এহসানুল হক সুমন
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৩ ১২:২২ পিএম
বাঁশিতে একের পর এক গানের সুর তোলেন। সেই সুর আকৃষ্ট করে ছোট-বড় সবাইকে। যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। বাঁশিওয়ালা আর কেউ নন, রংপুরের দৃষ্টিহীন রাজকুমার রায়। এ বাঁশির সুরই তার জীবন-জীবিকার উপায়। দৃষ্টি হারিয়েছেন চার দশকের বেশি আগে। লাঠি নিয়ে চলাফেরা করেন। নিজ গ্রামসহ রংপুর নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় প্রতিদিন বাঁশি বাজান তিনি। ‘বাবলা বনের ধারে বংশী বাজায় কে’- এমন কৌতূহল নিয়ে তার বাঁশির সুর শুনতে ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসে পথচারীরা। বাঁশিতে সুর শুনে পথচারীর কেউ ছবি তোলে, ভিডিও করে। সুরে মন ভোলানো পথচারীরা রাজকুমারকে অর্থ সহযোগিতা করে। শুক্রবার নগরীর সেনানিবাস এলাকায়, শনি ও রবিবার ধাপ-লালকুঠি, সোম ও বুধবার জাহাজ কোম্পানি মোড়, পায়রা চত্বর, সুপার মার্কেট, হাঁড়িপট্টি রোড, মঙ্গলবার কেরানীপাড়া চৌরাস্তার মোড়, বৃহস্পতিবার মুন্সিপাড়ায় বাঁশি বাজান রাজকুমার। অন্ধ হয়ে ভিক্ষে করে নয়, বরং বাঁশির সুরের বিনিময়ে অর্থ নেন। বাঁশি বাজিয়ে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা উপার্জন করেন। বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত বাঁশের বাঁশি। তাই বাঁশির সুর অন্য বাদ্যযন্ত্রের চেয়ে বেশি টানে মানুষকে। রাজকুমার পথচারীদের মন বেশি গলাতে পারলে উপার্জন হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। বাঁশি রাজকুমারকে সমাজে আলাদাভাবে পরিচিত করেছে। গ্রামের ছোট্ট শিশুরা ‘বাঁশিওয়ালা দাদু’ নামে ডাকে তাকে। বিভিন্ন পূজাপার্বণে গ্রামবাসীও নানাভাবে সহযোগিতা করে রাজকুমারকে। চোখের আলো না থাকার কষ্ট ছাড়া কোনো দুঃখ নেই রাজকুমারের।
রংপুর নগরীর সাতগাড়া চড়কবাড়ি ডাক্তারপাড়ায় পৈতৃক ভিটায় বাস করেন রাজকুমার রায়। পাকা সড়কের পাশে ঘর রাজকুমারের। আঙিনায় দুটি ছোট গরু বাঁধা। একটি টিনের ঘরের সামনে ছোট্ট রান্নাঘর। সেই ঘরে স্ত্রী কণিকা রানীকে নিয়ে রাজকুমারের সংসার। সরকারি কর্মচারী বাবা মণীন্দ্র রায়ের প্রথম ঘরের তৃতীয় সন্তান রাজকুমার। ছোট থেকে ডানপিটে স্বভাবের। পড়েছেন তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। রাজকুমারের সঙ্গে আলাপকালে জানান, ১৯৭১ সালে ঐতিহাসিক রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও কর্মসূচিতে সদর উপজেলার পালিচড়া থেকে এসে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনাবাহিনী গুলি ও গোলা বর্ষণ শুরু করে। গুলি থেকে বাঁচতে মাটিতে শুয়ে শুয়ে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন রাজকুমার। সে সময় কাশ গাছের নাড়ায় একাধিকবার চোখে আঘাত পান তিনি। এর পর থেকে ধীরে ধীরে চোখের আলো হারাতে থাকেন। ১৯৭৫ সালের দিকে তিনি পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যান। বাবা-মার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তার চোখের চিকিৎসা করাননি। এতে মনে তীব্র ক্ষোভ জন্মায় তার। সেই ব্যথা ভুলতে হাতে তুলে নেন বাঁশি। মনের জ্বালা মেটান বাঁশিতে সুর তুলে। সেই বাঁশি এখন তার জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজকুমার বলেন, ‘পালিচড়া থেকে গ্রামের লোকজনের সঙ্গে ক্যান্টনমেন্ট দখল করতে এসেছিলাম। সেনাবাহিনী গুলি ছোড়া শুরু করলে প্রাণ বাঁচাতে হামাগুড়ি দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম। কাশের নাড়া লেগে আমার চোখ নষ্ট হয়ে যায়। আমি অন্ধ হয়ে গেলে সে সময় গরু-ছাগলকে ঘাস খাওয়াতাম আর মনের দুঃখে বাঁশি বাজাতাম। আমার কোনো ওস্তাদ নাই। সারা দিন ঘুরেফিরে বাঁশি বাজাই, মানুষ বাঁশি শুনে দশ-বিশ টাকা দেয়। এভাবে করি খাই, আল্লাহ ঠেকায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাইরে না গেলে ভালো লাগে না। ঝড়বৃষ্টি, শীত যা-ই হোক প্রতিদিনই বাইরে গিয়ে বাঁশি বাজাই। বাঁশি বাজাচ্ছি-খাচ্ছি, আমার এখন কোনো কষ্ট নাই। সরকারের যদি মন চায় আমাকে সাহায্য করবে। সেটি নিতে আমার কোনো সমস্যা নাই। যখন বুড়ো হয়ে যাব তখন শানকি নিয়ে বাজারে বসব, অবশ্যই মানুষ আমাকে দেখবে।’
রাজকুমারের স্ত্রী কণিকা রানী বলেন, ‘আমার স্বামী চোখে দেখতে পায় না। প্রতিদিন বাঁশি বাজিয়ে যা উপার্জন করে তাই দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। দুটি গরুর বাছুর লালনপালন করছি। তা দিয়ে যদি সংসারে উন্নতি করা সম্ভব হয়, সেই চেষ্টা করছি। নিয়মিত সরকারি ভাতা পেলে উপকার হতো।’