আব্দুর রহমান মিল্টন, ঝিনাইদহ
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৩ ১৪:২৭ পিএম
আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৩ ১৪:২৭ পিএম
নিজের ও সাধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তিনি। তার নাম নজরুল ইসলাম ঋতু তৃতীয় লিঙ্গের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান। প্রতিবন্ধকতা জয় করে ইতিহাস গড়া মানুষটির কাজ ও সফলতার গল্প নিয়ে বিশেষ লেখা...
আমাদের সমাজে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের দেখা হয় ভিন্ন দৃষ্টিতে। ‘হিজড়া’ বলে নিগৃহীত হয়ে থাকেন তারা। তবুও সামাজিক বাঁধার দেয়াল ভেঙে অনেকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন আপন প্রচেষ্টায়। প্রচল ভাঙার এমন উদাহরণ আমাদের শেখায়, সুযোগ পেলে এই মানুষগুলোও অবদান রাখতে পারেন সমাজের উন্নয়নে।
তৃতীয় লিঙ্গের এমনই একজনের কথা বলব আজ। যিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে ইতিহাস গড়েছেন। তার নাম নজরুল ইসলাম ঋতু। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ৬নং ত্রিলোচনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তিনি। যুগান্তকারী এই ঘটনায় তার নাম উঠে এসেছে পাঠ্যক্রমেও। জাতীয় শিক্ষাক্রম-২০২২ অনুযায়ী প্রণীত এবং ২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে সপ্তম শ্রেণির জন্য নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তক ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুশীলন বইয়ে সম্প্রদায় অধ্যায়ে ঋতুর ছবিসহ তার পরিচয় লেখা হয়েছেÑ ‘জনাব নজরুল ইসলাম ঋতু, হিজড়া সম্প্রদায় থেকে প্রথম নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান’।
২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর ইউপি নির্বাচনে ৬নং ত্রিলোচনপুর ইউনিয়ন থেকে কোনো দলের প্রার্থী না হয়েও নজরুল ইসলাম ঋতু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৯৫৫৭ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছিলেন ৪৫২৯ ভোট। প্রশ্ন উঠতে পারে, বিশেষ লিঙ্গের এই মানুষটিকে সাধারণ ভোটাররা কেন বেছে নিয়েছেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানার আগে আমাদের জেনে নেব ঋতুর উঠে আসার গল্প।
অন্য দশজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের মতো ঋতুর শৈশবও সহজ ছিল না। ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নের ধলা দাদপুর গ্রামের আব্দুল কাদের ও ফাতেমা বেগম দম্পতির সাত সন্তানের মধ্যে তৃতীয় ঋতু। ছোটবেলা থেকেই তার কথাবার্তা-আচরণ ও শারীরিক গঠনে ভিন্নতা দেখা দিতে থাকে। মাত্র ৭ বছর বয়সে ‘হিজড়া’দের একটি দলের সঙ্গে ঋতু গ্রাম ছেড়ে ঢাকা চলে আসেন। ঢাকার ডেমরায় ওই দলের গুরুমার কাছে বেড়ে ওঠেন তিনি। সমলিঙ্গের মানুষদের সঙ্গে থাকলেও পরিবারের টানে প্রায়ই কালীগঞ্জে নিজের বাড়িতে আসতেন। আবার চলেও যেতেন। এভাবে আসা-যাওয়ার মাঝে নিজ গ্রামে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন তিনি। আর্থিক সহায়তা করতেন গ্রামের দরিদ্রদের। অন্যান্য গ্রামের মানুষরাও পেত ঋতুর সাহায্য। এক যুগের বেশি সময় ধরে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সাহায্য করেছেন সামর্থ্য অনুযায়ী। করোনার সময় নগদ টাকা ও খাদ্য সহায়তা দিয়েছেন গ্রামের অভাবীদের। গরিব পরিবারের মেয়েদের বিয়ে-শাদিতেও সহায়তা করেছেন। পাশে দাঁড়িয়েছেন এতিম-বিধবাদের। বিনাস্বার্থে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণেই সেই মানুষরাই তাকে ভালোবেসে করেছে নিজ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান।
গ্রাম আদালতে বিচারকাজে ব্যস্ত নজরুল ইসলাম ঋতুসরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ৬নং ত্রিলোচনপুর ইউনিয়ন পরিষদে প্রতিদিন থাকে অসংখ্য মানুষের আনাগোনা আর বিচারপ্রার্থীদের ভিড়। ইউনিয়ন পরিষদে নিজ চেয়ারে বা বারান্দায় বসে চলছে একের পর এক সালিশ-বৈঠক। সকাল থেকে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে সাধারণ মানুষের কথা শোনেন ঋতু মনোযোগ দিয়ে। দৃঢ়তা আর সতর্কতার সঙ্গে করে যাচ্ছেন নিজের কাজ।
ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে কথা হয় নজরুল ইসলাম ঋতুর সঙ্গে। তিনি জানালেন, ‘ভোটে দাঁড়ানো বা নির্বাচনে আসার কোনো ইচ্ছাই তার ছিল না। তবে এলাকার মানুষরাই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। তারা কেন আমাকে ভোট দিয়ে জয়ী করল, তা তারাই ভালো বলতে পারবেন। সাধারণ মানুষের হয়তো কখনো কোনো কাজে লেগেছি বা উপকারে এসেছি, সে জন্যই তারা ভোট দিয়েছে।’
চেয়ারম্যান হওয়ার আগে মানুষ যেমন করে ভালোবাসত, যেভাবে দেখতÑ এখনও সেভাবেই ভালোবাসে জানালেন তিনি। বাঁধাবিপত্তির বিষয়ে তিনি জানালেন, সঠিকভাবে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই বাধা সৃষ্টি করছে। কেউ বলছে কাজ এভাবে করা যাবে না, এ বিচার সেভাবে করা যাবে না। কিন্তু যেটা সত্য সেভাবেই কাজ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমি ন্যায়ের পক্ষে, অন্যায় কাজ করতে চাই না। বিগত এক বছরে নিজ ইউনিয়ন ত্রিলোচনপুরের উন্নয়ন প্রসঙ্গে ঋতু বলেন, ‘বিগত বছরগুলোয় যারা এখানে চেয়ারম্যান ছিলেন তারা যদি আরেকটু ভালো কাজ করতেন, তাহলে এই ইউনিয়নের অবকাঠামো আরও উন্নত হতো। অনেকেই প্রকল্পের নামে টাকা উঠিয়ে নিয়েছে, কিন্তু কাজ করেনি। জনগণের চাহিদা অনেক কিন্তু প্রকল্প কম।’
নির্বাচিত হওয়ার পর তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্যে কোনো কাজ করেছেন কি নাÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি এখন আর নির্দিষ্ট কোনো ধর্ম, গোত্র, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের নই। আমি এখন সবার, সবাই আমাকে ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি বানিয়েছে। বাকি জীবন এলাকাবাসীর সুখে-দুঃখে আর উন্নয়নে পাশে থেকে সেবা করে যেতে চাই। আমার মতো যারা আছেন, তাদের আত্মনির্ভরশীল করার জন্য যদি কোনো প্রকল্প করার সুযোগ থাকে তাহলে করব।
নজরুল ইসলাম ঋতু চেয়ারম্যান হিসেবে গ্রামে ৬নং ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন কাজের মাধ্যমে। কথা হয় ঘিঘাটি গ্রামের স্কুলশিক্ষক মাইনুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, সম্প্রদায়, জাতপাতের সীমারেখা দিয়ে মানুষের যোগ্যতা, মেধা-মনন মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে ভালোভাবেই দায়িত্ব পালন করছেন নজরুল ইসলাম ঋতু। জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে তার পরিচিতিমূলক অন্তর্ভুক্তি খুবই ইতিবাচক।’ বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের শামীম হোসেনসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১ বছরে ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন নজরুল ইসলাম ঋতু। স্থানীয়ভাবে সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন ভাতা প্রদান, সালিশ-বিচারসহ সরকারি নানা প্রকল্পের কাজ ভালোভাবেই সামলাচ্ছেন তিনি। এলাকায় রাজনৈতিক কোন্দল-হানাহানি নেই। সবাই স্বস্তির সঙ্গে বসবাস করছে।