মোস্তাক রহমান
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৩ ১৯:২৯ পিএম
আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৩ ১৯:৩৯ পিএম
বিংশ শতাব্দীর শুরুর কথা। ভারতবর্ষে তখন চলছে ব্রিটিশ শাসন। ১৯০২ সালের পুলিশ কমিশনের সুপারিশে বেঙ্গল (আসামসহ) পুলিশের ট্রেনিংয়ের জন্য একটি পুলিশ ট্রেনিং কলেজ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কলেজ স্থাপনের জন্য স্থান নির্বাচনের দায়িত্ব দেওয়া হয় ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর চেমনিকে। তাকে স্থান নির্বাচনে কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছিল। প্রধান শর্ত ছিল স্থানটি বাংলার মধ্যাঞ্চলে হতে হবে, উত্তম যোগাযোগব্যবস্থা থাকতে হবে এবং মনোরম আবহাওয়া হতে হবে।
তিনি গাজীপুর (উত্তর প্রদেশ) থেকে গঙ্গা ধরে রাজমহল পার হয়ে যত পদ্মা উপকূলে এগিয়ে আসছিলেন, ততই আবহাওয়ার পরিবর্তন লক্ষ করছিলেন। মেজর চেমনির স্টিমার যখন চারঘাট পোর্টে থামল, তখন দুপুর পেরিয়ে গেছে। অবসরপ্রাপ্ত মেজরের মন জুড়িয়ে গেল। পশ্চিম দিকে হাঁটতে থাকলেন। ইতোমধ্যে কীভাবে যেন খবর পেয়ে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা এসে উপস্থিত হন। মেজর চেমনি যত পশ্চিমে এগিয়ে যান, ততই যেন বৃক্ষছায়ার বিপুলতায় মুগ্ধ হন। অতিকায় শাল-প্রাংসু-মেহগিনির সারি আর সামনে পদ্মার উপকূলজুড়ে খয়ের-বাবলার গভীর মায়াবী বনাঞ্চল। সঙ্গে থাকা পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ডাচদের নির্মিত পরিত্যক্ত এই নীলকুঠির বর্তমান মালিক মেদিনীপুরের জমিদারি স্টেট।
ডাচরা ব্যবসা বন্ধ করে চলে গেছে। লতাগুল্মে ঢাকা পাথর বিছানো পথে অনেকটা হেঁটে তিনি আবিষ্কার করেন ইন্দো-ইউরোপিয়ান ডিজাইনের মজবুত কাঠামোর বিশাল বিশাল ভবন। সামনে বিস্তীর্ণ প্রান্তর চলে গেছে পদ্মার পাড় পর্যন্ত। ১৪৩ একরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিক্ষিপ্ত স্থাপনা, মনোলোভা বৃক্ষরাজির ছায়াঘেরা এ ডাচকুঠি তার মনে ধরে গেল। তিনি পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য এই স্থানটিকে পছন্দ করেন। ডাচদের রাজশাহী অঞ্চলের ১৫২টি নীলকুঠির সদর দপ্তর ছিল এটি।
মেজর চেমনির রিপোর্টের পর মাত্র ২৫ হাজার টাকায় ১৯১০ সালে এটি অধিগ্রহণ করে সরকার। প্রতিষ্ঠিত হয় বেঙ্গল পুলিশের ট্রেনিং কলেজ। রাজশাহীর সারদায় অবস্থিত এই ট্রেনিং কলেজের বর্তমান নাম বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি।
মেজর চেমনি ছিলেন এর প্রথম প্রিন্সিপাল। প্রাচীন সেসব দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার নাম বদলে যায়। ছোট কুঠি হলো প্রিন্সিপালস বাংলো, বড় কুঠি অফিসার্স মেস, গোলাঘর হলো কনস্টেবল ব্যারাক। ১৯১২ সালে ১০৩ জন কনস্টেবল, ২৫ জন ক্যাডেট সাব ইন্সপেক্টর এবং ৭ জন সহকারী পুলিশ সুপার নিয়ে যাত্রা শুরু করে শতাব্দীপ্রাচীন এ কলেজ, যা এখন গর্বিত এক পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।