নাজমুল হুদা
প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৩ ১৮:৪৩ পিএম
আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৩ ১৯:২৬ পিএম
বিশ্বখ্যাত গ্রিক বাগ্মী ডেমোস্থেনিস শৈশবে তোতলা ছিলেন। প্রায়ই পাহাড়ে গিয়ে তিনি চিৎকার করে কথা বলতেন। এভাবে দিনের পর দিন অনুশীলনের ফলে একসময় ডেমোস্থেনিস হয়ে ওঠেন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বক্তা। তিনি বলতেন, ‘মানুষের মধ্যে একটা বোকা প্রাণী বাস করে। নাটকীয়তা, অঙ্গভঙ্গি, অভিনয় দিয়ে শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণ করে সে এবং এই জায়গায় তার আবেদন। এখানেই বক্তা সফল।’
যখন কেউ সুন্দর, মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনা করে কিংবা টেলিভিশনে বিতর্ক করে তখন নিশ্চয় মনে হয়, ‘ইস, আমি যদি এভাবে কথা বলতে পারতাম! আচ্ছা, আমি কি পারব অত সুন্দর করে কথা বলতে!’ সফল বক্তা বা ভালো বিতার্কিক হতে হলে প্রথমে জরুরি সাহস বা মনোবল। হীনমন্যতা, জড়তা ত্যাগ করতে হবে। একজন বক্তা যুক্তিতর্কে, কথার কারুকার্যে মাতিয়ে তোলে তার চারপাশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির (ডিইউডিএস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. নিয়ামত এলাহী (বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কুইনপিয়াক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক) বলেন, বিতর্কে ভালো করার জন্য দুটি বিষয় প্রয়োজন—পড়া ও অনুশীলন। তাই পড়ো, অনুশীলন করো।
আমাদের স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্ক ক্লাব আছে। প্রথমে খোঁজ নিয়ে নাম লেখাব। ক্লাব যদি না থাকে নিজেই ক্লাব গড়ার উদ্যোগ নেব। সাহস করে শুরুটা করলে পরে সবাই এগিয়ে আসবে। সহজ করে কথা বলার চেষ্টা করতে হবে। শ্রোতারা যেন সহজে বুঝতে পারে। রবিঠাকুর বলেছিলেন, ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে।’
তাই বক্তৃতা সহজ ও সরস করাটা জরুরি।
বিতর্ক বা বক্তৃতা যা-ই হোক, বাড়তি চাপ নেওয়ার দরকার নেই। এতে ফল উল্টো হতে পারে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলার অভ্যাস করতে হবে। পুরস্কার জেতার চিন্তা মাথায় রাখা যাবে না। প্রস্তুতি ভালো থাকলে অবশ্যই ‘দেখা হবে বিজয়ে’। কথা বলার সময় সামনে কারা, কতজন বসে আছে তা ভেবে বিচলিত হওয়ার দরকার নেই। কোথাও বক্তব্য দেওয়ার আগে দর্শকের রুচি, চাহিদা অনুযায়ী আগে থেকেই প্রাসঙ্গিক কথা সাজিয়ে নেব।
একজন হকার, ম্যাজিশিয়ান, ভালো অভিনেতা বা বক্তা কীভাবে কথার জাদুতে সবাইকে মোহিত করে! কথার কারুকার্যে কীভাবে আসর মাত করে তোলে তা খেয়াল করেও শিখতে পারি।
অনুকরণ নয়, বরং নিজের ভেতরের শক্তি কথার জাদুতে ফুটিয়ে তুলতে পারলে ভালো বক্তা হওয়া যাবে। সুন্দর কথা বলার পূর্বশর্ত হচ্ছে শুদ্ধ উচ্চারণ। বাংলা বা ইংরেজি যেকোনো ভাষায় ভালো বক্তব্য দেওয়ার জন্য আঞ্চলিকতা বাদ দিয়ে শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলা জরুরি।
প্রয়োজনে বিষয়ভিত্তিক বই পড়ব, ভিডিও দেখে বা পারদর্শী কারও পরামর্শ নিয়ে ভুলগুলো শুধরে নেব। এজন্য পড়াশোনা ও অনুশীলন জরুরি। বই, পত্রিকা, সাময়িকী, রেডিও-টেলিভিশনে খবর বা আলোচনাভিত্তিক অনুষ্ঠান দেখার অভ্যাস থাকলে বক্তব্য বা বিতর্কের জন্য সহজ হয়। দৈনন্দিন ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে ভাবতে হবে এবং সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করতে হবে। অন্যদের আবেগ, আচরণ, কথা-কৌশল খেয়াল রাখতে হবে। এতে যুক্তিবোধ জাগ্রত হবে। মনের সব কটি জানালা খুলে রাখলে ভাবনার জগৎ প্রসারিত হবে। চারদিকে কী হচ্ছে, কী চলছে তা জেনে বিশ্লেষণের পর অপ্রয়োজনীয় তথ্য মস্তিষ্কে গেঁথে বাকি সব ঝেড়ে ফেলব। যেকোনো সভা-সম্মেলন, অনুষ্ঠান বা প্রতিযোগিতায় অংশ নিলে সেখানেও দেখবে অনেক উপাদান পাওয়া যাবে। এতে সম্পাদনা দক্ষতাও বৃদ্ধি পাবে। বক্তৃতার জন্য যুক্তিনির্ভর ভালো স্ক্রিপ্ট তৈরি করা জরুরি। ভালো স্ক্রিপ্ট হাতে থাকলে ভালো বক্তব্য দেওয়ার সম্ভাবনা অনেকখানি বেড়ে যায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার অনুশীলন করতে পারি। নিজের অঙ্গভঙ্গি ও কণ্ঠস্বরের তারতম্য বা ভারসাম্য যাচাই করে নিতে পারি। নিজের বক্তব্য রেকর্ড করে বারবার শুনলে ভালো বক্তা বা বিতার্কিক এবং উপস্থাপক হওয়া অনেক সহজ হবে।