আমীরুল ইসলাম
প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৩ ১৮:১৬ পিএম
ছোটবেলায় গ্রাম ছাড়া ওই রাঙামাটির পথ ধরে ছোট মামার সঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম। মামা গল্প বলতেন। ছোট ছোট গল্প। গ্রামের মাঠ। দূরের নদী। নীল আকাশ। সবুজ ধানক্ষেত। দূরে ঘন জঙ্গল। মামা বলতেন, ওই জঙ্গলের নাম কী জানিস?
ভূতের বন। ওই বনে হোগলু থাকে। হোগলু কে জানো? হোগলু এক ভয়ংকর দৈত্যের নাম।
আমি কল্পনায় হোগলুকে দেখি। যখন জোরে বৃষ্টি হয়, যখন ঝড় হয়, যখন নদীতে ঢেউ নাচে তখন হোগলু বন থেকে বের হয়ে লোকালয়ে আসে। মানুষ তখন হোগলুর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। মামা, হোগলুকে বন থেকে তাড়িয়ে দাও না কেন?
চেষ্টা তো করি। কিন্তু হোগলুরা বারবার জন্ম নেয়। তারা কোনো দিন হারিয়ে যায় না।
মামা আরও বলেন, একদিন তোকে ওই বন পেরিয়ে তেপান্তরে নিয়ে যাব।
ওখানে কী আছে মামা?
তেপান্তর পার হলে আছে ক্ষীর নদী। ক্ষীর নদীর তীরে আছে অনেক রকম গাছ। সেসব গাছের ডালে আছে হাজার হাজার পাখি।
বাঃ! মামা, আমরা একদিন পাখি দেখতে যাব।
মাঠের ধার দিয়ে মামার সঙ্গে হাঁটছি। লকলক করছে সবুজ ধান। দূরে দুটো লোক খাঁচা হাতে যাচ্ছে।
মামা, ওরা কারা?
ওরা পাখি শিকারির দল।
কোথায় যাচ্ছে?
পাখি মারতে যাচ্ছে। বনের ধারে।
কেন ওরা পাখিদের মারে?
ওরা পাখি ধরে বিক্রি করে। এভাবেই ওদের জীবন কাটে।
অন্য কিছু করতে পারে না ওরা, মামা?
মামা চুপ থাকলেন। বললেন,
পাখিরা কোনো দিন শেষ হবে না। যত পাখিই ধরিস না কেন, কোথা থেকে আবার পাখিরা এসে পড়বে। আকাশ ভরে যাবে পাখিতে পাখিতে। পাখিশূন্য হয় না পৃথিবী।
মামা, আমি পাখি পুষব। আমাকে পাখি ধরে দেবে তুমি?
পাখিদের কি খাঁচায় বন্দি করা উচিত? পাখিরা তো আকাশে উড়বে। ওরা কেন খাঁচায় থাকবে?
আমি চুপ থাকি।
মাথার ওপর দিয়ে তখন একঝাঁক পাখি উড়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট পাখি। পাখিদের আমি ঠিকঠাকমতো চিনি না। কাক, চড়ুই, দোয়েল, টিয়া, কাকাতুয়া এদের চিনতে পারি।
মামা বললেন,
ওই ঝাঁক বেঁধে উড়ে যাচ্ছে, পাখিদের নাম হলো হরিয়াল। ওরা অশথ গাছের সবুজ পাতার সঙ্গে মিশে থাকে। বটের ফল খায়। ওরা ঝাঁক বেঁধে থাকে।
আমি উদাসভাবে হরিয়ালের ঝাঁকের দিকে তাকিয়ে থাকি।
পাখিদের দিকে তাকিয়ে মামাকে জিজ্ঞেস করি,
মামা, তোমার কী হতে ইচ্ছা করে?
মামা খানিক ভাবলেন। তারপর সবুজ ধানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
মানুষ। শুধু মানুষ হতে ইচ্ছা করে।
আমি তখন হেসে ফেললাম। মামা, তুমি মানুষ নও কে বলল?
মামা বললেন,
আরে পাগল! হাত পা মাথা চোখ থাকলেই কি মানুষ হওয়া যায় রে!
আমি মামার সঙ্গে হেঁটে ধানের ক্ষেত পেরিয়ে এগিয়ে যেতে থাকি।
তখন পড়ন্ত বিকাল। আকাশে আলোর উঁকিঝুঁকি।
একঝাঁক পাখি উড়ছে আকাশে। মামা আমাকে শুধালেন,
খোকন, তোর কী হতে ইচ্ছা করে?
আমি পাখির ঝাঁকের দিকে তাকিয়ে বললাম,
পাখি।
পাখি হয়ে কী করবি তুই?
আকাশে উড়ে যাব। বনে বনে ঘুরব। ফলমূল খাব।
আর কী করবি?
ঠুকরে ঠুকরে ওই বনের ধারে হোগলুদের মেরে তাড়িয়ে দেব। ওরা যেন আর অত্যাচার করতে না পারে।
মামার হাত ধরে আমি হেঁটে যাই। আমার গন্তব্য পাখিপুর।
পাখিপুর কতদূর?