শফিকুল ইসলাম খোকন
প্রকাশ : ৬ ঘণ্টা আগে
অলংকরণ : তানভীর মালেক
সমুদ্র বা সাগর হলো পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জলভাগ, যা পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রায় ৭১ ভাগ অংশজুড়ে রয়েছে। এটি মূলত লবণাক্ত পানির বিশাল বিস্তৃতি, যা মহাসাগর ও বিভিন্ন সাগরের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলকে সংযুক্ত করে। সমুদ্র পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাদ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের উৎস হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া সমুদ্র পরিবহন, বাণিজ্য এবং পর্যটনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই মানবজীবন ও পরিবেশের জন্য সমুদ্রের গুরুত্ব অপরিসীম।
সাগরের কষ্ট
সাগর প্লাস্টিক, পলিথিন, শিল্পকারখানার বর্জ্য, তেল দূষণ এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট কারণে ক্রমশ ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এসব দূষক সমুদ্রের পানি ও পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার ফলে সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবন হুমকির মুখে পড়ে। প্লাস্টিক ও পলিথিন দীর্ঘ সময় ধরে পানিতে থেকে সামুদ্রিক জীবের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়। বিপুল সম্পদের ভান্ডার হয়েও মানুষের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে দিন দিন হুমকির মুখে পড়েছে সমুদ্র, হুমকিতে পড়েছে পরিবেশ। জেলেরা জালে আগের মতো মাছ পাচ্ছে না, এখন মাছের বিপরীতে জালে উঠে আসে প্লাস্টিক, পলিথিন। এত সম্পদের ভান্ডার সাগর কী কারণে ধ্বংস হচ্ছে জানে না উপকূলের মানুষ। অথচ তাদের জানার সুযোগও কেউ করে দিচ্ছে না। যারা সমুদ্রকে কেন্দ্র করে বেঁচে আছে তারাই যদি না জানে তাহলে সমুদ্র বাঁচানোর একটি বড় অংশ অজ্ঞতার মাঝে রয়ে যাবে। তাই সমুদ্রের সুরক্ষা নিয়ে নানা তথ্য তাদের জানানোর জন্য জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) ও পাথরঘাটা উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন আয়োজন করেছিল ‘সাগর সুরক্ষার গল্প’। উপকূলের জেলেপল্লীসহ সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন এখানে। গত জুন মাসের ৮ তারিখ ছিল বিশ্ব সমুদ্র দিবস। এ দিবস উপলক্ষে বরগুনার পাথরঘাটা বলেশ্বর নদীর পাড়ে রুহিতা গ্রামে এই আয়োজন করা হয়।

সাগরের সুরক্ষার জন্য উপকূলের মানুষের ভাবনা কী, সাগরে দূষণ কমানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘নদীর পাড়ে ঢেউয়ের তালে সাগর সুরক্ষার গল্প’ নামক ব্যতিক্রম এই আয়োজন করা হয়। উপকূলের জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকার নানা দিক নিয়ে গল্পে গল্পে তথ্য উঠে আসে। আলোচনায় উঠে আসে প্লাস্টিক দূষণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সুপেয় পানি, উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের সংকট, জেলেদের অধিকার ও নিরাপত্তা, টেকসই বেড়িবাঁধসহ নানাবিধ বিষয়।
কমে যাচ্ছে সাগরের মাছ
সবার সঙ্গে যখন সংগঠন থেকে কথা বলা হয় তখন সেখানে উপস্থিত প্রায় সবাই জানানÑ প্লাস্টিকের কারণে মাছ কমে যায়, এ কথা তারা আগে জানতেন না। তারা এখন বুঝতে পারছেন, নদী ও সাগরে ফেলা প্লাস্টিক ও পলিথিন শুধু পানি দূষণই করে না, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জীবনও হুমকির মুখে ফেলে। অনেক মাছ প্লাস্টিককে খাবার ভেবে খেয়ে ফেলে বা প্লাস্টিকের জালে আটকে মারা যায়। এর ফলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ধীরে ধীরে মাছের সংখ্যা কমে যায়। তাই নদী ও সাগরকে প্লাস্টিকমুক্ত রাখা আমাদের সবার দায়িত্বÑ এটা নিয়ে তাদের মধ্যেও নতুনভাবে সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
রুহিতা গ্রামের বাসিন্দা ৮৫ বছরের জেলে আ. ছত্তার বলেন, ‘আগে সাগরে অনেক মাছ পেতাম। এখন মাছের চেয়ে জালে বেশি উঠে আসে প্লাস্টিক ও পলিথিন। প্লাস্টিক ও পলিথিনের কারণে মাছ দিন দিন কমে যায়, তা এখন জানলাম। গল্পে গল্পে প্লাস্টিক ও পলিথিনের ক্ষতি সম্পর্কে জানলাম। আগে বাজারসদাই প্লাস্টিক ও পলিথিনে করে ট্রলারে বা নৌকায় যেতাম। এখন বুঝলাম এর খারাপ দিক।’
সাগরে প্লাস্টিক-পলিথিন নেওয়ায় ক্ষতি
রুহিতা গ্রামের ইব্রাহিম সওজাল সাগর ও নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই তিনি মাছ ধরার কাজে যুক্ত হন। অভাব-অনটনের কারণে লেখাপড়ার সুযোগ হয়নি তার। ‘নদীর পাড়ে ঢেউয়ের তালে সাগর সুরক্ষার গল্প’-এ অংশ নিয়ে তিনি প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ সম্পর্কে নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘সাগরে মাছ ধরার সময় চারদিকে প্লাস্টিকই দেখতে পাই। আগে ভাবতাম, সাগরে প্লাস্টিক ভাসবে এটাই স্বাভাবিক। মাছ ধরার জালেও প্রচুর প্লাস্টিক উঠে আসে। কিন্তু আজকের এই গল্প ও আলোচনা থেকে জানতে পারলাম, প্লাস্টিকের কারণে সাগরের পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সামুদ্রিক প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মাছের পরিমাণ কমে যায়। প্লাস্টিক যে আমাদের জীবিকা ও ভবিষ্যতের জন্যও হুমকি, তা আগে বুঝিনি। এখন বুঝতে পারছি, নদী ও সাগরে ফেলা প্লাস্টিক ও পলিথিন শুধু পরিবেশ নয়, আমাদের ভবিষ্যৎকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই আজ থেকেই প্রতিজ্ঞা করছি, আর কখনও সাগর বা নদীতে প্লাস্টিক-পলিথিন ফেলব না। সবাই যদি সচেতন হই, তাহলে আমাদের নদী, সাগর ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে। আর নিমুনা সাগরে প্লাস্টিক-পলিথিন।’
উপকূলের নারীদের দুশ্চিন্তা
বলেশ্বর নদী সংলগ্ন রুহিতা গ্রামের অধিকাংশ নারীর জীবন-জীবিকা নদীকেন্দ্রিক। সংসারের কাজ সামলানোর পাশাপাশি মাছ ধরা ও মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো কাজেও অংশ নিতে হয় তাদের। সমুদ্র থেকে আসা লবণাক্ত পানির ওপরই অনেক ক্ষেত্রে তাদের নির্ভর করতে হয়। কিন্তু এই লবণাক্ত পানির কারণে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখেও পড়েন তারা। ত্বকের রোগ, চুলকানি, প্রজননস্বাস্থ্যজনিত সমস্যাসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা তাদের নিত্যসঙ্গী।
সম্প্রতি তারা জানতে পেরেছেন, সমুদ্র থেকে আসা লবণাক্ত পানির সঙ্গে থাকা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। রুহিতা গ্রামের হামিদা বেগম, আমেনা বেগম, সাবিনা ইয়াসমিন ও কুমকুমের সঙ্গে নদীর পাড়ে ঢেউয়ের তালে তালে গল্প করতে গিয়ে উঠে আসে এসব কথা।
নারীরা জানান, ‘সাগর থেকে লবণাক্ত পানি আসবে-যাবে, এটাই স্বাভাবিক। আমরা এই পরিবেশের সঙ্গেই বড় হয়েছি। কিন্তু লবণাক্ত পানির সঙ্গে যে প্লাস্টিকও আমাদের শরীরের ক্ষতি করতে পারে, তা আগে জানতাম না। এখন বিষয়টি জেনে আমরা উদ্বিগ্ন। কারণ এই পানি শুধু নদীতে নয়, মাছের মধ্যেও যায়, আবার নানা কাজে ব্যবহার করতে হয় আমাদের।’
তারা আরও বলেন, সমুদ্র ও নদীর দূষণ কমাতে সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্লাস্টিক বর্জ্য যত্রতত্র ফেলা বন্ধ করা এবং নদী-সমুদ্রকে দূষণমুক্ত রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ সমুদ্রের পরিবর্তন ও দূষণের প্রভাব সবচেয়ে আগে এসে পড়ে উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকায়, বিশেষ করে নারীদের ওপর।
এই নারীদের কাছে সমুদ্র শুধু জীবিকার উৎস নয়; এটি তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে জীবনের এই নির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন উদ্বেগÑ লবণাক্ততা ও প্লাস্টিক দূষণের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। দূষণমুক্ত করতে নারীরাও ভূমিকা রাখতে পারে।
সাগর কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ শিশুদের কাছে
প্রতিদিন বলেশ্বর নদীতে উপকূলের শিশুরা জোয়ার-ভাটার তালে তালে খেলাধুলা করে, গোসল করে। কখনও কখনও বাবা-মায়ের সঙ্গে মাছ ধরতেও যায়। নদী আর সাগরের সঙ্গে তাদের এই সম্পর্ক খুবই স্বাভাবিক ও গভীর। কিন্তু তারা এখনও পুরোপুরি জানে না, সাগর তাদের আগামীর জীবন ও জীবিকার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। মাছ, জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় সুরক্ষা এবং জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে সাগর তাদের ভবিষ্যৎকে সমৃদ্ধ করে। তাই আজকের শিশুদের জন্য একটি সুস্থ, নিরাপদ ও দূষণমুক্ত সমুদ্র নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।
একটি নির্মল, নীল আর জীবন্ত সমুদ্রÑ যেখানে প্লাস্টিকের বর্জ্য নয়, ভেসে বেড়াবে স্বপ্ন। যেখানে ডলফিন, কচ্ছপ ও নানা সামুদ্রিক প্রাণী নিরাপদে বিচরণ করবে। শিশুরা এমন এক সমুদ্র চায়, যা হবে দূষণমুক্ত, জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এবং আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত। আজকের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণই গড়ে তুলতে পারে শিশুদের কল্পনার সেই সুন্দর আগামীর সমুদ্র। বলেশ্বর নদীতে নেমে প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন হাতে তারা সেই বার্তাই তুলে ধরে।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়াদুল ইসলাম, শাকিল মিয়া ও রবিউল জানায়, ‘সাগর ও নদীর কথা বইয়ের পাতায় পড়েছি। কিন্তু সাগর যে এত গুরুত্বপূর্ণ, তা আগে জানতাম না। আমরা জানতাম সাগরে শুধু মাছ পাওয়া যায়। সাগরে যে এত বৈচিত্র্যময় সম্পদ রয়েছে, সেটিও আমাদের জানা ছিল না। প্রতিদিন নদীর পাড়ে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও নানা ধরনের বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখি। আগে বিষয়টি নিয়ে তেমন ভাবতাম না। এখন বুঝতে পারছি, এসব বর্জ্য নদীর মাধ্যমে সাগরে গিয়ে সামুদ্রিক প্রাণী ও পরিবেশের ক্ষতি করে।’
তারা আরও বলে, ‘আমরা চাই নদী ও সাগর পরিষ্কার থাকুক। সবাই যেন প্লাস্টিক ব্যবহার কমায় এবং যেখানে-সেখানে বর্জ্য না ফেলে। কারণ আজ আমরা যদি সাগরকে রক্ষা করতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যতে এর ক্ষতির প্রভাব আমাদেরই বহন করতে হবে।’
শিশুদের এই উপলব্ধি ও প্রত্যাশা একটি আশার বার্তা বহন করে। তারা এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, যেখানে সমুদ্র হবে জীবনের উৎস, পরিবেশের রক্ষক এবং আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও সমৃদ্ধ এক সম্পদ। তাদের চোখে আগামীর সমুদ্র মানে একটি পরিচ্ছন্ন, প্রাণবন্ত ও টেকসই পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আরাফাত রহমান বলেন, ‘সমুদ্র শুধু মাছের উৎস নয়, এটি আমাদের অর্থনীতি, পরিবেশ ও জলবায়ুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু প্লাস্টিক দূষণ, লবণাক্ততার বিস্তার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সামুদ্রিক পরিবেশ ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। উপকূলের মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে। তাই সমুদ্র ও নদীতে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। আজকের সচেতনতাই আগামীর সুস্থ, নিরাপদ ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ সমুদ্র নিশ্চিত করতে পারে।’