× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আহা রে পাহাড়ে

ইমরান উর রেজা

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৩ ১৬:১৩ পিএম

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৩ ১৮:৫৯ পিএম

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবান                                                                                                                ছবি : লেখক

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবান ছবি : লেখক

বান্দরবানের পাহাড় যেন পৃথিবীর বুকে একটুকরো স্বর্গ। প্রকৃতিপ্রেমীর ভ্রমণতৃষ্ণা মেটাতে এই অঞ্চলে রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। কবে পাব তাহার দেখা, আহারে আহারে/কবে শাল মহুয়ার, কনক চাঁপার/মালা দেব তাহারে, আহারে আহারে। এই সুর মনের মাঝে নিয়েই একদিন হুট করে পাহাড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে ফেললাম। 

অফিসের ব্যস্ততায় ভ্রমণের জন্য কোনো সময় বের করা হয়ে উঠছিল না। পাহাড় মানেই যে বান্দরবান আকর্ষণীয় এক গন্তব্য; সেখানে পাহাড় নতুনভাবে সজ্জিত হয় এবং চারদিক সবুজে ছেয়ে থাকে। সব সময়ের মতো চার-পাঁচজন নিয়ে ভ্রমণ-প্ল্যান করার পরও শেষ পর্যন্ত ছিলাম আমরা দুইজন, তবে সেবার আর পিছপা হইনি। দিনক্ষণ যা ছিল তা নিয়েই আমরা অফিসে এসে দুই বন্ধু রওনা দিলাম ফকিরাপুল থেকে। প্রাথমিক গন্তব্য আলীকদম। সৃষ্টির এক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবান পার্বত্য জেলা। ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে আলীকদম যেন অন্য এক নাম। জেলার দক্ষিণ প্রান্তে এই উপজেলা। সারি সারি বৃক্ষরাজি আচ্ছাদিত সবুজ গালিচার মধ্যে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ দিয়ে যেতে যেতে হারিয়ে যাবেন একের পর এক সৌন্দর্যে ভরপুর দর্শনীয় স্থানে। আলীকদমের দিকে অনেক ঝরনা ছিল; যেমন- দামতুয়া ঝরনা, সাইংপ্রা এবং থানকুনি ঝরনার মতো আরও অনেক ঝরনা। 

যাই হোক, ফকিরাপুল থেকে আমরা ১০টার দিকে রওনা দেই। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে আলীকদমের পাহাড়ে হাঁটবো। সব সময় চেষ্টা করবেন ঢাকা থেকে একটু আগে বাসে উঠতে। এতে করে ভোরবেলায় আপনারা বান্দরবানে নামতে পারবেন এবং সেই সময় খুব সুন্দর একটি আবহাওয়া পাবেন। সেই সঙ্গে ভিড়টাও একটু কম থাকে। ঠিক সাড়ে ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে আমরা চকরিয়া নেমে যাই এবং আমাদের নাশতা সেরে ফেলি। নাশতার পরেই আমরা চকরিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে আলীকদম যাওয়ার জন্য চান্দের গাড়ি ঠিক করে ফেলি। চকরিয়া থেকে চান্দের গাড়ি যাওয়ার তখন প্রতিজনের ভাড়া ছিল ৯০ টাকা। তবে এর আগের বার আমি ৭০ টাকা দিয়ে গিয়েছিলাম। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমানে এর দাম আরও বাড়তে পারে। আলীকদম দিয়ে আমরা চলে গেলাম একুশ কিলো এবং সেখান থেকে আমাদের ট্র্যাকিং শুরু।

বলে রাখা ভালো, এই রাস্তায় যেতে হলে আপনাকে অবশ্যই আর্মির অনুমতি নিতে হবে। সকালের নাশতা সেরে নিলাম আমরা। নিজেদের ভোটার আইডি কার্ড ফটোকপি করতে এবং রান্নার জন্য বাজার করার কারণে একটু সময় বেশি লেগে যায়। যে কারণে আমাদের ট্র্যাকিং শুরু করতে করতে দুপুরের কাছাকাছি হয়ে যায়। দুপুরে পাহাড়ে হাঁটা একটু কষ্টসাধ্য- যদি আপনার সঙ্গে গামছা, হাতের বড় মোজা, পানি এবং কিছু শুকনো খাবার থাকে, তবে সেই কষ্ট কিছুটা কমানো সম্ভব। যেহেতু আমরা দুজন ছিলাম এবং পথ ছিল অনেক লম্বা- তাই আমরা দুজন মিলে খুব আস্তে আস্তে বিরতি নিয়ে ট্র্যাকিং করি। সবুজের মাঝ দিয়ে আমরা হাঁটতে থাকি। একটা জিনিস সেবার অনুভব করলাম তা হচ্ছে, পাহাড়ে শুধু ট্র্যাকিং করে গেলেই পাহাড়কে উপভোগ করা যায় না। ট্র্যাকিংয়ে কিছুটা সময় দিতে হবে এবং পাহাড়ের নিস্তব্ধতা-নীরবতা আপনাকে উপভোগ করতে হবে। এই ব্যাপারগুলোর সঙ্গে আমরা শহরের মানুষরা অপরিচিত। তাই পাহাড়ে গেলে আমরা নিজেদের নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারি এবং জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পাই।

যাই হোক, সন্ধ্যার মধ্যে আমরা আমাদের পাড়ায় পৌঁছে যাই। একটি ঘরে রাত্রি যাপন করি। পাহাড়ের রাতে সৌন্দর্য একেবারেই ভিন্ন। যা লিখে অথবা ছবির মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারব না। আপনাকে নিজে গিয়ে উপভোগ করতে হবে। পরদিন সকালে আমাদের গাইডের তথ্যমতে একটি জুমঘরের সন্ধান পাওয়া গেল। আমরা পরের দিন খুব সকালবেলা নাশতা সেরেই জুমঘরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সুন্দর একটি চূড়ার পাশে একটি সুন্দর জুমঘর দেখতে পেলাম। এসব জুমঘরের স্থায়িত্ব খুবই কম। সাধারণত জুম চাষের জন্য এই ঘরগুলো তৈরি করা হয়ে থাকে, একেক মৌসুমে এদের অবস্থান থাকে একেক জায়গায়। তাই এইবারে যে জুমঘরে থেকে গিয়েছেন অথবা থাকবেন- পরে তা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। একটি পাড়ায় আমরা দুপুরের খাবারটা সেরে নেই। যেহেতু আজকে রাতে আমরা ঢাকা চলে যাব, তাই বিকালটা এখানে থেকেই আমাদের ট্র্যাকিং আবার শুরু করে দিতে হবে। জুমঘরে গিয়ে চুলায় চা বানালাম এবং কিছু স্মরণীয় স্মৃতি রেখে আসলাম। ছবির থেকেও সুন্দর এই জায়গাগুলো- চারপাশ সবুজ বিস্তৃত।

প্রচুর বাতাসে ঘাসগুলোকে রীতিমতো মনে হচ্ছিল সবুজ বিছানা। আমাদের অবস্থান ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ফিটেরও ওপরে। সেখান থেকে পাহাড়ের ভিউ ছিল অসাধারণ। আশপাশে কয়েকটি পাহাড়ের রেঞ্জ দেখা যাচ্ছে। চলে যাওয়ার সময় একটু আফসোস হচ্ছিল। কারণ এখানে সব বন্ধু মিলে একটি রাত কাটাতে পারলে মন্দ হতো না। তবে এ রকম আফসোস নিয়ে আগামীতে অনেকগুলো প্ল্যান করতে হবে। তা নিয়েই সেই ঘরটিকে ছেড়ে রওনা দিয়ে দিলাম। পাহাড়ে গেলেই প্রতিবারে কিছু না কিছু শিক্ষা নিয়ে আসি। এবারও ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। তবে আমি মনে করি প্রতিটি মানুষের উচিত দুই থেকে তিন মাস পর একটু নতুন জায়গায় যাওয়া। এতে করে সে তার পুরোনো অনেক কিছু নতুন করে করার আনন্দ পায়। রাতে আমরা আলীকদম পৌঁছে যাই এবং আমার ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা দিয়ে দেই পরবর্তীতে কোথায় যাব, তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমাদের ভ্রমণ এখানেই শেষ হয়ে গেল। মনে মনে তখন সুনীলের কবিতা আওড়াচ্ছিলাম- অনেক দিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ। কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি করে তা জানি না। যদি তার দেখা পেতাম, দামের জন্য আটকাত না।

আলীকদমে দর্শনীয় স্থান

মারাইনতং জাদি পাহাড়, আলীর সুড়ঙ্গ, তাংমাইন ঝরনা, পালংখিয়ং, লাদ মেরাখ ঝরনা, কির্সতং পাহাড়, রংরাং পাহাড়, চাইম্প্রা ঝরনা, দামতুয়া ঝরনা, ডিম পাহাড়, রূপমুহুরী ঝরনা, শিলবুনিয়া ঝরনা ও রোয়াম্ভূ নোনার ঝিরি ঝরনা।

আলীর সুড়ঙ্গ

আলীকদম উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরেই মাতামুহুরী-তৈন খাল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা দুই পাহাড়ের চূড়ায় প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট আলীর গুহা বা আলীর সুড়ঙ্গ। প্রকৃতির অপরূপ এই গুহাকে ঘিরে রহস্যের যেন শেষ নেই।

মারাইনতং জাদি

আলীকদম উপজেলা সদর হতে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে আলীকদম-লামা উপজেলার সীমান্তবর্তী মিরিঞ্জা পাহাড়ে মারাইনতং নামের পাহাড় চূড়ার অবস্থান। এর উচ্চ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬০০ ফুট। আলীকদম উপজেলার আবাসিক এলাকা হয়ে এই পাহাড়ে যেতে হয়।

ডিম পাহাড়

আলীকদম-থানচি সড়কের পাশে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ফুট উঁচু এ পাহাড়। অধিকাংশ সময় মেঘে ঢাকা ও আকাশছোঁয়া এ পাহাড় দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করেছে।

রূপমুহুরী ঝরনা

আলীকদম সদর হতে প্রায় ৫০ কি.মি. দূরে পোয়ামুহুরী নামক স্থানে এ ঝরনাটির অবস্থান। নৌকাপথে কিংবা মোটরসাইকেলযোগে যাওয়া যায়।

দামতুয়া ঝরনা

দামতুয়া ঝরনাটিকে একাধিক নামে ডাকা হয়। আলীকদম থানচি রোডে ১৭ কিলোতে আদুপাড়া নামক স্থান থেকে যেতে হয়।

রংরাং পাহাড়

এই পাহাড়টি থানচি আলীকদম উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় পূর্বদিকে অবস্থিত। এই পাহাড়ে উঠলেই সূর্যাস্ত খুব সুন্দরভাবে দেখা যায়। চারপাশে পাহাড়, পাশে থানচি এবং আলীকদম উপজেলা। পাহাড়ের এই মনোরম পরিবেশ আপনাকে বরাবরই মুগ্ধ করে তুলবে। আলীকদম উপজেলা তৈনখালের দৌছড়ি বাজার হয়ে এই পাহাড়ে যেতে হয়।

কির্সতং পাহাড়

গভীর জঙ্গল আর পাহাড় হওয়ায় এই জায়গাটি পর্যটকদের কাছে একটি আকর্ষণীয় স্থান। রংরাং পাহাড়ের পাশে রয়েছে কির্সতং পাহাড়। পাহাড়ের এই জায়গাটি অধিকাংশ সময় মেঘে ডাকা থাকে। তাই এই পাহাড়টি মেঘের পাহাড় হিসেবেও পরিচিত। এই পাহাড়টি রংরাং পাহাড়ের কাছাকাছি একি রাস্তায়।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে বাসযোগে সরাসরি আলীকদম আসতে পারবেন। কিংবা কক্সবাজার থেকে চকরিয়া এসে বাস অথবা চান্দের গাড়ি নিয়ে আলীকদম বাস স্টেশনে। তারপর থানচি রোড ১৭ কিলোতে গিয়ে হেঁটে তিন ঘণ্টা গেলে দামতুয়া ঝরনা এবং থানচি সড়কে ডিম পাহাড়সহ বিভিন্ন ভিউ পয়েন্ট। অন্যদিকে আমতলী লং ঘাট হয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় দেড় ঘণ্টায় দৌছড়ি বাজার। সেখান থেকে তাংমাইন ঝরনা, লাদমেরাখ, পালংখিয়ং, সাইম্প্রা, রংরাং এবং ক্রিসতং পাহাড় ঘুরে আসতে পারবেন।

লক্ষ্য রাখুন 

  • পাহাড়ে ট্র্যাকিংয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আর সাহস থাকাই যথেষ্ট নয়। যাওয়ার আগের প্রস্তুতি, শারীরিক দেখভালের সঙ্গে জানা প্রয়োজন ট্র্যাকিংয়ের কিছু নিয়মকানুন।
  • পাহাড় ট্র্যাকিংয়ের জন্য সুস্থতা নিশ্চিত করা আবশ্যকীয়। 
  • পাহাড় ট্র্যাকিংয়ে যাওয়ার সময় এমন মানুষদের বেছে নেওয়া উচিত যাদের আগে থেকেই ট্র্যাকিংয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে। 
  • পাহাড়ি রাস্তা কখনও চওড়া, কখনও সরু, কখনও ভেজা; আবার কখনও শুকনো ধুলোময় হয়। তাই পাহাড় ট্র্যাকিংয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করুন।
  • ভেজা মাটিতে হাঁটার সময় খেয়াল রাখুন যেন পিছলে পড়ে না যান। 


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা