রবিউল কমল
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৩ ১৩:১০ পিএম
ভবি: সাজিদ আহমেদ
পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য মিমি। ও কিছুই খেতে চায় না। এমনকি পড়তেও চায় না। এটা নিয়ে বাবা-মা খুবই চিন্তিত। হঠাৎ কী হলো মিমির। সব সময় তা নিয়ে ভাবছেন বাবা-মা দুজনেই। এর সমাধান তো দরকার। তাই তারা মিমির জন্য নতুন একটি কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। মিমিকে নানাভাবে ভয় দেখাচ্ছেন। এই যেমন পড়তে না বসলে ভূতে ধরবে, না খেলে সাপে কামড় দেবে। প্রথমদিকে এসব কৌশলে কাজ হয়েছিল। কিন্তু এখন ঘটছে উল্টো ঘটনা। সব সময় মিমি ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকে। তার মধ্যে জড়তা এসেছে। সে আর ছোটাছুটি করে না। স্কুলে গিয়েও সে আগের মতো খেলে না। সার্বক্ষণিক যেন ভয় তাড়া করে তাকে। এ নিয়ে বাবা-মা পড়েছেন নতুন সমস্যায়।
প্রচুর কার্টুন দেখে রিফাত। স্কুল থেকে ফিরেই টিভির রিমোট নিয়ে বসে পড়ে। টম অ্যান্ড জেরি, মিকি মাউস, ডিজনিসহ তার পছন্দের তালিকা অনেক দীর্ঘ। কৌতূহলবশত একদিন ভয়ের সিনেমা দেখে খুব ভয় পেয়েছে রিফাত। সারা রাত আর ঘুমাতেই পারল না। চোখের সামনে সব সময় ভয়ংকর আকৃতির অ্যানাকোন্ডার ছবি ভেসে উঠছে রিফাতের।
আসলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, শিশুরা অনেক সময় গল্প শুনে বা ছবি দেখে ভয় পায়, আর এই ভয় শিশুর মনের গভীরে ছাপ ফেলে। ফলে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ হয় বাধাগ্রস্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের কোনো কাজ করানোর জন্য ভয় দেখালে তা তার মনে গেঁথে যায়। এর ফলে ওই শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং আত্মবিশ্বাস কমে যায়। এর ফলে শিশুর সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে না। তাই শিশুদের কোনোভাবেই ভয় দেখানো উচিত নয়।
আবার পারিবারিক কলহের চাপেও অনেক শিশুর আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় শিশুদের মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যেসব শিশু মা-বাবার মনোমালিন্য দেখতে দেখতে বড় হয় তারা হতাশ, অসামাজিক ও সহিংস হয়ে ওঠে। নানা অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকে তারা। তাদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। ফলে মনঃসংযোগের ঘাটতিও দেখা দেয়। মানসিক রোগ ও ব্যক্তিত্বের অস্বাভাবিকতা ঘটতে পারে। ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ-২০০৯’ শীর্ষক এক জরিপে দেখা যায়, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশুদের ১৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ মানসিক রোগে আক্রান্ত। এমন ঘটনা আবার মেয়েশিশুর তুলনায় ছেলেশিশুর মধ্যে বেশি। মেয়েশিশুদের ১৭ দশমিক ৪৭ শতাংশের পাশাপাশি ১৯ দশমিক ২১ শতাংশ ছেলেশিশু মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তো থাকে। গবেষকরা বলেন, ‘শিশুদের ওপর মানসিক আঘাতের প্রভাব অনেক দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষতিকর। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মানসিক আঘাত শিশুর পরবর্তী জীবনকে বাধাগ্রস্ত করে, আবেগজাত সমস্যায় আক্রান্ত করে।’
প্রতিদিন মা-বাবার ঝগড়ার প্রত্যক্ষদর্শী অনেক শিশুর মধ্যে পরবর্তীকালে ব্যক্তিত্বের অস্বাভাবিকতাও দেখা যায়। সমাজে মানিয়ে চলতে অসুবিধা হয় তাদের। গর্ভকালে যেসব মা নির্যাতনের শিকার হন অথবা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন, তাদের সন্তান জন্মের পর নানা জটিলতায় ভোগে। নিউইয়র্কের মাউন্ট সিনাই মেডিকেল সেন্টারের ট্রমাটিক স্ট্রেস স্টাডিজ বিভাগে সম্পন্ন এক গবেষণায় দেখা যায়, মাতৃগর্ভে থাকার সময় যাদের মা মানসিক আঘাতের শিকার হয়েছিলেন, সেই শিশুরা সহজেই মানসিক চাপে ভেঙে পড়ে এবং তাদের মধ্যে অ্যাংজাইটি বা পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
ইউনিসেফের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘পারিবারিক কলহের মধ্যে বেড়ে ওঠা অথবা মাকে নির্যাতিত হতে দেখা শিশুদের জীবনের প্রথমদিকের বছরগুলোতে তারা হয় বিশেষভাবে অরক্ষিত, অসহায়। এসব শিশু পরবর্তীকালে ঝুঁকিপূর্ণ বা অপরাধমূলক আচরণ করতে পারে। বিষণ্নতা বা তীব্র দুশ্চিন্তায় ভোগার ঝুঁকিতেও পড়তে পারে এসব শিশু।’
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ মোহিত কামাল বলেন, শিশুর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঠিক বৃদ্ধি হলো শারীরিক বিকাশ। আর মানসিক বিকাশ হলো আচার-ব্যবহার, চিন্তাচেতনা, কথা বলা, অনুভূতি ও ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষমতা অর্জন। শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ছাড়া শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। গর্ভকালীন মায়ের অপুষ্টি, মা-বাবার মধ্যে কলহ, পারিবারিক নির্যাতন, মাদকাসক্তি, থাইরয়েড ও অন্যান্য হরমোনের আধিক্য ও অভাব, জন্মগত ত্রুটি, প্রসবকালীন জটিলতা, শব্দদূষণ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ ইত্যাদি কারণে শিশুর মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে।’