ছিল, এখন আমরা দুই-তিন পরিবার কোনো রকমে টিকে আছি। এই দুই-তিন পরিবার শোলার কাজ করলেও প্রয়োজনীয় শোলা পাওয়া যাচ্ছে না। তাই অনেক কষ্টে আমাদের সংসার চালাতে হয়। বছরে একবার সোনারগাঁয়ের লোকজ উৎসবে আসি। কিন্তু ক্রেতারা শোলার জিনিসের ন্যায্য দাম দিতে চায় না। সব মিলে এ পেশাটি এখন বিলুপ্তির পথে। এ পেশার সংকটের কারণে আমার ছেলে-মেয়েরা এ পেশায় আসতে আগ্রহী নয়।
একই এলাকার আরেক শোলা শিল্পী নিমাই মালাকার জানালেন, শোলা শিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্য পর্যাপ্ত শোলা না পাওয়া। দিন যত যাচ্ছে, শোলা ততই কমে যাচ্ছে। কতদিন এ পেশা ধরে রাখা যাবে তা অনিশ্চিত। শোলার চাষাবাদ করা গেলে এ শিল্পটি একটি সম্ভাবনাময় কারুশিল্প হতে পারে বলে জানান তিনি ।
কারুশিল্পীরা আমাদের সংস্কৃতিতে আত্মার স্পন্দন। তাদের অবশ্যই টিকিয়ে রাখতে হবে। এটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে পদক্ষেপ নিতে হবে। শোলা শিল্পের কাঁচামাল শোলা চাষের ব্যবস্থা করা ও শিল্পীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে শিল্পটিকে রক্ষা করা সম্ভব।